ঢাকা, শুক্রবার, ৮ ফাল্গুন ১৪২৬, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘কাঁটা’ সুবোধ-স্বপ্না, আজিজ ব্যাপারির গল্প

টোকন ঠাকুর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-৩১ ৬:৫৪:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-০৭ ১২:৩২:১৬ পিএম
১৯৯০ সালে সুবোধ-স্বপ্নার চরিত্রে অনিমেষ আইচ ও তৃপ্তিরাণি

|| টোকন ঠাকুর ||


সুবোধকে নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’ ২০১৬-১৭ সাল থেকেই ঢাকার দেয়ালে গ্রাফিত্তি চিত্র দেখেছেন অনেকেই। সুবোধকে নিয়ে টকশো, পত্রিকার আর্টিকেল, ভিডিও চিত্র কত কিছু হয়ে যাচ্ছে। তারপরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, সুবোধ আসলে কে? সুবোধ বাংলাদেশের কোথায় থাকে? আপাতত কোনো মীমাংসা দেখা যাচ্ছে না। সুবোধকে নিয়ে গ্রাফিত্তি চিত্র হচ্ছে নগর কলকাতার দেয়ালেও। এর অর্থ, সুবোধকে নিয়ে প্রশ্নের ডালপালা ছড়াচ্ছে। দেশের সীমানা ডিঙিয়ে বাইরেও। সুবোধের রহস্য থেকেই যাচ্ছে।

শহীদুল জহিরের গল্প ‘মনোজগতের কাঁটা’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৫ সালে। আমাদের জানা মতে, ‘কাঁটা’র প্রধান চরিত্র সুবোধচন্দ্র দাস, সুবোধের বউয়ের নাম স্বপ্নারাণি দাস। আমরা মানে ভূতের গলির মহল্লাবাসীরা জানি, ‘ছুবোধচন্দ্রের বাইয়ের নাম ছবছম পরাণই হয়’। সুবোধ যে হিন্দু তা যেমন সত্য, আরও সত্য সুবোধচন্দ্র দাস ঋষিপাড়ার ছেলে। অর্থাৎ সুবোধ বংশে মুচি। বর্ণপ্রথায় একেবারে অচ্ছুত। তারপরও সুবোধচন্দ্র দাস সংসার করে পুরোনো ঢাকার ৩৬নাম্বার ভূতের গলিতে আজিজ ব্যাপারির বাড়িতে বউ স্বপ্নারাণি দাসকে নিয়ে; ভাড়া থাকে। ঢাকায় সিনেমা হলে চাকরি করে। গ্রামে তার ভাই পরাণচন্দ্র দাস ও মা থাকে। বাবা গতবছর দুর্গোপুজোর তিনদিন আগে গঞ্জের হাটে গিয়ে নিখোঁজ। এইটুকু তথ্য জানানো দরকার ছিল, জানিয়ে দিলাম।

১৯৬৪ সালের সুবোধ ও স্বপ্নারাণির ভূমিকায় সোহেল তৌফিক ও তিস্তা নদী

 

২০১২-১৩ অর্থবছরে অনুদানপ্রাপ্ত ছবি ‘কাঁটা’র বকেয়া অর্থ জোগাড় করার চেষ্টায় তিন-চার বছর চলে যাওয়ার পর গত অক্টোবর ২০১৭ থেকে ‘কাঁটা’ ছবির আনুষ্ঠানিক প্রি-প্রডাকশন ওয়ার্ক শুরু হয়। অনলাইনে অডিশন আহ্বান করে ৯০০ পাত্রপাত্রীর মধ্য থেকে ২৫০ জনকে গ্রহণ করা হয়। এরই মধ্যে ’কাঁটা’র চিত্রনাট্য ডেভেলপ করতে করতে ২৬তম ভার্সনে চলে আসি আমরা। ‘কাঁটা’র মগবাজারে সাত মাস সময়কাল ধরে আড়াইশজন নতুন পাত্রপাত্রীকে রিহার্সেল করিয়ে এ বছর এপ্রিলের ২ তারিখে ‘কাঁটা’ টিম চলে আসে নারিন্দায়, ভূতের গলিতে। প্রথম আড়াইমাস গেছে সেট নির্মাণে। তারপর শুরু হয় শ্যুটিং। আজ অক্টোবর ৩০, ২০১৮। ‘কাঁটা’র শ্যুটিং ৭০ শতাংশ শেষ। লাইনআপ এডিটিংও শেষ। এডিটিং চলছে শ্যুটিং লোকেশনেই। এখন বাকি ৩০ শতাংশ শ্যুটিংয়ের আয়োজন চলছে, পুরো টিম নিয়ে আমরা নারিন্দাতেই আছি। চিত্রনাট্যে শীতের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল কুয়াশা মোড়া ভোর, শীত এসে গেছে।


৯০-এর পর সুবোধ-স্বপ্না শিবু কুমার শীল ও পাপড়ি। কোলে পুত্রসন্তান বিশ্বজিৎ

 

‘কাঁটা’ গল্পটি এককথায় সুবোধ-স্বপ্নার গল্প। সুবোধ ও তার বউ স্বপ্না গ্রাম থেকে এসে পুরোনো ঢাকায় ৩৬ নাম্বার ভূতের গলির আব্দুল আজিজ ব্যাপারির বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে ওঠে। বাড়ির উঠোনে একটি কুয়া আছে। সুবোধের বউ স্বপ্না উঠোনের কোণায় একটি তুলসীগাছ লাগায়। তুলসীগাছ নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা নেই অকৃতদার আব্দুল আজিজ ব্যাপারির, সমস্যা আছে ভূতের গলির মহল্লাবাসীদের, মহল্লাবাসী মুসলিম। সুবোধ চাকরি করে সিনেমা হলে। সুবোধ-স্বপ্নারা একদিন কুয়ার মধ্যে পড়ে মারা যায়। একদিন দাদা-বৌদির খোঁজে আসে এক যুবক, যুবকের নাম পরাণচন্দ্র দাস। ‘কাঁটা’ ছবিতে সুবোধের সংখ্যা চারজন, স্বপ্নাও চারজন। আর দু’জন পরাণকে দেখা যায়। ১৯৮৯ সালে ভূতের গলিতে প্রথম সুবোধ-স্বপ্নাকে দেখা যায়, যারা মারা পড়ে পরের বছর ১৯৯০ সালের অক্টোবরের ৩১ তারিখে কিংবা নভেম্বরের ১ তারিখে। এই সুবোধ-স্বপ্নার নাম অনিমেষ আইচ ও তৃপ্তিরাণি। ১৯৭১ সালের সুবোধ-স্বপ্না হিসেবে এসে যারা মরে গেছে, তাদের নাম শ্রীমন্ত বসু ও চিন্ময়ী গুপ্ত। ১৯৬৪ সালে এসে যারা মারে গেছে, তাদের নাম সোহেল তৌফিক ও তিস্তা নদী।

১৯৭১ সালের সুবোধ-স্বপ্না শ্রীমন্ত বসু ও চিন্ময়ী গুপ্ত


১৯৪৬ সালে আজিজ ব্যাপারির বাবা হোসেন ব্যাপারি বেঁচে থাকতে ৩৬ নাম্বার ভূতের গলির এই বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে এসে যারা মরে গিয়েছিল, সেই সুবোধ-স্বপ্নার ছবি আমরা সংগ্রহ করতে পারি নি। এছাড়াও আরেক জোড়া সুবোধ-স্বপ্নাকে আমরা পেয়েছি যারা মহল্লাবাসীর অনুরোধে ভাড়াটিয়া হয়ে ওঠেনি, ভেগে গেছে। সেই সুবোধ-স্বপ্নার নাম শিবু কুমার শীল ও পাপড়ি। তাদের কোলে একটি পুত্রসন্তান ছিল, যার নাম বিশ্বজিৎ। এছাড়াও যে দু’জন পরাণ দাদা-বৌদির সন্ধানে গ্রাম থেকে পুরোনো ঢাকার ভূতের গলিতে আসে, তাদের একজনের নাম শক্তিমোহিত সুবীর, অন্যজন তন্ময়। এরমধ্যে একটা বিশেষ যোগসূত্র হচ্ছে, অনিমেষ, শিবু, শক্তি ও তন্ময় চারুকলার ছাত্র। আমি নিজেও চারুকলায় পড়তাম। চারুকলার লোক হিসেবে সবসময় উপস্থিত আছেন ‘কাঁটা’ ছবির আর্ট ডিরেক্টর শিল্পী মাহমুদুর রহমান দীপন ।


পরাণের ভূমিকায় তন্ময়  (বামে) ও শক্তিমোহিত সুবীর (ডানে), মাঝে আজিজ ব্যাপারি কায়েস চৌধুরী

 

‘কাঁটা’ ছবির বাকি ৩০ শতাংশ শ্যুটিং শেষ করব, সম্পাদনা-সাউন্ড-মিউজিক করব, অ্যানিমেশন-সিজি-গ্রাফিক্স-টাইটেল করব, ছবি যাবে সেন্সর বোর্ডে, তারপরেই তো দর্শক দেখতে পাবেন ‘কাঁটা’। ‘কাঁটা’ কিংবা সুবোধ-স্বপ্না-পরাণ ও আজিজ ব্যাপারির গল্প। আপাতত অপেক্ষা করুন। অপেক্ষা বড় মধুর।

 

৩১ অক্টোবর, ২০১৮, ভূতের গলি, নারিন্দা, ঢাকা



 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩১ অক্টোবর ২০১৮/তারা