ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ক্যাসিনোতে শুল্ক ফাঁকি ও অর্থপাচারের প্রমাণ, ফাঁসছেন ব্যবসায়ীরা

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৩ ৮:৩৪:১৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২৪ ৪:৪৬:০৯ পিএম

মিথ্যা ঘোষণায় বিভিন্ন কৌশলে ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানিতে কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে। কখনো আন্ডারইনভয়েসিং আবার কখনো ওভারইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আমদানিকারকরা জড়িয়েছেন মানিলন্ডারিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধের সাথে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে এমন অপরাধের সত্যতা বেরিয়ে এসেছে। জুতার সরঞ্জাম, খেলনা, কম্পিউটার ও মোবাইল পার্টসের আড়ালে ক্যাসিনো সামগ্রী নিয়ে আসা অন্তত এক ডজন আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশও করেছে গোয়েন্দা সংস্থাটি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার কাছে পাঠানো অগ্রগতি প্রতিবেদনে অন্তত ছয় থেকে সাতটি মামলার সুপারিশ করেছে সংস্থাটির অনুসন্ধান টিম। যেখানে আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘অনুসন্ধানে দেখা যায় আমদানিকারকরা স্লট মেশিন, পোকার সেট, মহজং টেবিল, চিপস, ক্যাসিনো ওয়্যার গেইম টেবিল মিথ্যা ঘোষণায় এসব পণ্য লাখ থেকে কোটি টাকায় দেশে এনেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বেনাপোল কাস্টমস হাউজ দিয়ে এসব পণ্য আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে। মিলেছে অর্থ পাচারের প্রমাণ। যে কারণে মামলার সুপারিশ রয়েছে। বাকি সিদ্ধান্ত এনবিআর চেয়ারম্যান নেবেন।’

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলামের জানতে চাইলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন।

যদিও এর আগে সহিদুল ইসলাম গত ১০ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খুঁজে পাওয়া ও একই সঙ্গে অনিয়ম পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

বিভিন্ন সময় ক্যাসিনো পণ্য আমদানি করেছে এমন অন্তত ২০ আমদানিকারককে চিহ্নিত করে গত সেপ্টেম্বরে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে আমদানিকারক পুস্পিতা এন্টারপ্রাইজের মালিক সুরঞ্জন শেঠ তাপস, পুস্পিতা এন্টারপ্রাইজের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বেত্রাবতী ট্রেডের মালিক মো. আশরাফুল ইসলাম ও এ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক আহসানুল আজমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সংস্থাটি।

এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সিক্স সি করপোরেশন, নিনাদ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, বেস্ট টাইকুন এন্টারপ্রাইজ, নিউ হোপ অ্যাগ্রোটেক লিমিটেড, এবি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, চায়না কমিউনিকেশন, ডংজিং লংজারভিটি ইন্ডাস্ট্রি, ফাস্ট রেস কোম্পানি, বিবি ইন্টারন্যাশনাল, মিন মাও হার্ডওয়্যার, মুন ট্রেডিং, ওসজি জয়েন্টভেঞ্চার, যাহিন ইন্টেরিয়র, এস.টি বাংলাদেশ লিমিটেড, সুগন্ধা ইন্টারন্যাশনাল ও এম এম ইন্টারন্যাশনাল এবং বেত্রাবতী ট্রেডের মালিকদের।

যদিও জিজ্ঞাসাবাদে তারা শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি কোনো অনিয়ম বা মিথ্যা ঘোষণা ছিল না।

এসব প্রতিষ্ঠান খেলার সামগ্রী, জুতা, কম্পিউটার সামগ্রী, স্প্রে মেশিন, ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি, গাড়ির সংকেত বাতি, নিরাপত্তা সেন্সর, মেডিক‌্যাল যন্ত্রপাতির আড়ালেই ক্যাসিনো সরঞ্জামাদি আনতো।

নানা কৌশল অবলম্বন করে কেউ এনেছেন, আবার কেউ নিয়মনীতি মেনেই এনেছেন। কারণ, ওই সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত আমদানি পণ্যের তালিকায় ক্যাসিনোতে ব্যবহার হয় এমন কোনো পণ্যের নাম ছিল না। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২০ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে আসা চালানের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়।

অনুসন্ধান চলাকালে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকৃত মোবাইল ফোন কারখানা, ব্যাটারি প্রস্তুতকারক ও পোল্ট্রি ফিড কারখানা, বনানীর নিউ ড্রাগন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, উত্তরার আবাসিক হোস্টেল থেকে ক্যাসিনো সরঞ্জাম ঊদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা টিম। সুপারিশকৃত মামলায় এসব আমদানিকারকদের নাম রয়েছে বলে অন‌্য একটি সূত্রে জানা গেছে।

অভিযানের এক পর্যায়ে দেশের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে বিদ্যমান সকল শুল্ক স্টেশনে লিখিত আদেশে ক্যাসিনো সংশ্লিষ্ট সকল ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে এনবিআর।

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘যখন থেকে ক্যাসিনোর বিষয়টি উদঘাটিত হয়েছে তারপরই সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম আমদানি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় এনবিআর। এরই মধ্যে দেশের সকল সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে আমাদের কাস্টমস পয়েন্টে ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি নিষিদ্ধের লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী গ্রেপ্তার হন। এর ধারাবাহিকতায় ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যাসিনোর মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এ পর্যন্ত ১৯টি মামলা দায়ের করে সংস্থাটি।

যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে- ঠিকাদার জি কে শামীম, বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূইয়া, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ, কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান, তারেকুজ্জামান রাজীব, ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, এনামুল হক আরমান, যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা, কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ, যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমান, গণপূর্তের সিনিয়র সহকারী প্রধান মো. মুমিতুর রহমান ও তার স্ত্রী মোছা. জেসমীন পারভীন এবং ব্যবসায়ী মো. সাহেদুল হক।


ঢাকা/ এম এ রহমান/সনি

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও