ঢাকা, রবিবার, ২০ আষাঢ় ১৪২৭, ০৫ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘এসময় নিজেকে আবিষ্কার করার’

ফারহানা নওশিন তিতলী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২১ ৫:২১:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২১ ৫:২১:৪৭ পিএম

করোনার প্রাদুর্ভাবে বিশ্বের চাকা নিয়ন্ত্রণহীন। ছোট্ট একটি ভাইরাসের কবলে পড়ে লাগাম হারিয়েছে গণমানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। সাধারণ জীনবব্যবস্থা এখন হুমকির মুখে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের এমন কোনো খাত নেই যা আজ ক্ষতিগ্রস্ত নয়। অন্য সবকিছুর ন্যায় শিক্ষাব্যবস্থাও অনেকটা ঝুঁকির মুখে।

অঘোষিত লকডাউনের ফলে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো কবে নাগাদ খুলবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই দীর্ঘ ছুটিতে অবসর সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী করছেন এসব নিয়ে লিখেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহানা নওশিন তিতলী।

শাহীন আলম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

অতিরিক্ত কিছু মানেই নেতিবাচক একটি দিক থাকবে অবশ্যই। তেমনই অনির্দিষ্ট কালের ছুটিতে আনন্দ আজ ম্লান হয়ে অবসাদের বিরান ভূমিতে রূপ নিয়েছে। অবসর কাটাতে বাধ্য হয়েই অধিকাংশ সময় ব্যয় করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল জগতে। ফলে একটি ভার্চুয়াল ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে যাচ্ছে বৈশ্বিক মহামারি করোনার মতোই। এ যেন ঠিক মরণ ঠেকাতে ইচ্ছাকৃত বিষ পান।

মানুষ স্বভাবজাত প্রাণী। হঠাৎ করেই একদিনে তার কোনো অভ্যাস সে পরিবর্তন করতে পারে না। আর পারলেও মস্তিষ্কের উপর প্রচণ্ড চাপের সঞ্চার হয়। তেমনই সাময়িক ছুটি আজ অফুরন্ত অবসরে রূপ নেওয়ার ফলে নিজের পরিচিত ক্লাস, পরীক্ষা, আড্ডা, গল্প ইত্যাদির ব্যস্ততা ছেড়ে চার দেয়ালের বন্দিজীবনে এখন নিজের কাছেই নিজেকে অসম্ভব বিরক্তিকর বলে মনে হয়। তাছাড়া প্রতিটি পাবলিকিয়ানের কাছেই সেশন জট মোটামুটি কম আর বেশি পরিচিত একটি অভিশপ্ত শব্দ। আমাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেই তবে সিজিপিএ তুলতে হয়। আর এই ভাবনা সর্বক্ষণই মাথায় উইপোকার মতো নাড়াচাড়া করে। তাই সৃষ্টিকর্তার কাছে এখন শুধু একটাই প্রার্থনা, নিরস অবসর কাটিয়ে যেন অতিদ্রুত ফিরতে পারি নিজের পরিচিত অঙ্গনে। যেন আবার ব্যস্ততার ফাঁকে ক্যাম্পাসের কোনো এক জায়গায় বসে মেতে উঠতে পারি বন্ধুত্বের আড্ডায়।

নাজমুল হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

গত দুইমাস ধরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি কাটাচ্ছি। কথায় আছে মানুষ অভ্যাসের দাস। আর গত পাঁচ বছর ধরে, বছরের প্রায় পুরো সময়টুকুই বাড়ির বাইরে, শহরে থাকার অভ্যাস। ক্লাস, টিউশন এগুলোর কারণে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের বড় বড় ছুটির বেশির ভাগ সময়ও বাড়ির বাইরেই কাটানো। হঠাৎ করে এই অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে বাড়িতে এসে প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও পরবর্তীতে একটু কেমনই যেন লাগছিলো। যারা বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশুনা করে, প্রায় সবারই পরিস্থিতি ঠিক এমনটাই।

কিন্তু বিশ্ব আজ অসুস্থ, ঘরবন্দি হয়েই কাটাতে হবে পুরো ছুটি। ভাবলাম ছুটিকে কাজে লাগানো যাক। নতুন কিছু শেখা আমার কাছে নেশার মতো। তাই রোজ চেষ্টা করছি নতুন কিছু শেখার, জানার। বাসায় বসে বিশ্ব ইতিহাসকে কাছে থেকে জানারও উত্তম সময় এটা। সাধ্যমত বই পড়ে আর ভিনদেশি ভাষা শিখে কাটিয়ে দিচ্ছি অনাকাঙ্ক্ষিত এই ছুটি।

জারিন তাসনিম অর্নি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

অন্য দিনের সকালটা শুরু হত সাড়ে ৬টায়।  কিন্তু এখন সেটা কোনো রুটিনের মধ্যে ফেলা যায় না। না রাতে ঘুমানোর জন্য কোন সময় বাধা আছে, না সকালে ওঠার জন্য। দীর্ঘ ৪৭ দিন প্রাণের শহর ঢাকাতে ঘরবন্দি থাকার পর নিজেকে অসুস্থ মস্তিষ্কের মনে হয়েছিল। কিন্তু নিজ জন্মভূমিতে ফেরার পর এবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারছি।

আমার যৌথ পরিবার হওয়ায় সময়টা অনেক আনন্দে কাটছে। ছোট ছোট ভাই-বোনদের নতুন নতুন রান্না করে খাওয়াই। চাচা চাচি, চাচাতো ভাই-বোন, সবাইকে নিয়ে ভালোই কাটছে সময়টা। মাঝে মাঝে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে উকি মারার সুযোগ বেড়েছে। বেশ কিছু গল্প উপন্যাস পড়ে ফেলার সুযোগ হয়েছে। আমার মনে হয় এমন একটা সময় মানুষের জীবনে আসা উচিৎ, যেটা মানুষকে পরিবারকেন্দ্রিক হতে সহায়তা করে। কারণ, সচরাচর আমরা পরিবারের সাথে এত সময় কাটানোর সময়-সুযোগ কোনোটাই পাই না। নিজেকে উপলব্ধি করারও একটা সুযোগ পেয়েছি এই সময়টিতে, যেটা প্রতিটি মানুষের জন্য অপরিহার্য।

সোহান সিদ্দিকী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

করোনাভাইরাসের আতঙ্কে ক্যাম্পাস বন্ধের পর থেকে গত দুইমাস যাবৎ ছুটিতে বাসায় আছি। তবে, এবারের বন্ধে বন্দিজীবন। প্রতিবার এই সময়ে বাসায় আসলে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি, রমজানে ইফতার পার্টিসহ নানা কাজে মেতে থাকতাম আর এবার তার কিছুই হচ্ছে না। তবে অঘোষিত লকডাউনে এ সময় হেলায় নষ্ট না করে চেষ্টা করেছি নতুন কিছু শেখার।

একুশে বইমেলায় কিছু বই কিনেছিলাম সেগুলো একটা একটা করে শেষ করছি‌। এছাড়া অনলাইনে পছন্দের বিষয়ে কোর্স করছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে না থেকে বাসাতেই সময় দিচ্ছি পরিবারের সবাইকে। এভাবেই পার হচ্ছে দিন আর মাস, কারণ সেতো সময়, কারো জন্য থেমে থাকে না। আর অপেক্ষা করছি নতুন সূর্যোদয়ের, যখন সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যাবে এবং ফিরে যেতে পারবো প্রিয় ক্যাম্পাসে।

সজীবুর রহমান, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রায় দুই মাস হতে যাচ্ছে বাসায়। অনেকটা কয়েদীদের মতোই আটকে রয়েছি। লকডাউনের প্রতিটা মুহূর্তই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় নামক পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যের কথা। এখন বাসায় বসে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে বিভিন্ন ইতিহাসের বই পড়ে আর লেখালেখির মাধ্যমে। বাকি সময়টা মুভি, গেমস ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে দিয়েই কেটে যাচ্ছে। এই দুই মাস গৃহবন্দি থাকলেও নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সামাজিক কাজ করে যাচ্ছি।

আশিক ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

করোনাভাইরাসে পুরো পৃথিবী আজ স্তব্ধ। এর ভয়াবহতা থেকে দেশকে রক্ষার জন্য চলছে লকডাউন প্রক্রিয়া। মেনে চলতে হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। ফলে গ্রামের মানুষগুলো কর্মহীন হয়ে পড়েছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কর্মহীন অসহায়, অসচ্ছল পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কর্তৃক গঠিত ইউনিয়ন পর্যায়ে করোনা সচেতনতায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছি।

এসময় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সহযোগিতায় অনেক অসহায় পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী ও ২১টি শিশু ত্রাণ বিতরণ করেছি। ভবিষ্যতেও অসহায়, অসচ্ছল পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। অবসর সময়টা নাটক, সিনেমা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করছি। প্রিয়জনকে সময় দিচ্ছি।


ইবি/হাকিম মাহি