ঢাকা, বুধবার, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কাসেম বিন আবুবাকার: অপ্রিয় সত্যের উন্মোচন

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-০৬ ৭:৪১:১৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-০৬ ৭:৪১:১৩ এএম

রুহুল আমিন: একটা লোক, মানে কাসেম বিন আবুবাকার আশির দশকে লেখালেখি শুরু করে সাত/আট বছর আগে লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি প্রায় শ’খানেক উপন্যাস লিখলেন। এখন অবশ্য আত্মজীবনী লিখছেন বলে জানিয়েছেন। আমাদের সংবাদ মাধ্যমে তার সম্পর্কে কোনো প্রতিবেদন দেখিনি কখনো। হঠাৎ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করলো। তারপর আমাদের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা হৈ চৈ পড়ে গেলো।

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সবগুলোই পড়ার চেষ্টা করেছি। দুয়েকটি বাদ পড়তে পারে। মোটাদাগে তাকে নিয়ে সেখানে যা বলা হয়েছে তা হলো- তিনি জনপ্রিয় লেখক। আর কোন শ্রেণীর পাঠকের কাছে তিনি জনপ্রিয় তাদের পরিচয়ও আছে সেসব প্রতিবেদনে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে খবর আসার পর বেশ কয়েকটি দেশি সংবাদ মাধ্যমও তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করে। কেউ কেউ তার সাক্ষাতকারও প্রকাশ করেছে। তবে তাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। সেখানে আবার দেখা গেছে নানান বিভক্তি। কেউ কাসেম বিন আবুবাকারের পক্ষে। কেউ বিপক্ষে। কেউ আবার নিরপেক্ষ জায়গা থেকে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। তবে সমালোচনা, বিশেষ করে তার লেখার ভক্ত নন বা তার প্রতি ঘৃণা প্রকাশকারীর সংখ্যাই বেশি। মজার ব্যাপার হলো, যারা তাকে নিয়ে এতো আলোচনা করছেন তাদের বেশিরভাগই আবার বলেছেন কাসেম বিন আবুবাকার তাদের পড়া হয়নি। পড়লেও দুয়েকটি বই পড়েছেন। এখন কথা হলো পড়া হয়নি বলে কি তার সমালোচনা করা যাবে না? আর ফেসবুকে তো তার দুয়েকটি বইয়ের ‘চুম্বক’ অংশের স্ক্রিন শর্ট পড়া হয়েছেও। এর বেশি কিছু লাগে কি সমালোচনা করতে? অন্তত বাঙালিদের লাগে বলে মনে হয় না।

এই যেমন আমি। কাসেম বিন আবুবাকারের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি কখনো। পড়া হয়নি মানে হয়নি। সামনে পাইনি। পড়িনি মানে তাকে ছোট করার অর্থে বা আমি এলিট শ্রেণিতে উঠতে এই কথা বলছি না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরের বই পড়ার ক্ষেত্রে আমি বরাবরই সিলেকটিভ। এ ছাড়া বই পড়ে বিশ্বালয়ে ঢুকে যাবার খোঁজ যিনি আমাকে দিয়েছিলেন তিনি কাসেম বিন আবুবাকারের খোঁজ দেননি। তবে গত বছরখানেক আগে ফেসবুকের কল্যাণে তার নাম শুনেছি। আগ্রহ ছিল তার বই পড়বো। যেহেতু তার বই পড়া হয়নি তাই লেখক কাসেম বা তার লেখা সম্পর্কে আমার কোনো বক্তব্য নেই। এই যে তাকে নিয়ে এতো আলোচনা সেই বিষয়ে দুয়েকটি কথা বলবো।

কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে এই আলোচনার মধ্যে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কমন কথা হলো-তিনি আসলে ইসলামী বিশ্বাসকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যৌন সুরসুরি দেওয়া চটি লিখেছেন। এর স্বপক্ষে তার লেখা বই থেকে উদ্বৃতি দিয়ে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। কেউ আবার তাকে যে জনপ্রিয় বলা হচ্ছে তার প্রমাণ, দলিল দস্তগত চেয়েছেন। কোন জরিপের ভিত্তিতে এই দাবি করা হয়েছে সে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ আবার সমকালের ভাস্কর্য সরানোর রাজনীতি, হেফাজতি রাজনীতি ও সর্বোপরি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির সঙ্গে হঠাৎ কাসেম বিন আবুবাকারের আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে আত্মপ্রকাশে একটা গভীর ষড়যন্ত্রের/যোগসূত্রতার গন্ধ খুঁজেছেন। প্রকৃত অর্থেই তো সব কিছু রাজনীতির অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কাসেম বিন আবুবাকারে যে রাজনীতি আছে সে কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেয়। আমার এই লেখা কাসেমকে গ্লোরিফাই বা তাকে হীন করার জন্য না। মূলত কাসেমের মাধ্যমে যে একটি অপ্রিয় সত্য বেরিয়ে এসেছে তা নিয়ে।

প্রশ্ন হলো কাসেম বিন আবুবাকারকে অস্বীকার করার কোনো উপায় আছে কিনা? কাসেম যাদের জন্য লেখেন সেই গ্রামীণ মানুষদের প্রতি আমাদের, মানে আমরা যারা সমাজের সুবিধাভোগী, শিক্ষিত আধুনিক দাবি করি তাদের সব সময় একটা উন্মাসিক মনোভাব ছিল। এই মনোভাবই কাসেমকে জন্ম দিতে সাহায্য করেছে। আপনি আমি যারা আরবান বা সেমি-আরবান জেলা শহরে থাকি তাদের কাছে কাসেম ভুয়া ব্যাপার হতে পারে। কারণ কাসেম যাদের জন্য লিখেছে তাদেরকে হয় আমরা কোনোদিন আমাদের শেকড় সম্পর্কিত মনে করিনি। আর না হয় আমরা এগিয়ে পরা আর তারা পিছিয়ে পরা হিসেবে তাদেরকে ইগনোর করেছি। এখানে শ্রেণির খেলা। আমাদের মিডলক্লাস সবর্স্ব মিডিয়ার মানুষও কোনাদিন তাদের জন্য ভাবনার তেমন একটা সময় পায়নি। টার্গেট অডিয়েন্স গ্রামের মানুষ হয়নি কখনো আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোর। শিল্প সংস্কৃতির কোনো মাধ্যমেই তাদের জন্য অংশ্রগ্রহণের কথা আমরা ভাবিনি। যে দুয়েকজন ভেবেছেন তারা আবার শুধু তাদের কথা শহুরে মানুষদেরকে শোনানোর ব্যাপারটাই দেখেছেন। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে লেখা কথা তারাই হয়তো তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। 

আমরা এগিয়ে থাকারা সব সময় নিজেদের ‘এলিট’ ভেবেছি। নিজেদের পছন্দকে জাতীয় পছন্দ ভেবেছি। অথচ স্বাধীনতার কথা আসলে আবার বলেছি সবার স্বাধীনতা আছে। যদি সত্যিই কাসেম গ্রামে জনপ্রিয় হয়ে থাকেন, তবে এই কথা তো মিথ্যা না যে কাসেম পাঠক সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশি। কিন্তু ‍তারা কখনো তাদের পছন্দকে ‘জাতীয় পছন্দ’ বলতে পারে না। তাদেরকে আমরা প্রয়োজনে কাজে লাগাই। কিন্তু তারা প্রয়োজন ফুরালে বলার আগেই চলে যায়। নিজেদের অবস্থান, নিজেদের শেকড় সম্পর্কে তারা সচেতন। দেশের স্বাধীনতার সময়ও তাদের ডাকলে তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করে যে যার মতো নিজের জায়গায় ফিরে যায়। ক্ষমতার ধারে কাছেও থাকেনি। কিন্তু তাদের কথা আমরা কোনোদিন ভাবিনি। 

প্রতিটি লেখকের নির্দিষ্ট পাঠক থাকে- এই কথা যদি সত্য ধরে নিই, তাহলে এমন একজন লেখকও কি খুঁজে পাওয়া যাবে যিনি গ্রামের মানুষের কথা ভেবেছেন? তার পাঠক হিসেবে খেতমজুরের কথা ভেবেছেন? তাদের জন্য লিখেছেন? এটা শ্রেণির প্রশ্ন। হয়তো আমাদের এক প্রজন্ম আগের পুরুষও গ্রামের ছিল। কিন্তু আমাদের স্থানান্তর ঘটেছে। আর এই স্থানান্তরের ভেতর দিয়ে আমাদের শ্রেণির উত্তরণ ঘটেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে নিজেদেরকে মূল ধারার মানুষ মনে করা যেতে পারে। এতে কেউ হয়তো বাধা দিবে না। কিন্তু যখন কেন্দ্রের বাইরের মানুষের পছন্দে ডমিনেট করার চেষ্টা করেন তখনই সমস্যা। তাদের অস্বীকার করাও সমস্যা। আপনার কাছে ছফা, ইলিয়াস, কায়েস, শহীদুল জহির, মাহমুদুল হক সেরা লেখক হতে পারে। বিশেষ কিছু হতে পারে। কিন্তু গ্রামের কয়জন মানুষ তাদের খবর জানেন? কয়জন মানুষ তাদের লেখা পড়ে? কেন জানে না, কেন পড়ে না এই প্রশ্ন করেন নিজেকে। দেখবেন তাদের বঞ্চিত করেছেন এই তথ্য সামনে আসবে। আপনার শিক্ষা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, রাজনীতি, অর্থনীতি কোথায় কি অবস্থায় তারা আছে প্রশ্ন করুন নিজেকে। তারপর তাদের রুচি, খাদ্যাভ্যাস, পড়াশোনা নিয়ে কথা বললে মানাবে । এর আগে বললে কতটুকু মানানসই হয় ভাবেন।

আমাদের বড় একটা সমস্যা হলো নিজেরটা বাদে আর সব অস্বীকার করি। আর সবে অস্বীকৃতি জানাই। নাটক, সিনেমা, গল্প উপন্যাস, রাজনৈতিক মতাদর্শ এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমাদের এই মনোভাব বিদ্যমান নেই। তাই তো আমরা ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা বিশ্বাস করতে চাই না। প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকাণ্ডে অবাক হই, কাসেমে অবিশ্বাস করি, অবাক হই, ক্ষিপ্ত হই। কিন্তু এই অস্বীকারের মাধ্যমে আমরা মূলত দেশের বড় একটা জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারেই রেখে দিই। তাদের অস্বীকার করি। তাদের রুচিবোধ অস্বীকার করি। কিন্তু যারা কাসেম পড়েন, কেন তারা ছফা, ইলিয়াস পড়েন না তার কারণ অনুসন্ধান করুন। বরং তাতেই কিছু উপকারে আসবে। কাসেম বিন আবুবাকার নতুন করে এই সত্যটা আমাদের সামনে এনেছেন। গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠীর পেছনে পড়ে থাকার কারণটা অন্তত সামনে এনেছেন। তাদেরকে আমরা ডমিনেট করি, অস্বীকার করি। কিন্তু সংখ্যার হিসেবে যখন তারা আমাদের চেয়ে বৃহৎ হয়ে দাঁড়ায় তখন আমরা হাহাকার করি। চিৎকার করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি তারা নয়, আমরা, আমরাই বাংলাদেশের প্রতিনিধি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিনিধি। কাসেম সেই মিথ্যাটাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন যেন।

লেখাটা শেষ করবো নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলে। প্রাসঙ্গিক হবে কিনা জানি না। ইদানীং গ্রামে গেলে আর তেমন ভালো লাগে না। বন্ধুরা কেমন জানি বদলে গেছে। গত পাঁচ বছর আগেও তারা তেমন ছিলো  না। কোথাও একটা ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। বন্ধুদের মধ্যে আগে অনেকে হিন্দি সিনেমা দেখতো। ভারতীয় ক্রিকেট দলের সমর্থন করতো। কেমন করে যেন সব বদলে যেতে লাগলো। তারা এখন হিন্দি সিনেমা ‘মালোয়ানদের’ কাজ মনে করে। হিন্দু বিদ্বেশ কেমন করে জানি ঢুকে গেছে তাদের মধ্যে। ফেসবুকের প্রগতিশীল দাবি করা ব্যক্তিরা হয়তো এই খোঁজ জানেন না, দেশের কোথায় কখন কীভাবে ঢুকে যাচ্ছে এই সাম্প্রদায়িক চেতনা। আমি আপনি যতই অসাম্প্রদায়িক আছি ভাব নেই না কেন কোথাও একটা বড় গড়বর আছে, কোথাও নীরবে পুড়ে যাচ্ছে কিছু। গন্ধ আসছে, কিন্তু কি পুড়ছে জানি না। অসাম্প্রদায়িক অসাম্প্রায়িক বলে এতো চিৎকার কিন্তু আমার ওই বন্ধুরা কেমন করে বিদ্বেশী হয়ে যাচ্ছে? আমার যা আছে তা নিয়ে তো কথা বলি না। যা নেই তা নিয়েই তো কথা বলি। তাহলে কি আমাদের এই অসাম্প্রদাকিতার দাবি মিথ্যা? কাসেম বিন আবুবাকার আপনাকে ধন্যবাদ, একটা অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ মে ২০১৭/রুহুল/তারা