ঢাকা, রবিবার, ২০ আষাঢ় ১৪২৭, ০৫ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কুকুরের নামে টোকিওতে মিটিং প্লেসের নামকরণ 

পি.আর. প্ল্যাসিড, জাপান থেকে : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৪ ২:২৯:৪১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১৪ ৯:১০:২৮ পিএম

আমি জাপান আসার পরপরই হাচিকো সম্পর্কে জেনেছি। হাচিকো একটি কুকুরের নাম। মূলত হাচি হলো জাপানি শব্দ আট আর কো শব্দটি বিশেষভাবে মেয়েদের নামের পর ব্যবহার করা হয়। সম্মান প্রদর্শনের জন্যও ব্যবহার করা হয়  শব্দটি।

জাপানের রাজধানী টোকিও’র শিব্যুইয়া ওয়ার্ডে রেল স্টেশন রয়েছে। স্টেশনে প্রবেশ এবং বেরিয়ে আসার পথ পাঁচটি। এর একটির নামকরণ করা হয়েছে হাচিকো গুচি বা হাচিকো এনট্রেন্স। স্থানটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্লেস হিসেবে যেমন পরিচিতি লাভ করেছে, তেমনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে সকল বয়সীদের কাছে।

হাচিকোর অদূরে রয়েছে একটি কুকুরের মূর্তি। এটি বিশ্বখ্যাত একটি কুকুর। হাচিকোকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, নির্মিত হয়েছে ডকুমেন্টারি ফিল্ম, নাটক, সিনেমা। ফলে হাচিকোকে আমরা কেবল যদি একটি কুকুর মনে করি তাহলে ভুল হবে। হাচিকোর করে যাওয়া কাজই তাকে এই খ্যাতি পাইয়ে দিয়েছে জাপান তথা বিশ্বে।

জাপানের আকিতা প্রিফেকচারের ওদাতে নামক এলাকায় এক কৃষকের বাড়িতে কুকুরের অনেকগুলো বাচ্চা হয়। তখন টোকিওর শিব্যুইয়াতে ‘টোকিও ইমপেরিয়াল ইউনিভার্সিটি’র এক প্রফেসর থাকতেন। তার নাম হিদেসাবুরো উয়েনো। তিনি আকিতা গিয়ে সেই কৃষক পরিবারের কাছ থেকে ১৯২৪ সালে একটি কুকুরের বাচ্চা নিয়ে আসেন পোষার জন্য। এই কুকুরটির নাম হাচিকো। হাচিকোর জন্ম ১৯২৩ সালের ১০ নভেম্বর।

প্রফেসর হিদেসাবুরো উয়েনো প্রতিদিন এই স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে কাজে যেতেন। ফিরে আসতেন এই স্টেশনেই। তাঁর সঙ্গে স্টেশন পর্যন্ত হাচিকো আসতো। বিকেলে তারা এই স্টেশন থেকেই দুজন বাড়ি ফিরত। এটি ছিল ১৯২৫ সনের ২১ মে পর্যন্ত নিত্যদিনের ঘটনা। একদিন প্রফেসর ক্লাস নেওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। যে কারণে তাঁর আর এই স্টেশন হয়ে বাড়ি ফেরা হয়নি। বিষয়টি হাচিকোর জানা ছিল না, যে কারণে প্রতিদিন প্রফেসরের ফেরার সময় হলে স্টেশনে এসে অপেক্ষা করতো হাচিকো। এই অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটে ১৯৩৫ সনের ৮ মার্চ হাচিকোর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

হাচিকোকে নিয়ে প্রথম আশাহি শিমবুন (আশাহি পত্রিকা) ১৯৩২ সনের ৪ অক্টোবর ছোট একটি সংবাদ প্রকাশ করে। তখন থেকেই ঘটনার আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই হাচিকোকে স্টেশনের সামনে দেখেছেন। কুকুরটি মনিবকে না ফিরতে দেখে মনের যন্ত্রণায় না-খেয়ে হাঁটাচলা করতো। অনেকে আবার এগিয়ে এসে হাচিকোকে খাবার খেতে দিতেন। বিশেষ করে স্টেশনের সামনে ইয়াকতরীর (মাংস পোড়া) মালিক বা কর্মচারী হাচিকোকে ইয়াকতরী খেতে দিতেন। হাচিকোর মৃত্যুর পর তার পেট থেকেও ইয়াকতরী পোড়ার পর যে বাঁশের শলায় মাংস গাঁথা থাকে সেই শলা পাওয়া যায়। পরে মনে করা হয়, এই শলা হজম না হওয়ায় তার পেটে ঘা হয়, যার কারণে হাচিকোর মৃত্যু হয়। 

হাচিকোর মৃত্যুর পর মরদেহ পোড়ানো হয়, পরে ছাই নিয়ে রাখা হয় টোকিওর মিনাতো ওয়ার্ডের আওইয়ামাতে, যেখানে তার মনিবকে কবর দেওয়া হয়েছে সেখানে এবং ঠিক তার পাশে।

১৯৩৪ সনের এপ্রিল মাসে তেরো আনদো নামের এক ভদ্রলোক শিব্যুইয়া স্টেশনসংলগ্ন এই স্থানটিতে প্রথম হাচিকোর অবিকল আকৃতির একটি মূর্তি স্থাপন করেন। ১৯৪৮ সালে মূর্তিটি ভেঙে যুদ্ধ সামগ্রীর কাজে ব্যবহার করা হয়। যুদ্ধ শেষে ১৯৪৮ সালেই আবার দ্বিতীয়বার হাচিকোর মূর্তি স্থাপন করেন। ২০০৪ সালে হাচিকোর জন্মভূমি আকিতা প্রিফেকচারের ওদাতে রেল স্টেশনের সামনে একই ধরনের আরেকটি মূর্তি স্থাপন করা হয়।

২০০৩ সালে শিব্যুইয়া ওয়ার্ড হাচিকোর নামানুসারে এই এলাকা থেকে একটি রুটে মিনি বাস চালু করেছিল যা এখন কয়েকটি রুটে নিয়মিত চলছে। উল্লেখ্য যে, এই মিনি বাসেরও নামকরণ করা হয় হাচিকো বাস। দিন যত যাচ্ছে ততই যেন জাপানে এই হাচিকোকে নিয়ে নানা ধরনের কর্মকান্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রতিবছর হাচিকোর মৃত্যু দিবসও ঘটা করে উদযাপন করা হয়।

লেখক : জাপান থেকে প্রকাশিত প্রথম অনলাইন বাংলা নিউজ পোর্টালের সম্পাদক

 

ঢাকা/তারা