ঢাকা, বুধবার, ৬ ভাদ্র ১৪২৬, ২১ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কাঁটা ও কাঁটা || মনি হায়দার

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-০৬-৩০ ৫:৩৪:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:২৯ এএম
Walton E-plaza

‘রাকিব? তুমি কোথায়?’

‘নিচে, লাইব্রেরিতে স্যার।’

‘আমার রুমে আসোতো একটু’...লাইন কেটে দেন আসরার আদনান। কিন্তু ভয়ানক ভাবনায় পড়ে রাকিব। কেন ডিরেক্টর স্যার ফোন দিলেন? তাও প্রায় এক মাস পরে। আমার বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যাবেন কি? ভাবতে ভাবতে লাইবেরি থেকে বের হয়ে সিঁড়িতে পা রাখে। এক মাস আগে ঝোঁকের মাথায় ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলার পর খুব তৃপ্তি পেয়েছিল রাকিব- একটা সাহসের কাজ করেছি। বুঝিয়ে দিয়েছি, সব মানুষ কেনা যায় না।

কিন্তু দুদিন পরেই ভাবনাটা উল্টো দিকে টার্ন নেয়, কাজটা ঠিক করলাম? আসরার আদনান ডিরেক্টর। আমি দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা মাত্র। আমার ছয় ধাপ ওপরের বস, তার মুখের ওপর...

 

ভাবতে গিয়ে নিজের ভেতরে ওলটপালট অবস্থা। নিজের  হাত কামড়ায়, কেন স্যারকে ওসব বলতে গেলাম! এখন কি মাপ চাইব? রাতে নিজের রুমে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, সকালে গিয়ে স্যারের কাছে ক্ষমা চাইব। একটু হালকা লাগে রাকিবের সিদ্ধান্তটা নিতে পারায়। ডিরেক্টর স্যারকে যতটুকু চেনে নিশ্চয়ই মার্জনা করবেন। কিন্তু সকালে এসে আসরার আদনানের রুমের সামনে গিয়ে নিজেকে খুব ছোট মনে হলো রাকিবের।

স্যার যদি উপহাস করেন? যা বলার তো বলেছি, ফিরিয়ে নেয়ার কোনো মানে হয় না। নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে ডিজিকে বলে আমাকে ঢাকার বাইরে ট্রান্সফার করতে পারেন- এই তো শাস্তি! ট্রান্সফার করলে মেনে নেব। না, স্যারের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। নিজের মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে রুমে চলে আসে রাকিব।

রাকিব হাসানদের অফিসটা সরকারি। সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করে অনেক ধরনের কাজ করার চেষ্টা করেছে রাকিব কিন্তু কোথাও নিজের মতো করে স্থিত হতে পারেনি। পত্রিকায় চাকরি করেছে তিন বছর, কিন্তু পত্রিকাটা বন্ধ হয়ে গেলে বেকার রাকিব হাসান ঢাকা শহরে অনেক ঘুরেছে একটা চাকরির জন্য। এলাকার পরিচিত এক বড় ভাইয়ের হাত ধরে ঢুকেছিল একটা টিভি চ্যানেলে। কিন্তু মাস চারেক যাওয়ার পর ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। দিন নেই রাত নেই- নায়ক আর নায়িকাদের পেছনে পেছনে ছোটো। তারা কী খায়, কী পছন্দ করে খোঁজ রাখো এবং একই বক্তব্য নানা আঙ্গিকে প্রচার করো, বিরক্তির এক শেষ। চাকরি ছেড়ে চেষ্টা করেছে টিউশোনির। কিন্তু তথৈবচ।

তাহলে কি আমাকে দিয়ে কিছু হবে না? মেসে রুমে শুয়ে শুয়ে নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করছে রাকিব। কি করবে কোথায় যাবে বুঝে ভেবে উঠতে পারছিল না। বৃদ্ধ পিতার ঘাড়ে সিন্দাবাদের মতো চাপতে রাজি নয়। হঠাৎ বাবা অসুস্থ হলে কুষ্টিয়া যায়। যাওয়ার সময়ে বাসে দেখা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহতাব খানের সঙ্গে। পাশাপাশি সিট হওয়ায় স্যারের একটু সেবাযত্ন ও করেছে রাকিব। মাহতাব খান কুষ্টিয়া যাচ্ছিলেন একটা সেমিনারে। যেতে যেতে রাকিবের চাকরিবাকরির খবর নিয়ে সব জেনে বললেন, ‘তুমি ঢাকায় ফিরে আমার সঙ্গে দেখা কোরো।’ বাসার ঠিকানাও দিলেন।

 

রাকিব কার্ড নিলেও খুব ভরসা করেনি। অতীতের অভিজ্ঞতায় জেনেছে- প্রথমে আগ্রহ নিয়ে কার্ড দিলে পরে কিছু করে না। বরং বাসায় গেলে বিরক্ত হয়েছে অনেকে। মানুষের দ্বৈততার খেলাটা এখন বোঝে রাকিব হাসান। কার্ডটা পকেটে রেখে দেয়।

বাবা সুস্থ হলে ঢাকায় এলেও মাস খানেক মেসে ঝিম মেরে ছিল রাকিব। এমন নিদাঘ সময় মানুষের জীবনে আসে- যখন নিজেকেই নিজের ভালো লাগে না। হাতে খুব বেশি টাকাপয়সাও নেই, যা আছে কয়েক দিন চলবে। টাকাটা ফুরিয়ে গেলে কী করবে? কী খেয়ে বেঁচে থাকবে? মাস শেষে মেসের টাকা কে দেবে? নানা মাত্রিক ভাবনায় জারিত রাকিব বিছানা ঝাড়তে গিয়ে মাহতাব খানের কার্ডটা পায়। বিকেলে কার্ডটা নিয়ে মাহতাব খানের ওয়ারীর বাসায় গেলে প্রকৃতপক্ষে ভালো অভ্যর্থনা পায়। মাহতাব খান রিটায়ার্ডের টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছেন। ছেলেও ভালো চাকরি করে- বৃদ্ধ বয়সে এখন সভা-সেমিনার করে বেড়ান।

চা-নাশতায় মাহতাব খান বলেন, ‘রাকিব তুমি কালকে আবদুল গণির সঙ্গে দেখা করো। তোমার ব্যাপারে আমি বলে রেখেছি। গণি আমার প্রথম দিকের ছাত্র। গেলে একটা উপায় হবে। আর গণি এখন খুব ক্ষমতাবান মানুষ। আমার ধারণা, তোমার একটা কাজ হবেই।’

পরের দিন আবদুল গণির সঙ্গে দেখা করলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সিভি এনেছো?’

‘এনেছি।’

‘দাও।’ আবদুল গণি খুব ব্যস্ত মানুষ। তবু মনোযোগ দিয়ে সিভি দেখলেন। দু-একটা প্রশ্নও করলেন। এবং টেবিলের ফাইলের স্তূপের মধ্যে সিভি রেখে দিয়ে বললেন, এই মাসের শেষ সপ্তাহে দেখা করো।

 

রাকিব হাসানের মনে হয়, আবদুল গণি ওর সঙ্গে একটা ঠান্ডা ধরনের নাটক করেছেন। মনে হচ্ছে, এই মাসের শেষ দিকে এলে একটা ডুমুরের ফল হাতে দিয়ে বলবেন, ‘গ্রামের বাড়ি যাও। অনেক তো ঘোরাঘুরি করলে এবার বাড়ি গিয়ে পেছনের পুকুরের পাড়ে যে বেলগাছটা আছে, তার পাশে আমার দেয়া এই ডুমুরের ফলটা লাগাও। দেখবে, কয়েক মাস পর অঙ্কুরোদগম হয়ে বিশাল গাছ হবে। সেই গাছে অনেক ফল হবে, সেই ফল বিক্রি করে তুমি অনেক টাকা পাবে। সেই টাকা দিয়ে তুমি একটা মুরগি কিনবে...।’

এগারো বারো দিনের নরক বাস করে রাকিব হাসান আবদুল গণির সঙ্গে দেখা করলে তিনি একটি নিয়োগপত্র ধরিয়ে দেন। নিয়োগপত্রটি অভিনব। অস্থায়ী নিয়োগ, প্রতি চার মাস পর পর আবেদন করতে হবে, আবার চাকরি চার মাসের জন্য কর্তৃপক্ষ দেবে। কর্তৃপক্ষ সুযোগমতো পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেবে। রাকিব হাসান যখন নিজেকে ক্রমাগত পারদের তলানিতে নিয়ে গেছে, জীবন যখন অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছিল তখন এই নিয়োগপত্রটি নিয়ে এসেছিল অসহ্য স্বস্তি। এবং আস্থা। নিজের ভেতরে আবিষ্কার করেছে একধরনের শক্তি।

 

যথারীতি চাকরিতে জয়েন করেছে রাকিব। প্রথম কাজই হয় ডিরেক্টর আসরার আদনানের দপ্তরে। এক একটি অফিসে অনেক প্রকারের দপ্তর থাকে। গ্রামের বাড়িতে মোবাইলে খবরটা দিলে বৃদ্ধ বাবা আনন্দে কাঁদলেন। মা আপ্লুত হয়ে মেয়ে দেখতে শুরু করেন। আদনান মানুষটা সহজ কিন্তু কখনো কখনো মচকে গেলে খুব বিপজ্জনক। রাকিবের খোঁজখবর নিয়ে বললেন, বিয়ে করো। বয়স হয়েছে।

স্যার পাত্রী খুঁজছে মা।

গুড।

রাকিবের সঙ্গে বিয়ের কথা বলার তিন-চার দিন পর আদনান ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার মায়ের পাত্রী খোঁজার খবর কী?’

‘খুঁজছে, ছবি পাঠাচ্ছে কিন্তু আমার পছন্দ হচ্ছে না স্যার।’ 

‘আমার খোঁজে একটা মেয়ে আছে’-আদনান বলেন।

‘তাই নাকি স্যার?’

‘হ্যাঁ।’

‘মেয়েটি কী করে স্যার?’

‘চাকরি করে। বেসরকারি একটা ব্যাংকে। বেতন খারাপ না। যদি তোমাদের বিয়ে হয়, দুজনে মিলে চমৎকার চলে যাবে।’

‘কিন্তু মেয়েটি আপনার কি হয়?’

‘সেটা পরে জানলেও চলবে। গত কয়েক মাসে তোমাকে দেখে, তোমার সঙ্গে কাজ করে আমার মনে হয়েছে তুমি দায়িত্বশীল মানুষ। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে আমি ফোন নাম্বার দিতে পারি। দেব?’

‘দিন স্যার।’

আদনার নিজের মোবাইল সেট থেকে নাম্বার বের করে একটা কাগজে লিখে দেয়। সঙ্গে মেয়েটির নামও, লুনা। লুনা! বেশ নাম, আপন মনে আওড়ায় নামটি। ‘ওর সঙ্গে আলাপের রেজাল্ট আমাকে জানিও রাকিব।’

‘জানাব স্যার!’

 

নিজের টেবিলে এসে দেখতে পায়, উপপরিচালকের কাছে পাঠানো ফাইল ফেরত এসেছে। কেন? ফাইল খুলে দেখতে পায়, উপপরিচালক সই করেনি। ছোট্ট একটা আলগা কাগজে লিখে পাঠিয়েছেন, আপনি নোট ফাইলে, বিশেষ করে যে ফাইলে টাকার লেনদেন থাকে, সেই ফাইলে সিগনেচার করবেন না। কারণ, আপনি আমাদের দপ্তরের স্থায়ী নন। আপনার পাশের লাজিনাকে দিয়ে সই করিয়ে ফাইল পাঠান।

লুনাকে নিয়ে যখন একটা চিত্রকল্প বুকের গহিনে আঁকতে শুরু করেছিল রাকিব, ভাবছিল ফোন করে প্রথমে কি বলবে লুনাকে? লুনা, ‘আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ ‘দূর, শুরুতেই দেখা করতে চাই’ বলাটা ঠিক হবে না। বলব, ‘আপনি লুনা বলছেন?’

‘হ্যাঁ, আমি লুনা বলছি। কিন্তু আপনি কে?’

‘আমি? রাকিব হাসান। এই কিছুক্ষণ আগে আপনার নাম্বারটা আমাকে দিয়েছেন ডিরেক্টর আসরার আদনান। আমরা একই অফিসে চাকরি করি।’

লুনা হাসবে নিশ্চয়ই, বলবে, ‘ও আচ্ছা। তো আমি আপনার জন্য কি করতে পারি?’

কিন্তু আমি তো চাকরি করি না। আমার এই চাকরি স্থায়ী না। যেকোনো সময়ে কর্তৃপক্ষ বলতে পারে, কাল থেকে আপনার আসার দরকার নেই। অথচ একটা বিশাল অফিস। নিয়মিত আসছি, কাজ করছি কিন্তু আমার কোনো অধিকার নেই। আমি পরিত্যক্ত একটা কাগজ। সেই কাগজ, যাতে কোনো কিছু লেখা নেই। রাকিব সামনে ফাইলটা খুলে নাড়াচাড়া করে আর ভাবে, কি করব আমি? অ্যাডহকের চাকরি দেখতে দেখতে দেড় বছর হয়ে গেল। ডিজি স্যারের দেখা হলেও এত মানুষ থাকে তাকে ঘিরে, আলাপ করার সুযোগ হয় না। রাকিব তো একা নয়, একসঙ্গে নয়জন অ্যাডহক নিয়োগ পেয়েছে। সবাই কাজ করছে অফিসে। কিন্তু প্রত্যেকের ভেতরে একধরনের গ্লানি কাজ করে। কাজ করছে ঠিকই কিন্তু মনে হচ্ছে এই বিশাল প্রতিষ্ঠানে আমরা কেউ না। আমরা বাইরের। আমরা পরগাছা। আমাদের পায়ের তলায় মাটি নেই। মাটি যে নেই রাকিব বুঝেছিল আরো মাস আটেক আগে। পাশের একটা রুমে দুপুরের খাবার খায় অফিসের কয়েকজনে। রাকিব বরাবরই বাইরে খায়। দোতলার রুমকি একটা কাজে হঠাৎ বাইরে গেলে ফোনে জানায়, ‘রাকিব আমি বাইরে খাবো। আমি বাসা থেকে খাবার এনেছি। তুমি খেয়ে নিও।’

খুশি হয় রাকিব, থ্যাঙ্কস।

 

রুমকিও অ্যাডহকে আছে। চাকরির নানা বিষয়ে দুজনের মধ্যে কথা হয়। একটা নৈকট্য আছে। রুমকির জামাই সচিবালয়ের ভালো চাকরি করে। তো রুমকির খাবারটা নিয়ে পাশের রুমে যায়। দেখে, আগেই সবাই খেয়ে গেছে। টেবিলে ময়লা। পিয়ন ওবায়দুলকে ডেকে টেবিলটা পরিষ্কার করতে বললে, ওবায়দুল কঠিন চোখে তাকায়- দিতাছি।

অপেক্ষা করছে রাকিব। কিন্তু ওবায়দুলের দেখা নেই। প্রায় মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে থেকে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে রাকিব দেখতে পায় ওবায়দুল, সিগারেট টানছে সহকর্মীর সঙ্গে। আর হি হি হাসছে। মেজাজ চড়ে যায় রাকিবের, একটু ঘুরে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, ‘আমি ভাত খাব। তোমাকে বললাম টেবিলটা পরিষ্কার করতে। না করে তুমি এখানে আড্ডা মারছো? ব্যাপারটা কি?’

‘হোনেন স্যার, আমরা অ্যাডহকের কাম করি না।’

 

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

 

রাকিবের ইচ্ছে হলো মরে যাই। ওবায়দুলের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে। সঙ্গের কলিগ তাড়া দেয়, ‘ওবায়দুল, এইডা ঠিক না। তুই স্যারের কামডা কইরা দে।’

ওবায়দুল ঘাড় নিচু করে চলে যায়। ওই দিনটি, ওবায়দুলের মন্তব্য- ‘আমরা অ্যাডহকের কাম করি না।’ দীর্ঘদিন করোটির ভেতরে সুইয়ের মতো গেঁথে ছিল। ক্ষমতা এমন এক তরবারি, যার নিচে গেলেই কেটে যায়। রক্তপাত কেউ দেখে না। ক্ষমতার মাঝখানে ছোট্ট একটা টেবিল কিন্তু ব্যবধান কোটি কোটি কিলোমিটার। আর একবার তিক্ত প্রমাণ পেল নিজের জীবনে, যখন ঘনিষ্ঠ হলো লুনার সঙ্গে।

অপমানের বিষ হজম করে লুনাকে পরের দিন ফোন করে। দীর্ঘক্ষণ রিং বাজলেও রিসিভ করে না। মনটা খারাপ হয়। আবার রিং করে। দ্বিতীয় টোন হবার সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরে, ‘হ্যালো?’

‘লুনা বলছেন?’

‘বলছি। আপনি কে?’

‘আমি রাকিব হাসান। আদনান স্যার আপনার ফোন নাম্বারটা আমাকে দিয়েছেন।’

 

সঙ্গে সঙ্গে লুনার কণ্ঠস্বরটা বেশ নরম হয়ে আসে, ‘দুলাভাই বলছিল আপনি ফোন করতে পারেন। কিন্তু আমি তো খুব ব্যস্ত। আপনি কি চারটায় বা সাড়ে চারটায় আমাকে ফোন দিতে পারবেন?’

‘অবশ্যই পারব।’

‘ঠিক আছে, আমরা তখনই কথা বলব।’ বাই, বাই শব্দটা সুরের সঙ্গে শেষ করে লুনা। একটা ভালো লাগার বন্যার রেশ রয়ে যায় রাকিবের অস্তিত্বজুড়ে। বিকেলে ফোন করে দুজনে টিএসসিতে দেখা করে। লুনা খুব আকর্ষণীয় নয়, কিন্তু অস্বীকার করার মতোও নয়। হালকা পাতলা গড়নের কিন্তু নিতম্বটা ভারী শরীরের তুলনায়। বেশ চুল। কথায় তুখোড়। পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কথা হয়, কার কোন সিনেমা ভালো লাগে- তালিকা করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে দুজনে। প্রতি রাতে ফোনে হিসাব ছাড়া কথা বলতে থাকে। সেইসব কথায় ভবিষৎ দাম্পত্য জীবন, সন্তান, ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা- সবই থাকে। আর অফিসের পর প্রায়ই দুজনে দেখা করে। রিকশায় উঠে হুড তুলে মুখে মুখে আদর নেয়। নিতে নিতে লুনা হঠাৎ বলে, ‘এভাবে আর পারা যায় না।’

‘কোনভাবে?’

‘এই যে রিকশায় সওয়ার হয়ে শুধু শুধু মুখে মুখে আদর নেয়া! একটু হাত ধরা, কোমর জড়িয়ে বসে থাকা- আমার ভালো লাগে না। তোমার বাসায় চলো-

‘বাসায় তো আমি একা থাকি না।’

‘জানি তো। ‘বন্ধুদের একদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য বাইরে পাঠাও। ওরা কি বাইরে যায় না?’

‘তিনটা রুমের একটা বাসা তো। কেউ না কেউ থাকেই’- বিষণ্ন কণ্ঠ রাকিবের। আহা, লুনা কত সহজে ধরা দিয়েছিল অথচ...। নিজেকে বিশাল মাঠের এক অলীক প্রাণী মনে হয়। জীবনের টুকরো টুকরো সুখগুলো এইভাবে গহিন গাঙে হারিয়ে যায়।

 

লুনার সঙ্গে সংযোগের পর আসরার আদনানের সঙ্গে রাকিবের সম্পর্কটা আরো কাছাকাছি আসে। অফিসের অনেক কাজ ওকে দেয়। অনেক সমস্যা শেয়ার করে। রাকিবকে আগের চেয়ে একটু প্রশ্রয়ও দেয়। লুনার কাছেই জেনেছে- আসরার হচ্ছে চাচাতো দুলাভাই। লুনার সঙ্গে বিয়ে হলে আদনান হবে ভায়রা। অফিসে একটা প্রভাবও বাড়বে। আসরার আদনানের চাকরি আছে এখনো আট বছর। শোনা যাচ্ছে ডিজিও হতে পারেন। সরকারের ওপর মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ভালো। হলে তো পোয়াবারো। রঙিন স্বপ্নে যখন রাকিব বিভোর ঠিক সেই সময়ে কেটে যায় রঙিন সুতো।

হঠাৎ লুনার দিক থেকে যোগাযোগ কমে আসে। ঘটনার মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারে না রাকিব। ওর অফিসে যেতে একপ্রকার নিষেধই করেছে। ফোন তো করেই না। রাকিব ফোন দিলে নানা ধরনের বানাহার প্রসঙ্গ তোলে। আসরারের কাছে ঘটনার কোনো ক্লু পাওয়া যায় কি না, ভেবে রুমে গেলে আসারর জানায়- ‘রাকিব, সবই ঠিক আছে। কিন্তু একটা ঘটনা ঘটেছে-’

‘কি ঘটনা স্যার?’

‘আমিও নিজে প্রথম দিকে অতটা গুরুত্ব দিইনি। তোমার ভাবি প্রায়ই বলত লুনার জন্য একটা ছেলে দেখতে। হাতের কাছে তোমাকে আমার যোগ্য মনে হয়েছে বলেই তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছি।’ একটু থেমে আসরার বলেন, কিন্তু-

‘স্যার কিন্তুটা কী?’

‘এখানে তোমার চাকরিটা অ্যাডহক, স্থায়ী নয় শুনে লুনা প্রবল রিঅ্যাক্ট করেছে। এ বিষয়ে তোমাদের মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি?’

‘না।’

‘তোমার ভাবিও দেখলাম লুনার পক্ষে। বোঝাই তো, মানুষ মাত্রই নিরাপত্তা চায়।’

‘কিন্তু স্যার, আপনি তো জানেন আমাদের ইন্টারভিউ হবে সামনের মাসে’, আহত গলায় বলে রাকিব। ‘চাকরিটা আমার হবে- কনফার্ম।’

‘জানি। লুনাকে আমি যথেষ্ট বুঝিয়েছি। কিন্তু এই সময়ের মেয়ে, সবকিছুর আগে চায় আর্থিক নিরাপত্তা। তোমার চাকরি স্থায়ী না হয়, তখন কী কী বিপদের সামনে পড়বে, যদি বিয়ে হয় তোমাদের মধ্যে- আমাকে এক এক করে বারোটি বিপদের ঘটনা বলছে, বুঝতেই পারো।’

‘ঠিক আছে স্যার!’

 

রুম থেকে চলে আসে রাকিব হাসান। বুকটা হাহাকারে ভরে গেছে। এমনও মানুষ হয়? একজন নারী প্রেম গড়ে তোলে পুরুষের চাকরির স্থায়িত্বের ওপর ভর করে? অ্যাডহকের চাকরি তাই প্রেম প্রত্যাহার করে নিয়েছে? অস্বীকার করেছে গত কয়েক মাসের সম্পর্ক! মানুষ কি মানুষের ওপর নির্ভর করে না? নিজের প্রতি একধরনের বিবমিষা তৈরি হয় রাকিবের। চার দিনের ছুটি নিয়ে চলে যায় কক্সবাজার। সমুদ্রতীরে অবগাহন করে একধরনের স্থিতি নিয়ে ফিরে আসে ঢাকায়। এবং আশ্চর্য, রাকিব হাসান আগের চেয়ে কথা বলা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। প্রায় কারো সঙ্গে কথা বলে না। রুমে চুপচাপ থাকে। মেসেও চুপচাপ। নিঃশব্দে, দাঁতে দাঁত চেপে সময় পার করছে। এবং সকল জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অ্যাডহকের ঝুলন্ত পেন্ডুলাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন আবদুল গণি। নয়জনের সঙ্গে রাকিবকেও স্থায়ী নিয়োগ দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর নিজেকে মানুষ মনে হলো। মুক্তির এবং স্বস্তির নিঃশ্বাসে বুকটা ভরে যায়। মাঝখানের জটিল জটিলতাকে অতিক্রম করে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আসরার আদনান অভিনন্দন জানিয়েছেন। নতুন উদ্যমে কাজ করে যেতে বলেছেন। নতুন উদ্যমে কাজ করে রাকিব হাসান।

 

সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার রুমে ডেকেছেন আসরার আদনান। অনেক কথা বলার পর আসল কথাটা বলেন তিনি, ‘রাকিব তোমাকে একটা ভালো সংবাদ দিতে চাই। জানি, তুমি পছন্দ করবে।’

‘কী সংবাদ স্যার?’

‘লুনা এখনো তোমার অপেক্ষায় আছে। যা হবার হয়ে গেছে। তোমরা তো একে অপরের কাছে এসেছিলে। স্মৃতি চাইলেই মুছে দেয়া যায় না। আর বৃহত্তর জীবনের জন্য ছোটখাটো ভুল ক্ষমা করে দেয়াই ভালো। দুদিন আগে লুনা বাসায় এসেছিল। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়-’

মুহূর্তমাত্র, স্প্রিং মেশিনের গতিতে দাঁড়ায় রাকিব, ‘স্যার কিছু মনে করবেন না। যেহেতু আপনার মাধ্যমে লুনার সঙ্গে আমার পরিচয়, আপনার মাধ্যমে সেই পরিচয়ের সুতো ছিঁড়ে গেছে। এখন আমি আপনার মাধ্যমেই লুনাকে জানিয়ে দিতে চাই, লুনাকে আমি ঘৃণা করি।’

‘মানে?’

‘আমি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে বিশ্বাসী। চাকরির স্থায়িত্ব, ক্যারিয়ার আর টাকাপয়সার হিসাব দেখে আমি  মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ি না। আসি স্যার!’

রাকিব দ্রুত রুম ত্যাগ করে। পাথরের ভঙ্গিতে বসে থাকে আসরার, ছেলেটাকে চিনতে ভুল হয়েছিল আমার! নিজের মনে স্বীকার করে নিলেন আদনান।

 

সেই ঘটনার পর আজ কেন ডেকেছেন আসরার আদনান? আমাকে কি ঢাকার বাইরে পাঠাবেন? নাকি লুনাকে বিয়ের জন্য চাপ দেবেন?

বিষণ্ন মনে রুমে ঢুকলে আসরার বলে, ‘বসো।’

দাঁড়িয়ে থাকে রাকিব, ‘ঠিক আছে স্যার।’

আরে বসো না! ‘চা খাবে?’

বসে চেয়ারে, ‘স্যার চা খাবো না।’

দুজনার মাঝখানে অস্তস্তিকর নীরবতা।

‘রাকিব, তোমার সেই দিনের প্রতিক্রিয়ায় আমি খুব আহত হয়েছিলাম। প্রচ- রাগও হয়েছিল তোমার ওপর। কিন্তু দিন যত গেছে ঘটনা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। মনে হয়েছে, মাঝে মাঝে এভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। মানুষ হিসেবে মানুষের পরিচয় রাখা খুব জরুরি। তোমাকে অভিনন্দন।’

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জুন ২০১৬/এএন/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge