ঢাকা     সোমবার   ১০ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৬ ১৪২৭ ||  ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

করোনাকালে রাস্তার পড়ে থাকা পাগলদের কথা

রুমন চক্রবর্তী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৪:৪৩, ২৫ মে ২০২০  
করোনাকালে রাস্তার পড়ে থাকা পাগলদের কথা

করোনাকালে প্রত‌্যেকটি মানুষই বেঁচে থাকার তাগিদে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন থাকতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আবার এমন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে অভাবী ও খেটে খাওয়া মানুষদের কথাও ভাবছে স্থানীয় প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষ। প্রয়োজনে ত্রাণ ও উপহার সামগ্রী নিয়ে ছুটে যাচ্ছে তাদের কাছে।

কিন্তু এ সময় মানসিক ভারসাম্যহীনদের কথা ভাববার কেউ নেই। তারা নিজেরাও ভাবেনা নিজেদের কথা।  তারা নিজেদের মত করেই চলছে। সামাজিক দূরত্ব, মুখে মাস্ক পরিধান আর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া- এসবের কারণ জানতে চায়না তারা। তাদের এসব জানার প্রয়োজনও নেই।  কোনভাবে পেটে দানা পরলেই তারা শান্ত।

কিশোরগঞ্জ শহরের বিভিন্ন আনাচে কানাচে রয়েছেন  এমন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ। সাধারণ মানুষের কাছে যাদের একনামেই পরিচয় ‘পাগল'। সরেজমিনে দেখা হয় এমন কয়েকজন পাগলের সাথে। যাদের সাথে গল্পের ছলে খন্ড খন্ড কথাও হয়। কেউ কেউ আবার নিশ্চুপ থাকতেই ভালবাসেন। কথা বলতে নারাজ। শুধু অপলক দৃষ্টিতে চেয়েই থাকেন। এ জগত দেখার জন্যই যেন তার আগমণ।তাদেরও রয়েছে একান্তই নিজস্বতা ও ছোট ছোট গল্প।

শহরের কালীবাড়ী মোড় ও গাইটাল চৌরাস্তার মোড় এ দু’টো জায়গা সবচেয়ে বেশি পছন্দ জুলেখা বানুর। কেন পছন্দ এমন প্রশ্নের জবাবে সে জানায়,‘আমারে সবাই আদর করে,খাওন দেয়। আবার আমার নাম ‘জুলে’ কইয়া ডাহে। তাই আমার খুব বালা লাগে।’ কথা শেষ করেই আপন মনে প্রকৃতির সাথে কথা বলতে শুরু করে জুলেখা। আর মাটি থেকে কাগজ কুড়াতে শুরু করে দেয়। এভাবেই বছরের পর বছর চলছে জুলেখার জীবন পরিক্রমা।

এমন আরেকজন মালেক পাগলা। টুকরো টুকরো কাপড়ে ঢেকে আছে পুরো শরীর। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সারাবছরই তার এমনরূপ। সে খুব শান্ত ও ধীর প্রকৃতির। আবার তার সাথে যারা কথা বলে সবাই তাকে মালেক ভাই হিসেবেই সম্বোধন করে। মালেকের বিশেষ দুটি গুণ, সে কারো কাছে কিছু চেয়ে নেয়না আর রাস্তার কুকুরদের অনেক ভালবাসে। নিজে যা খায়, আশপাশের কুকুরগুলোকেও তা খেতে দেয়।

ফুটবল খেলাধূলা পছন্দ করেন মফিজ পাগলা। তাইতো মাঝে মাঝে জার্সি পরে স্টেডিয়াম মাঠেও চলে যান। আর সারা শহর জুড়েই রয়েছে তার ছুটাছুটি। লোকমুখে জানা গেছে, তার বাড়ি শহরের হারুয়া এলাকায়। তবে কখনও কারো ক্ষতি করেননি তিনি। ‍কথাও বলেন না, শুধু শহর জুড়ে ছুটতে ছুটতেই চলে যাচ্ছে তার জীবন।

আরেকজন রানা পাগল। বাসা শহরের কাটিকাটা এলাকায়। বয়স পঁচিশ পার করেছেন। জন্মের পর থেকেই সে এমন। মানুষের ক্ষতি করতে পারে, এমন ভয়ে তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখেন তার মা। এমন ছেলেকে নিয়ে অনেক ঝড়-ঝাপটা পার করতে হচ্ছে তার মাকে। শেকলে বাঁধা রানা শুধু ফেল ফেল করে সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। হাসে আর মাটিতে আঁকিবুকি করে।

এমন পাগলদের জীবন-জীবিকার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সারাবছরই এরা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে খেয়ে পড়ে বেঁচে আছেন। নির্দিষ্ট এলাকার স্থানীয়রাই শুধুমাত্র তাদের ভালবেসে প্রতিদিন কিছু না কিছু খেতে দিচ্ছেন। তবে তারা কখনও কারো ক্ষতি করেননি। তাই সবাই তাদেরকে পছন্দ করে। কিন্তু দেশের এমন ক্রান্তিলগ্নে সবার পাশেই কেউ না কেউ আছে। শুধু এমন পাগলদের পাশে কেউ নেই। তাছাড়া দীর্ঘদিন লকডাউনে শহরের দোকানপাট বন্ধ থাকায় এদের খেতেও সমস্যা হচ্ছে।

তাই সচেতন মহল মনে করেন,করোনাকালে সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ, অসহায় ও হতদরিদ্রদের বাঁচিয়ে রাখতে প্রশাসনসহ সর্বোস্তরের মানুষ যেভাবে ঝাপিয়ে পড়েছে। ঠিক সেভাবেই সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এমন (মানসিক ভারসাম্যহীন) পাগলদের বাঁচিয়ে রাখতেও সবাইকে একহয়ে কাজ করতে হবে।  


কিশোরগঞ্জ/টিপু

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়