ঢাকা, রবিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ওষুধ ও সরঞ্জাম ক্রয়ে লুট সাড়ে ৫ কোটি টাকা, ৫ মামলার অনুমতি

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১৫ ৭:৪৫:২৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-১৫ ১২:১৮:২৭ পিএম

রাজধানীর আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের জন‌্য বাজারমূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ-তিন গুণ মূল্যে ওষুধ এবং সার্জিক্যাল ও প্যাথলজি সরঞ্জাম ক্রয়ে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলার অনুমতি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

পৃথক পাঁচ মামলায় মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি, বাজার দর কমিটি, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও ঠিকাদারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের ৩৩ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হচ্ছে।

গত ১২ ডিসেম্বর কমিশন থেকে ওই মামলার অনুমোদন মিলেছে বলে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে নিশ্চিত করেছেন। রোববার যেকোনো সময় মামলা দায়ের হতে পারে বলে জানা গেছে।

২০১৪-২০১৫ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত মোট চার অর্থবছরে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছিল এসব সামগ্রী। এ কারণে মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. ইসরাত জাহানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের ৩৩ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করেছেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. আবুবকর সিদ্দিক।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে কার্যাদেশ অনুযায়ী ঠিকাদারকে ওষুধ সরবরাহের জন‌্য সাড়ে ১৬ লাখ টাকার স্থলে ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭২০ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে একই প্রক্রিয়ায় প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ অভিযোগে পাঁচ মামলার অনুমোদন মিলেছে। একাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা একাধিক মামলার আসামি।

যাদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন মিলেছে- মনার্ক এস্টাব্লিশমেন্টের মালিক মো. ফাতে নূর ইসলাম, মেসার্স নাফিসা বিজনেস কর্নারের মালিক শেখ ইদ্রিস উদ্দিন (চঞ্চল), সাত্ত্বনা ট্রেডার্সের মালিক নিজামুর রহমান চৌধুরী, মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. ইসরাত জাহান, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. পারভীন হক চৌধুরী, সিনিয়র কনসালট‌্যান্ট ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. মাহফুজা খাতুন, সাবেক সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ‌্যান্ড রিসার্স) ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. চিন্ময় কান্তি দাস, সাবেক মেডিক্যাল অফিসার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. সাইফুল ইসলাম, মেডিক‌্যাল অফিসার (শিশু) ও বাজার দর যাচাই কমিটির সদস্য ডা. বেগম মাহফুজা দিলারা আকতার।

মেডিক‌্যাল অফিসার ও বাজার দর যাচাই কমিটি সদস্য ডা. নাজরিনা বেগম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সদস্য সচিব-বাজার দর যাচাই কমিটি মো. জহিরুল ইসলাম,পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. জেবুন্নেসা হোসেন, সিনিয়র কনসালট‌্যান্ট (গাইনি) ও বাজার দর যাচাই কমিটির সভাপতি ডা. রওশন হোসনে জাহান, মাতৃসদনের সাবেক সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ‌্যান্ড রিসার্স) ও পরিবার পরিকল্পনার অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. মো. লুৎফুল কবীর খান, মেডিক্যাল অফিসার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. রওশন জাহান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হালিমা খাতুন, মাতৃসদনের বিভাগীয় প্রধান (শিশু) ও বাজার দর যাচাই কমিটির সদস্য ডা. মো. আমীর হোচাইন, সাবেক সমাজসেবা কর্মকর্তা ও বাজার দর যাচাই কমিটির সদস্য মোছা. রইছা খাতুন, সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. কাজী গোলাম আহসান, সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন, জুনিয়র কনসালট‌্যান্ট (শিশু) ডা. নাদিরা আফরোজ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নাছের উদ্দিন, সমাজসেবা কর্মকর্তা বিলকিস আক্তার, মেডিক‌্যাল অফিসার ডা. আলেয়া ফেরদৌসি, মেসার্স মোস্তাকিম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. ওয়াজিদ হোসেন, মেসার্স তসলিম এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. তসলিম আলম, মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ‌্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালক ডা. মো. মুনীরুজ্জামান সিদ্দীকী, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (স্থানীয় সংগ্রহ) আবদুল লতিফ মোল্লা, মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ‌্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. শাহজাহান মিয়া, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (এমসিএইচ) ডা. ফাহমিদা সুলতানা ও সমাজসেবা অফিসার মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ‌্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের উপ-পরিচালক ডা. মাকসুদা বেগম।

তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়ার লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতাধীন হাসপাতালটি ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ ২০০০ সালে পুনরায় শুরু হয় এর যাত্রা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনা হয়। যেমন: ৮২ টাকা মূল্যের পলিস ক্যাথেটার ক্রয় করা হয়েছে ২২৭ টাকায়, ৩১৭ টাকার সার্জিক্যাল সুচারের মূল্য ধরা হয়েছে ৮৭৬ টাকা, ১০৭ টাকার এট্রোমেটিক ক্রোমিক ক্যাটগাটের ক্রয়মূল্য ৩৮২ টাকা, ৩২ টাকার সেলাই সেট ক্রয় হয়েছে ১৪২ টাকায়, প্রতিটি ব্লাড গ্লুকোজ এস্টিমেশন কিটের নির্ধারিত মূল্য ৩ হাজার ৯৬০ টাকা হলেও কেনা হয় ৭ হাজার ৫৯২ টাকায়, ১ হাজার ১০০ টাকা দামের প্রতিটি এক্স রে ডেভেলপার অ্যান্ড ফিক্সার কেনা হয় ২ হাজার ৫৮২ টাকায়।

সলিউশন ফর হিউমেলিজারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫৯২ টাকা, কেনা হয় তিন হাজার ৮০৬ টাকায়। প্রতিটি ডিসপোজেবল সিরিঞ্জের নির্ধারিত মূল্য ৬ টাকা ৬০ পয়সা, কেনা হয় ১২ টাকায়। সনি টাইপের ইউএসজি পেপারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩২০ টাকা, কেনা হয় ২ হাজার ৪২২ টাকায়।

এভাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শতাধিক আইটেমের ওষুধ ও পণ‌্য কেনাকাটায় আত্মসাৎ করা হয় সাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি।

এর আগে এ বিষয়ে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত রাইজিংবিডিকে বলেছিলেন, ‘যেহেতু অনুসন্ধান চলছে, তাই এ অবস্থায় কোনো বক্তব্য দেয়া যায় না। অনুসন্ধান শেষে কমিশন সিদ্ধান্ত নিলে জানতে পারবেন।’

তবে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের এক পরিচালক অনুমোদনের বিষয়টি রাইজিংবিডিকে নিশ্চিত করেছেন।

২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর আজিমপুরের এই মাতৃসদনে রেজিস্ট্রেশন না করার অজুহাতে প্রসব যন্ত্রণায় কাতর ছিন্নমূল পারভীনকে রাস্তায় বের করে দেয়া হয়েছিল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রাস্তার ওপরেই বাচ্চা প্রসব করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।



ঢাকা/এম এ রহমান/রফিক