ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

গোয়েন্দাগিরি, বৃষ্টিবিলাসের পর আফগান রূপকথা

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-০৯ ৬:৪৭:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-১২ ৫:০৩:২৭ পিএম
গোয়েন্দাগিরি, বৃষ্টিবিলাসের পর আফগান রূপকথা

চট্টগ্রাম থেকে ইয়াসিন হাসান : ‘আই ওয়াক ইন রেইন, বিকজ নো ওয়ান ক্যান সি মি ক্রাইং’- চার্লি চ্যাপলিনের অমর উক্তি যেন পুরোদিন কানে বাজছিল রশিদ খান, মোহাম্মদ নবীদের। ইতিহাস গড়ার এতটা কাছে এসে বেরসিক বৃষ্টি তাদের চোখে জল এনে দেবে! তাহলে তো খোলা রাস্তায় বিমর্ষ হয়ে হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই!

নাহ, সৃষ্টিকর্তা এতেটাও নিষ্ঠুর নন। জয় যার প্রাপ্য তার গলায় পরিয়েছেন বিজয়ের মালা। বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে সারাদিন চলল বৃষ্টিবিলাস। আর আফগানিস্তান পুরো দল বৃষ্টি থামলেই ব্যস্ত গোয়েন্দাগিরিতে। স্রষ্টার কাছে দুই ড্রেসিংরুম থেকে দুইরকম চাওয়া। আফগানদের প্রার্থনা, ‘গিভ আস সাম সানসাইন।’ ঠিক উল্টোটা চাইছেন সাকিবরা, ‘গিভ আস সাম রেইন।’

স্রষ্টা কথা রেখেছেন দুই দলেরই। রৌদ-বৃষ্টির লুকোচুরির মাঝে খেলা হলো ১০৪ বল। তাতেই যেন ম্যাচ জমে উঠল। বাংলাদেশকে হারিয়ে রূপকথার গল্প লিখতে মাত্র চারটি ম্যাজিক ডেলিভারি লাগত আফগানিস্তানের। শেষ বিকেলে ৪টা ২০মিনিটে যখন খেলা শুরু হলো, তখনো সাগরিকার আকাশে কালো মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছিল। মাঠ শুকানোর পর কৃত্রিম আলোয় আম্পায়াররা ৭০ মিনিট খেলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। ব্যাটিংয়ে নামলেন সাকিব-সৌম্য। মাত্র ১৮.৩ ওভার খেলা। মাটি কামড়ে পড়ে থাকলেই হবে।

কিন্তু সাকিবের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। তাইতো জহির খানের একহাত দূরের বল মারতে গেলেন। উইকেট দিয়ে এলেন প্রথম বলে। ওই বিপদ থেকে দলকে উদ্ধারে সৌম্য ও মিরাজ লড়াই শুরু করলেন। তাদের ব্যাটে খানিকটা আশা দেখছিল। কিন্তু মিরাজ নিজেও ডুবলেন, ডোবালেন দলকে। রশিদ খানের এক ডেলিভারিতে নষ্ট করলেন রিভিউ। রিভিউ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা গেল পরের উইকেটেই। তাইজুলের ব্যাটে লেগে বল আঘাত করে প্যাডে। আম্পায়ার পল উইলসন রশিদের আবেদনে সাড়া দেন। রিভিউ না থাকায় চ্যালেঞ্জও জানাতে পারেননি তাইজুল। তাতেই সব শেষ।

ওয়ান ম্যান আর্মি হয়ে সৌম্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জমাট ব্যাটিংয়ে আশা দেখাচ্ছিলেন। রশিদ খানের কাছে তাকে ফেরানোর উত্তর জানা ছিল। সৌম্যর ব্যাটে বল লেগে ক্যাচ যায় শর্ট লেগে। ইব্রাহিম ক্যাচ ধরতেই উল্লাস আফগানিস্তান শিবিরে। হয়তো কাবুলে শুরু হয়ে যায় বিজয় উল্লাস। বাংলাদেশ অলআউট ১৭৩ রানে। ২২৪ রানের বিশাল জয়ে আফগানিস্তান বুঝিয়ে দেয় তারা এ ফরম্যাটে নতুন হলেও ফেলনার পাত্র নয়। ম্যাচ জয়ের পর মোহাম্মদ নবীকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে ভুল করেননি তারা। গার্ড অব অনার দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরে যাওয়া এ ক্রিকেটারকে সম্মান দেন রশিদ-আসগররা।

স্বাগতিক দলের গ্রাউন্ডসম্যানের ওপর আফগানদের ভরসা কম! গত জুলাইয়ে বিকেএসপিতে ‘এ’ দলের মধ্যকার ম্যাচে বৃষ্টির বাগড়ার পর চাইলেই মাঠ খেলার উপযোগী করতে পারতেন গ্রাউন্ডসম্যানরা। উল্টো কাভার তুলতে গিয়ে পানি ফেলে দেন উইকেটে। হাতের মুঠোয় থাকা একদিনের ম্যাচ হাতছাড়া হয় আফগানিস্তানের। ওই ঘটনার পর লিখিত অভিযোগও করেছিল সফরকারীরা। যার উত্তর এখনো পায়নি। সেই ঘটনার সাক্ষী অনেকেই আছেন এই দলে। তাইতো বাড়তি সতর্কতা তাদের।

একটু বৃষ্টি কমলেই মাঠ দেখতে বেরিয়ে যান সফরকারীরা। কখনো নবী, আসগর। কখনো দলের সহকারী কোচ, ফিজিও। অধিনায়ক রশিদ খান আবার বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে যান সাগরিকার সবুজ গালিচায়। সেই স্থিরচিত্র ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সকাল ১১টার পর বৃষ্টি থেমেছিল সাগরিকায়। মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেয় সূর্য। চতুর্থ আম্পায়ার শারফুদ্দৌলা ও প্রধান কিউরেটর প্রবীন হিঙ্গানিকার মাঠে প্রবেশ করেন। প্রায় এক ঘন্টা পর উইকেট থেকে কভার উঠানো শুরু হয়। ভেস্তে যায় প্রথম সেশন। দ্বিতীয়বার মাঠ পরিদর্শন শেষে আম্পায়াররা দুপুর ১টায় ম্যাচ শুরুর সিদ্ধান্ত দেন। মাত্র ১৩ বল খেলার পর আবার ঝুম বৃষ্টি।

ওই বৃষ্টি দেখে বিশ্বাসই হচ্ছিল না আর বল গড়াবে সাগরিকায়। কিন্তু সেই মেঘ সরে গিয়ে বিকেলে যখন খেলা শুরু হয়েছে তখন আকাশে ঝলমলে সূর্য। শেষ চার উইকেট পেতে তাদের লাগল ৯১ বল। তাতেই ইতিহাস। রশিদের শেষ স্পেলে লন্ডভন্ড সব। প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে তার শিকার ছয়টি। দুই ইনিংস মিলিয়ে ব্যাটে আছে রান। আফগান রূপকথার নায়ক তো রশিদই। 

আফগানিস্তানের এতো-শত অর্জন ম্লান করে চট্টগ্রাম টেস্ট যদি বৃষ্টিতে ম্লান হতো তাহলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতো ক্রিকেটপ্রেমীদের। বৃষ্টিবিলাসের পর বাংলাদেশেরও সুযোগ ছিল ম্যাচ বাঁচানোর। কিন্তু রশিদদের সাজানো বিজয়ের মঞ্চ যদি সাকিবরা ভাগাভাগি করতেন তাহলে বড্ড বেমানান-ই লাগত। সাদা পোশাকে নবীনতম হয়ে তারা পাঁচদিন যেভাবে পারফর্ম করেছে তাতে জয় তাদেরই প্রাপ্য। অবশ্য বৃষ্টিতে ৫৯৪ মিনিট নষ্ট না হলে ম্যাচ পাঁচ দিনে আসত কিনা সেটাও বড় প্রশ্ন। এ টেস্টকে ঘিরে বাংলাদেশর সম্ভাবনার সূর্য বহু আগেই অস্তমিত হয়েছিল।


রাইজিংবিডি/চট্টগ্রাম/৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯/ইয়াসিন/আমিনুল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন