ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

খাবার টেবিলে পড়ে থাকে মাখানো ভাত

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১২ ১২:০৮:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-১২ ১২:১০:৪৩ পিএম

১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর। পুরনো ঢাকার ১২/সি, রোকনপুরের বাসা থেকে চোখ বেঁধে একজন সাংবাদিককে তুলে নিয়ে যায় পাক হানাদাররা।

জানা যায়, তিনি শুধুমাত্র গেঞ্জি পরে ছিলেন। রাতে ভাত খেতে বসেছিলেন। সে অবস্থায়ই তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। হাত ধুতে দেওয়া হয়নি। খাবার টেবিলে পড়ে থাকে মাখানো ভাত। তারই গায়ের গেঞ্জি ছিঁড়ে চোখ বেঁধে রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এই সাংবাদিকের নাম নিজামউদ্দিন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে তার পাঠানো সংবাদ বেতারে শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত এ দেশের সাধারণ মানুষ। সে সময় ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের কারণে বিবিসি কর্তৃপক্ষ প্রায় আধাঘন্টা সময় নিয়ে তার জীবনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে একটি মন্তব্য অনুষ্ঠান প্রচার করেছিল। পরদিনই পাক হানাদাররা বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় তাকে।

নিজাম উদ্দিন আহমদ যে যুদ্ধের কাহিনী নিয়ে নির্ভীকভাবে রিপোর্ট করছিলেন সেই যুদ্ধে বাংলাদেশিদের বিজয়ের খবর বিশ্ববাসীর কাছে তিনি পাঠাতে পারেননি। এর আগেই তাঁকে হত্যা করা হয়।

পাক হানাদাররা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে মেধাবী ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার যে মিশনে নামে এ হত্যা ছিল তারই পূর্বাভাস।

অন্যদিকে একাত্তরের এইদিনে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলই পাক হানাদার মুক্ত । পাকিস্তানী বাহিনী পালিয়ে আসায় অধিকাংশ অঞ্চলই তখন কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়ে। আর ঢাকার বিজয় নিশ্চিত করা তখন শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

এ দিন বঙ্গোপসাগর থেকে ২৪ ঘণ্টার দূরত্বে নিশ্চল দাঁড়িয়েছিল মার্কিন সপ্তম নৌবহর। চূড়ান্ত বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে পাক-হানাদারদের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রায় নগ্ন হয়েই মাঠে নামে। যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে এ দুটি দেশের শেষ চেষ্টা আবার ব্যর্থ হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের দীর্ঘ বক্তব্যের পর অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়। স্বাধীনতার পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যায় আরও এক ধাপ।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান টেলিফোন করে জেনারেল নিয়াজীকে আশ্বস্ত করেন, ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ উভয় দিক থেকে বন্ধুরা এসে পড়বেন। গুল হাসানের কাছ থেকে এ আশ্বাস শুনে ঢাকায় পাকিস্তানী সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রতিরক্ষার আয়োজন নিরঙ্কুশ করতে ২৪ ঘণ্টার জন্য কারফিউ জারি করে ঘরে ঘরে তল্লাশি চালায়। এ সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এ দেশিয় দোসর আলবদর বাহিনী পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের আটক ও হত্যা শুরু করে।

অন্যদিকে চারদিকে তখন শুধুই মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়, আর পাক-হানাদারদের পরাজয়ের খবর। ঢাকাবাসী এ সময় অভীষ্ট আনন্দ আর অজানা আশঙ্কার এক অদ্ভুত দোলাচলে সময় পার করছেন। স্বাধীনতার ওই মাহেন্দ্রক্ষণটি কখন আসবে, মুহুর্তটির অধীর অপেক্ষায় ঢাকাবাসী।

এদিকে ঢাকার বিজয় করতে চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী ঘেরাও করে ফেলে। এ দিন বিকেলেই ভারতের চার গার্ডস ইউনিট ঢাকার ডেমরা ঘাটের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যায়। সূর্যাস্তের আগেই জামালপুর ও ময়মনসিংহের দিক থেকে জেনারেল নাগরার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্যারাস্যুট ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে ঢাকা অভিযান আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

 

ঢাকা/টিপু

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও