ঢাকা, সোমবার, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৮ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কেউই আজ মনে রাখেন না তাকে

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-৩০ ১২:০৫:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-৩০ ১২:৩০:০১ পিএম

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে বলা হয় বাংলা জাগরণের কালজয়ী সাহিত্যিক। যিনি বাংলাদেশের মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়ে সারা জীবন গবেষণা করেছেন। কেউই আজ মনে রাখেন না তাকে। অথচ তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নির্মাণে এককভাবে যে শ্রম ও নিষ্ঠা উপহার দিয়ে গেছেন তা আজো অতুলনীয়। এই কালজয়ী সাহিত্যিকের ৬৬ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। চট্রগ্রামের এই কৃতি সন্তান ১৯৫৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন। মৃত্যুর বিছানায়ও তিনি উদাহরণ তৈরি করে গেছেন। যখন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মাটিতে ঢলে পড়েন তখনও তার হাতে ছিল লেখনী। তার জন্ম ১৮৭১ সালের ১১ অক্টোবর চট্টগ্রামের পটিয়ায়।

দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারে তিনি পুঁথি সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যে তথ্য-ফারাক তার ঘুচিয়ে দিতে পুথি সংগ্রহ ও সম্পাদনার মাধ্যমে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। আর সেজন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছাড়াও অনেকেই পুঁথি সংগ্রহ করেছেন। তবে অন্যসব পুঁথি সংগ্রাহকের সঙ্গে তার গুণগত পার্থক্য ছিল। তিনি শুধু পুথি সংগ্রাহকই ছিলেন না, ছিলেন এর সুযোগ্য বিচার-বিশ্লেষক। নতুন কোনো পুথি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার পাঠোদ্ধার ও মূল্যায়ন করে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশে সচেষ্ট হতেন। তিনি দেশ, জাতি, মাটি ও মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকেই বাংলা সাহিত্যের সঠিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে আজীবন কাজ করে গেছেন।

প্রাচীন পুথিপত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান জাতিকে তাদের আত্মপরিচয়ের বিশাল সন্ধান তিনি দিয়ে গেছেন। বাংলার শক্তিমান মুসলমান জাতির ইতিহাসকে যিনি বাঙালীর মনের ও মননের ইতিহাসে- স্বগৌরবে এনে আমাদের সমাজ, জাতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। যিনি কেরানী থেকে উঠে এসে হয়েছেন সমাজ-সাহিত্যের কিংবদন্তী। মানুষের ভালবাসা আর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সাহিত্য বিশারদ ও সাহিত্য সাগর উপাধি পেয়েছেন। অর্জন করেছেন অনেক নামী দামী পুরস্কার।

গবেষক, সংগ্রাহক ও পুঁথি সংরক্ষণকারী হিসেবে দুই বাংলাতেই সুনাম কুড়িয়েছেন। তিনি সারা জীবন লুপ্ত ইতিহাস খুঁজতে ঘর থেকে ঘরে, পথ থেকে পথে পথে ঘুরেছেন। উদ্ধার করেছেন অনেক দুর্লভ ঐতিহাসিক সম্পদ। তার উদাহরণ- ইতিহাস আজ অবধি অন্য কেউ ভঙ্গ করতে পারেনি। অথচ তাকে আজ আমরা ভুলতে বসেছি। তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্র কিংবা চট্টগ্রামে কোথাও পালিত হয় না।

আবদুল করিম চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের প্রথম এন্ট্রাস পাস করা লোক। এফ.এ. পর্যন্ত পড়েছেন। আর্থিক অসচ্ছলতা তাকে কলেজ ছাড়তে বাধ্য করে। কবি নবীন চন্দ্র সেন ছিলেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী। তিনি আবদুল করিম সাহেবকে কমিশনার অফিসে চাকরির ব্যাপারে সাহায্য করেন এবং সাহিত্য চর্চার জন্য তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তার স্বগ্রাম থেকে কালিশঙ্কর চক্রবর্তী প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘জ্যোতি’ পত্রিকায় আবদুল করিম পুঁথি সংগ্রহের জন্য একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। যার ফলে তার ও নবীন চন্দ্র সেনের চাকুরি হারানোর উপক্রম হয়। আশ্চর্য্যজনক বিষয় নবীন বাবু বেঁচে গেলেন! কিন্তু আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। অতঃপর তিনি আনোয়ারা মিডল হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের চাকরি পান। এখানে থাকাকালে তিনি অধিকাংশ পুঁথি সংগ্রহ করে বাংলা ভাষার ভাণ্ডারকে ঐশ্বর্যময় করেছেন। তিনি এমন সব কাব্য উদ্ধার করেছেন যার দ্বিতীয় কপি অন্য কোথাও নেই। মুসলমানদের মধ্যে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদই প্রথম ব্যক্তি যিনি একনিষ্ঠভাবে মুসলমানদের রচিত পুঁথি-পুস্তক সংগ্রহ করেছেন। তার সাধনা ও গবেষণার ফলে বাঙালি জনসাধারণ জানলো যে, বাংলা সাহিত্যের আদি কবি মুসলমান, বাংলা সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে বৈচিত্র্য প্রদান করে প্রথম মুসলমান কবিগণ প্রথম মৌলিক কাব্য রচনা করেন। মুসলমান কবি মরদন ও মাগন ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যের ভাষাকে প্রথম শালীনতা দান করেন মুসলমান কবি আলাওল। এক কথায় তিনিই জানিয়ে দিলেন যে, বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টি, পুষ্টি ও বৈচিত্র্য সাধনের মূলে রয়েছে প্রথমত ও প্রধানত মুসলমানদের সাধনা।

দীর্ঘ ৬৫ বছর যাবত তিনি নিরলসভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বহু পুঁথি সংগ্রহ করে গেছেন। মুসলমান রচিত পুঁথিগুলি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাহায্যে তিনি ‘গোরক বিজয়’, ‘জ্ঞান সাগর’, ‘সারদা মঙ্গলমৃগবলুব্ধ’, ‘গৌরাঙ্গ সন্ন্যাস’ প্রভৃতি কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। তার সম্পাদিত পদ্মাবতী অর্থাভাবে প্রকাশিত হয়নি। ‘পদ্মাবতী সংকলন’, ‘সতী ময়না’ ও ‘লোরচন্দ্রানী’ এসব গ্রন্থ তার প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু অর্থাভাবে তাও সম্ভব হয়নি। তিনি প্রায় ছয় শতাধিক পুঁথির পরিচয়মূলক প্রবন্ধ লিখে গেছেন।


ঢাকা/শাহ মতিন টিপু

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন