ঢাকা, রবিবার, ৩ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

গৌরবের বীরশ্রেষ্ঠ, বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-১২-১৬ ১:১৭:২২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-২৭ ১:৩৮:১৩ পিএম
Walton E-plaza

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগ অনস্বীকার্য। যারা জীবন দিয়েছেন- তাদের অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। দেশমাতার প্রয়োজনে পরিবার-পরিজন ফেলে সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাদের সেই সংগ্রাম বৃথা যায়নি।

 

যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার সূর্য ওঠে বাংলাদেশের দিগন্তে। দেশের জন্য আত্মত্যাগী সেই সাত বীরশ্রেষ্ঠের স্বজনরা এখন কেমন আছেন? কী অবস্থায় আছে তাদের স্মৃতিস্থানগুলো? এ সব বিষয় নিয়ে এবারের বিজয় দিবসে রাইজিংবিডির বিশেষ আয়োজন।

 

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নরসিংদী প্রতিনিধি গাজী হানিফ মাহমুদ, বরিশাল বিভাগীয় প্রতিবেদক জে কে স্বপন, ফরিদপুর প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম টিটু, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি ফয়সাল আহমেদ, নড়াইল প্রতিনিধি ফরহাদ খান, নোয়াখালী প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম ও ভোলা প্রতিনিধি ফয়সাল বিন নয়ন।

 

পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি মতিউরের গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর
নরসিংদীর রায়পুরায় প্রতিষ্ঠার সাত বছরেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। গ্রন্থাগারে কিছু বই থাকলেও জাদুঘরে বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতিচিহ্ন নেই। অবহেলায় পড়ে আছে- তার পৈত্রিক ভিটা  বাড়িটি। বাড়ির ঘরটি জরাজীর্ণ হওয়ায় সেখানে তৈরি করা হয়েছে দু’চালা টিনের ঘর। উঠানেই রয়েছে মতিউর রহমানের নামফলক। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাত বীরশ্রেষ্ঠের নামে তাদের গ্রামের করার সিদ্ধান্ত নিলেও এখনো তা আটকে আছে কাগজ-কলমে।

 

বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত সাত জন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধার অন্যতম ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। তিনি ১৯৪১ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকার ১০৯ আগা সাদেক রোডের ‘মোবারক লজ’-এ জন্ম নেন। তার বাবার নাম মৌলভী আবদুস সামাদ ও মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। নয় ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মতিউর ছিলেন ষষ্ঠ। 

 

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তানের সিন্দুতে থাট্টা নামক স্থানে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শাহাদৎবরণ করেন এ অসম সাহসী এবং অত্মবিশ্বাসী সামরিক অফিসার। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের পৈত্রিক নিবাস নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে।

 

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মেঘনা নদীর গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে রামনগর গ্রাম। এখানে কাটে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের শৈশব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বীরশ্রেষ্ঠ পদক প্রাপ্তদের স্মরণে বীরশ্রেষ্ঠের নামে তাদের গ্রামের নাম করার সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে মতিউর রহমানের পৈত্রিক গ্রামটি আনুষ্ঠানিকভাবে নামকরণ করা হয়েছিল মতিউর নগর হিসেবে। পরে রামনগর গ্রামের প্রধান ফটকে এলাকাবাসীর উদ্যোগে মতিউর নগর নামে সাইন বোর্ড লাগানো হয়। বর্তমানে এটি মতিউর নগর সাইন বোর্ডেই সীমাবদ্ধ। সরকারের সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়িত না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে রামনগর হিসেবে পরিচিতি রয়েছে।

 

মতিউর রহমানের স্মরণে ওই গ্রামের ঠিক মধ্যখানে রামনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের পূর্বদিকে নরসিংদী জেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০০৮ সালে ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। কিন্তু এ গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে নেই মতিউর রহমানের স্মৃতি।

 

 

তত্ত্বাবধায় সরকারের আমলে নরসিংদী জেলা স্টেডিয়ামটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়াম নামকরণ করা হলেও বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার এটি নামকরণ করেছেন মুসলেউদ্দিন ভূইয়া স্টেডিয়াম নামে। এ ছাড়া বীরশ্রেষ্ঠের জন্ম ও শাহাদৎবার্ষিকী স্মরণেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত পালন করা হয়নি কোনো অনুষ্ঠান।

 

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক এনামুল হক বলেন, জাদুঘরটি এক নজর দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দর্শনার্থীরা ঘুরতে আসলেও তাদের নিরাশ হয়ে চলে যেতে হচ্ছে। গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে প্রবেশ করে বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে না পেয়ে তারা হতাশা ব্যক্ত করেন।

 

গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের সহকারী গ্রন্থাগারিক আকলিমা আক্তার জানান, গ্রন্থাগারটি প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানে প্রায় পাঁচ বছর আগের কিছু বই ছাড়া নতুন বই নেই। তাই দিন দিনই দর্শনার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। গ্রন্থাগারে নতুন নতুন বই যোগ হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের চাহিদা রয়েছে বেশি।

 

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ভাতিজা নান্নু রহমান জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লোকজন গ্রন্থাগার ও জাদুঘর পরিদর্শনের পাশাপাশি মতিউর রহমানের পৈত্রিক বাড়িতেও আসেন। তারা তার চাচার সম্পর্কে জানতে চান। নিজের চোখে দেখা মতিউর রহমানকে তাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তার বিশ্বাস সকলে মতিউর রহমানের গল্প শুনে উদ্বুদ্ধ হয় দেশপ্রেমে।

 

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থ থাকায় তার বোন রোজি কুদ্দুস রাইজিংবিডিকে বলেন, মতিউর রহমান দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। গ্রামবাসী রামনগরের পরিবর্তে মতিউর নগর নামটি গ্রহণ করে এদেশের সকল মুক্তিযোদ্ধাকে বরণ করে নিয়েছিল। তবে সরকার গেজেট প্রকাশে বিলম্ব করায় প্রশাসনিকভাবে নামটি ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে তারা শুনেছেন, নামের গেজেট হয়ে গেছে। বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিজি প্রেসে রয়েছে, তাদের হাতে পৌঁচ্ছেনি।

 

ভাতা ছাড়া কিছুই পায় না বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিনের পরিবার
সরকারিভাবে মাসিক ভাতা ছাড়া তেমন কিছু পায় না ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পরিবার। বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর রক্ষণাবেক্ষণসহ যাবতীয় খরচের জোগান দিতে হয় পরিবারের। বিশেষ দিনে এলাকার মানুষ ঘটা করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করলেও বাকি সময় কেউ খোঁজ রাখে না।

 

মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ বরিশালের বাবুগঞ্জ থানার রহিমগঞ্জ গ্রামে (বর্তমান জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়ন) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবদুল মোতালেব হাওলাদার ও মা সাফিয়া বেগম। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছিলেন সবার বড়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাবা-মা মারা যান। ২০০১ সালে মারা যান তার বড় বোন হেলেনা বেগম। দুই বোনের বিয়ের পর ভাই মঞ্জুর আহম্মেদ পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

 

 

বাল্যবন্ধু আজাহার মাস্টার জানান, বীরশ্রেষ্ঠের ছোট দুইবোন বেঁচে আছেন। ছোট বোন হাজেরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলেও অভাব অনটনে দিন কাটছে বড় বোন জোহরার। বীরমাতা মুকিদুন্নেছা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকতেন সরকারের দেওয়া বাড়িতে, মুন্সী আব্দুর রউফের এক চাচাতো ভাই আর বীরমাতার পালক ছেলে মুন্সী আইয়ুব আলীর সঙ্গে। 

 

আড়পাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বদরুজ্জামান বাবু জানান, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বীরমাতার শেষ ইচ্ছে ছিল বীরশ্রেষ্ঠের নামে একটি উপজেলা গঠন করার। যার নাম হবে রউফ নগর। সেই ইচ্ছের কথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও বলেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দিয়েছিলেন। তার নির্দেশের পরে জরিপের জন্য কাগজপত্র এসেছিল ফরিদপুর প্রশাসনে। কিন্তু তারপর এর অগ্রগতি হয়নি। স্বজনসহ স্থানীয়দের দাবি, বীরমাতার শেষ ইচ্ছে যেন দ্রুতই পূরণ করে সরকার।

 

আড়পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান জানান, বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফের বাড়ি সালামতপুরে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটির কয়েকশ মিটার এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। বাড়িটিও রয়েছে নদীভাঙনের মুখে। যেকোনো সময় বাড়িসহ মিউজিয়ামটি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।

 

জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের বাসভবন
স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের বাসভবন ও গ্রামের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়নি। সরকারিভাবে তৈরি জরাজীর্ণ বাড়িতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন হামিদুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা। বীরশ্রেষ্ঠের নামে একটি গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর তৈরি হলেও আজও এর কেয়ারটেকারের চাকরি সরকারিকরণ হয়নি।

 

মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তদানিন্তন যশোর জেলার (বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলা) মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে। তার পিতার নাম আব্বাস আলী মণ্ডল এবং মায়ের নাম মোসাম্মাৎ কায়সুন্নেসা। শৈশবে তিনি খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে স্থানীয় নাইট স্কুলে সামান্য লেখাপড়া করেন।

 

১৯৭০ সালে হামিদুর যোগ দেন সেনাবাহিনীতে সিপাহী পদে৷ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে চাকরিস্থল থেকে নিজ গ্রামে চলে আসেন। বাড়িতে একদিন থেকে পরদিনই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য চলে যান সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল থানার ধলই চা বাগানের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ধলই বর্ডার আউটপোস্টে। তিনি ৪নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

 

 

মা মালেকা বেগমের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল। সেই স্মৃতি আজো ভুলতে পারেননি তার মা মালেকা বেগম। অবহেলার মধ্যেই কেটে যাচ্ছে তাদের জীবন। সরকারি ভাতা যা পান, তা ব্যয় হয়ে যায় চিকিৎসা খরচে। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি আজও এমপিওভুক্ত হয়নি। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল গ্রন্থাগার ও স্থৃতি জাদুঘরটিও রয়েছে অবহেলিত।

 

 

মালেকা বেগম রাইজিংবিডিকে বলেন, ছেলে যুদ্ধে যাওয়ার আগে বলেছিল- ‘মা যুদ্ধে যাচ্ছি, সবাই ফিরে এলেও আমি যুদ্ধ শেষ না করে ফিরে আসব না।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু ছেলে আর ফিরে এলো না। দেশের জন্য রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল। এমন সন্তান জন্ম দিতে পেরে আমি গর্বিত, আনন্দিত।’
 
 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ ডিসেম্বর ২০১৫/টিপু/দিলারা/উজ্জল/সাইফ/বকুল

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge