ঢাকা, শুক্রবার, ৮ ফাল্গুন ১৪২৬, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘কাঁটা’ সিনেমার গাড়িটা...|| টোকন ঠাকুর

টোকন ঠাকুর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-১৩ ১:১১:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৮-১৩ ৩:৪৭:১৪ পিএম
গাড়িটা ফেরত নিয়ে গেলেও আমাদের মনে থেকে যাবে মায়া ...

বিমল ট্যাক্সি ড্রাইভার। ছোট মফস্বলে একা থাকেন তিনি। ‘১৯২০ সার্ভোলেট জালোপি’ ট্যাক্সিটির নাম রেখেছিলেন ‘জগদ্দল’। এই ট্যাক্সিটিই বিমলের একমাত্র সঙ্গী। ‘জগদ্দল’ ভাঙাচোরা হলেও সেটিই ছিল তাঁর নয়নের মণি। একটি যন্ত্রশিল্প-বিবর্জিত এলাকায় সেই ট্যাক্সিটিতে চড়িয়ে মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে দিয়ে কাটছিল বিমলের বা জগদ্দলের জীবন। ‘অযান্ত্রিক’ ছবিতে ঋত্বিক ঘটক দেখালেন জগদ্দলের জীবন। অর্থাৎ জগদ্দল চলাফেরা করতে পারত! পারতই তো। আমরা দেখেছি। দেখালেন ঋত্বিক ঘটক, ১৯৫৮ সালে। কিন্তু ভূতের গলির ৩৬নং বাড়ির কোণায় যে গাড়িটি পড়ে আছে দীর্ঘদিন, যার কোনো নামটামও নেই। গাড়িটিকে মনে হয় একটি অচল ঘড়ি। শহীদুল জহিরের ‘কাঁটা’ গল্পের প্রধান চরিত্র বাড়ির মালিক ভূতের গলির আব্দুল আজিজ ব্যাপারি। কিন্তু গাড়ির মালিক কে? আজিজ ব্যাপারি নাকি অন্য কেউ?

এ বিষয়ে ভূতের গলির লোকজনেরা তেমন কিছু বলতে পারে না। তবে এইটুকু জানা যায়, এই গাড়ি ১৯৬১ সালের মডেলের। তখন কে চালাতেন এই গাড়ি? তাঁর কি লং ড্রাইভ করার ইচ্ছে ছিল? কিচ্ছু জানা যায় না, কারণ স্থবির-অনড়-নিশ্চল গাড়িটি পড়ে আছে ভূতের গলির ৩৬নং বাড়ির বাম পাশে। গাড়ির টায়ার ঘিরে ঘাস গজিয়ে গেছে। কত বছর আগে এই গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়েছে কেউ জানে না। একবার আমরা দেখলাম গাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়ানো পাঁচিলের গায়ে লেখা একটি স্লোগান: ‘হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন মানি না, বাতিল করো, পূর্বপাকিস্তান, ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর শাখা।’  আমরা জানি, ১৯৬২ সাল পাকিস্তান সরকারের শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ছাত্রদের মধ্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। তার মানে দেয়ালের স্লোগানটি লেখা ১৯৬২ সালে, নাকি ৬৩ সালে, নাকি ৬৪ সালে? অবশ্য ১৯৬৪ সালে কলকাতা ঢাকায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ঘটেছিল। সেটা ঠিক দাঙ্গা কি? কলকাতায় মার খেল বাঙালি মুসলিমরা, ঢাকায় মার খেল বাঙালি হিন্দুরা। সে গল্পের ছিটেফোঁটার ধাক্কা ‘কাঁটা’য় দৃশ্যমান থাকবে। এছাড়াও গাড়ির ওপাশে স্লোগান লেখা থাকবে: ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব...’ এবং ১৯৮৯-৯০ সালে লেখা দেখেছি, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’
 

সব্বার কাছে ঋণী আমি, লহো লহো প্রেম


আমাদের ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’ চিত্রনাট্যের চাহিদা অনুযায়ী একটি অচল গাড়ির দরকার ছিল। প্রায় ১০০ বছর বয়সী একটি বাড়ির সামনে গাড়িটি ঘুমিয়ে থাকবে, নড়বে না। গাড়ির টায়ারের কাছে ঘাস গজিয়ে যাবে। এমনকি একটা টায়ার কেউ খুলে নিয়ে গেছে মনে হবে। বসন্তের শুকনো পাতার রঙে গাড়িটির নীল রং ক্ষত করে দিয়ে যাবে। মনে হবে রং উঠে গেছে, জীবন বড় বিবর্ণ। মনে হবে, বহুদিন আগের অনেক রকম কথা আর হাসাহাসি থমকে গিয়ে পরিত্যক্ত হয়ে আছে ৩৬ ভূতের গলি, নারিন্দার বাড়ির সামনের এই গাড়ি। কিন্তু এরকম গাড়ি আমরা পাবো কোথায়? শ্যুটিং শুরু হওয়ার আগে প্রডাকশনের লোকেরা উত্তর মেরু-দক্ষিণ মেরু করে এসে বলল, একটা ভক্স ওয়াগন পাওয়া গেছে। মালিক পীর।
বললাম, ‘পীরবাবাকে ধরো।’ প্রডাকশন বলল, ‘গাড়িটা মালিবাগের এক গ্যারেজে থাকলেও পীরবাবা থাকেন ময়মনসিংহে।’ বললাম, ‘ময়মনসিংহে খোঁজ লাগাও।’

খোঁজ আর এলো না। তখন প্রডাকশনকে বললাম সিক্সটিজ মডেলের একটা গাড়ি পাওয়া যাবে না ঢাকা শহরে? একদিন এই নিয়ে খেদ পাড়ছিলাম অভিনেতা কায়েস চৌধুরীর সামনে। কায়েস চৌধুরী কে জানেন? স্বয়ং আব্দুল আজিজ ব্যাপারি। ৩৬ ভূতের গলির বাড়ির মালিক। একলা মানুষ, ষাটোর্ধ্ব বয়স, তার বাড়িতেই ভাড়াটিয়া হয়ে এসে বাস করছে এক দম্পতি। দম্পতির নাম সুবোধচন্দ্র দাস ও স্বপ্না রাণি দাস। দম্পতি কি এক জোড়া? তিন-চার জোড়া। কমপক্ষে চারজন সুবোধ, চারজন স্বপ্নাকে দেখা যাবে ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’-এ। সবমিলিয়ে একটা চারুকলা চারুকলা ব্যাপার কিন্তু আমার কাজে থাকেই। নিজেও তো ওই স্কুলেরই ছাত্র ছিলাম। তা না হলে শেষ পর্যন্ত চারুকলার ছাত্র মেজবাউর রহমান সুমনের গাড়িটা কি ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’-এর সেটে আসে। কীভাবে এলো? সেকথা একটু পরে বলছি। আগে বলি সুবোধদের গল্প। আমাদের চারটার মধ্যে দুইটা সুবোধ চারুকলার ছাত্র। এক, অনিমেষ আইচ, দুই, শিবু কুমার শীল। দুজনেই নির্মাতা। শিবু গানের দল ‘মেঘদল’-এর কর্ণধার, যদিও মেঘদল-এর অপর দুইজন মাসুদ হাসান উজ্জল ও মেজবাউর রহমান সুমন-  দুজনেই নির্মাতা। আর অনিমেষ নির্মাতা হিসেবে যেমন স্বাক্ষর রেখেছে, মেজবাউর রহমান সুমন, মাসুদ হাসান উজ্জল ও শিবু কুমার শীল- ওরাও স্বাক্ষর রাখছে। অনিমেষের বানানো ‘গরম ভাত’ অথবা ‘নিছক ভূতের গল্প’ খুব সুন্দর কাজ। সুমনের বানানো ‘তারপরও আঙুরলতা নন্দকে ভালোবাসে’ খুব সুন্দর কাজ। শিবুর ডকু-ফিকশন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প অবলম্বনে ‘খোয়ারি’ একটি ভালো কাজ। উজ্জল টেলিভিশন প্রডাকশনে নিজের স্বাক্ষর রেখেছে। এখন ব্যস্ত ডেবু ফিল্ম ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ নিয়ে। অনিমেষ এরই মধ্যে দুটি ছবি শেষ করে তৃতীয় ছবি নির্মাণের পথে। এবং শহীদুল জহিরের গল্প ‘কাঁটা’ নিয়ে নির্মিত টিভি প্রডাকশন ‘কাঁটা’ও দর্শকের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। আমাদের ছবি ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’-এ অনিমেষ একজন সুবোধ চরিত্রে অভিনয় করেছে। যে কথা আগেই বলেছি। এতক্ষণ ঘুরেফিরে যাদের কথা বললাম, ওরা সব্বাই এবং আমিও চারুকলার ছাত্র। সেজন্যই বলছিলাম আমার কাজে চারুকলা চারুকলা রঙের গন্ধের ব্যাপারটা থেকেই যায়।

গাড়িটা থেকে যাবে ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’ ছবিতে, ভূতের গলিতে অগণন দর্শকের মনে


গ্রাফিক্স, পোস্টার, ক্যালেন্ডার, দৈনিক পত্রিকা- এসব নিয়ে ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’- কে অনেক ব্যস্ত জীবনের মধ্যে থেকেও নারিন্দার ‘কাঁটা’ ক্যাম্পে এসে সময় দিয়ে যাচ্ছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। একাধিক বাবুই পাখির বাসা ও সাইবেরিয়ান কোন হৈম নদীর জল কাচের বোতলে ভরে পাঠিয়েছেন মাসুক ভাই, শিল্পী মাসুক হেলাল ‘কাঁটা’র সঙ্গে সর্বাঙ্গীন জড়িত; শিল্পী কণক আদিত্য ও দেশের সৃজনশীল বুটিক হাউজ দেশালের চেয়ারম্যান শিল্পী ইসরাত জাহান কিংবা শ্যামপুরের টালি বাড়িতে যারা থাকে, ওরাও ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’-এর অংশ। ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’-এর প্রায় নব্বই জন নারী চরিত্রের জন্য দেশাল থেকে দেয়া হয়েছে দু’শো তেরটি রঙিলা বাহার নতুন শাড়ি। যা ‘কাঁটা’র দর্শকেরা ছবিতে নানানভঙ্গিতে দেখতে পাবেন। তো চারুকলার কথা যদি বলতেই হয় ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’-এর আর্ট ডিরেক্টর মাহামুদুর রহমান দীপন বা দীপনদা’র কথা আমি কীভাবে বলব? চারুকলায় দীপনদা আমার সিনিয়র। নির্জন গাছটার মত একা একজন মানুষ। আমার তাঁর কাজ ভালো লাগে। শিল্পীদের দলের নৌকায় তাকে যাত্রী হতে দেখি না। কারণ প্রতিভাবান বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য। গতবছর আমি যখন ফরাসগঞ্জ ছিলাম ‘কাঁটা’ জার্নির অংশ হিসেবে তখন থেকেই দীপনদা ‘কাঁটা’র সঙ্গে যুক্ত। নানান চড়াই-উতরাই পাড় হয়ে আমরা একসঙ্গে জার্নিতে আছি। দীপনদা’র সঙ্গে আর্ট ডিপার্টমেন্টে যুক্ত হয়ে কাজ করছে চারুকলার নবীন ছাত্র তন্ময় ও শক্তি। আর্ট টিমের অপর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রাসেল ‘কাঁটা’র প্রধান ম্যাজিক আব্দুল আজিজ ব্যাপারির উঠোনের কুয়োর কারিগর। চারুকলার শিক্ষক শেখ আফজাল একটি ব্যাগের ড্রয়িং করে পাঠিয়েছেন ‘কাঁটা’ টিমের জন্য। ব্যাগটি হচ্ছে ইপিআরটিসি বাসের টিকিট কন্টাকটরের টাকা রাখার ব্যাগ। ব্যাগটি তৈরি করার দায়িত্ব নিয়েছেন শক্তিমোহিত সুবির। শক্তি ও তন্ময় ‘কাঁটা’র দুই চরিত্র, দুই সুবোধের ভাই পরাণ। এবং দুজনেই চারুকলার ছাত্র। ওরা গঠন করেছে পরাণ ক্লাব।

১৯৮৯-৯০, ১৯৭১ ও ১৯৬৪-তিন সময়ের সুবোধ-স্বপ্নার ঘরের জন্য তিনটি আয়না তৈরি করে দিয়েছেন চারুকলা সিরামিকস্ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক শিল্পী ড. আজহারুল ইসলাম চঞ্চল। শিল্পী বিথীকা জোয়ার্দ্দার ও শিল্পী উত্তম সাহা চৌধুরীর মেয়ে তিস্তু আমাদের ছোট স্বপ্না। আমার মনে পড়ে, শীতসকালে খুলনা আর্ট কলেজের বারান্দার সামনে ছোট্ট বাগানে বসে ওয়াটার কালার করছে একদল ছেলেমেয়ে। তাদের মধ্যে একটি ছেলে একটি মেয়ে কাজের ফাঁকে চোখাচোখি করছে। মেয়েটির মাথাভর্তি চুল। মেয়েটির নাম বিথীকা, ছেলেটির নাম উত্তম। উত্তমের যমজ গৌতমও আর্টিস্ট, তিস্তুর মামা অনুপও আর্টিস্ট। বিথীকার বাসা থেকে কত কী ঘটি-বাটি-প্রপস্-কস্টিউম-রাধা কৃষ্ণ এসেছে ইয়ত্তা নেই। শিল্পী শাওন আখন্দ পাঠিয়েছে তিনটি হাতে বানানো পাখা। শিল্পী নাজমা আক্তার ‘কাঁটা’ টিমকে কত কি সাপোর্ট দিয়ে গেছেন কীভাবে বলি? শিল্পী সাদিক আহমেদের আঁকা একটি ড্রয়িং দিয়েই ‘কাঁটা’র অভিনয় অডিশনের বিজ্ঞাপন করা হয়েছিল।

‘অযান্ত্রিক’ ছবিতে ঋত্বিক ঘটক দেখালেন জগদ্দলের জীবন


কথা হচ্ছিল কিন্তু সুমনের গাড়ি নিয়ে। গাড়ি সম্ভবত সুমনের ছোট ভাই এবং একজন এডির। কিংবা এই গাড়ির মালিক ৩৬নং ভূতের গলির মালিক আব্দুল আজিজ ব্যাপারির। আমি কেউ না। অনিমেষকে বললাম, দেখো সুমনের গাড়ি। উজ্জল ও শিবুকেও দেখাইছি, এই গাড়ি দেখাতে চাই সমগ্র বাঙালি অনলাইন জাতিকে। রং মেরে গাড়ি আবার ঠিকঠাক করে ফেলা হবে। গাড়ি ফিরে যাবে নিকেতনে। কিন্তু গাড়িটা থেকে যাবে ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’ ছবিতে, ভূতের গলিতে অগণন দর্শকের মনে। তাই ‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’- এর সেট থেকে সুমনের গাড়িটা নিকেতনে ফেরত নিয়ে গেলেও আমাদের মনে থেকে যাবে মায়া, গাড়িটার জন্য। এরকম কোনো মায়াজালে আটকে গেছি বলেই আমরা আছি কয়েকমাস নারিন্দায়, ‘কাঁটা’র শ্যুটিং চলছে, আর পনের দিন গেলেই শ্যুটিং হয়ত শেষ হয়ে আসবে।

সব্বার কাছে ঋণী আমি, লহো লহো প্রেম

‘কাঁটা দ্য ফিল্ম’

১৩ আগস্ট, ২০১৮

নারিন্দা, ঢাকা।
 

আলোকচিত্র: হোসেইন আতাহার সূর্য​



 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ আগস্ট ২০১৮/তারা