ঢাকা     বুধবার   ০৫ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২১ ১৪২৭ ||  ১৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

চীন ভারত যুদ্ধ: সামরিক শক্তিতে কে এগিয়ে

জাহিদ সাদেক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৪:৪৫, ২৯ জুন ২০২০  

ভারত-চীন সীমান্ত সমস্যা নতুন নয়। চীনের দাবি অনুযায়ী ভারতের সঙ্গে তাদের যে সীমান্তরেখা, তাতে অরুণাচল প্রদেশ এবং লাদাখের কিছু অংশ তৎকালীন চীন সাম্রাজ্যের অংশ। ব্রিটিশরা যখন ১৯১৩ সালে সিমলা চুক্তি করে একটি সীমান্তরেখা এঁকেছিল- ম্যাকমোহন লাইন এবং লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি); চীন কখনো এটি মেনে নেয়নি। কিন্তু ব্রিটিশদের চিহ্নিত সেই সীমারেখা অনুযায়ী ভারত তাদের অংশ দাবি করে আসছে। দু’দেশের সংঘর্ষের সূচনা এখান থেকেই।

সম্প্রতি ভারতের লাদাখের গালওয়ান উপত্যকা ও চীনের আকসাই সীমান্তে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দু’দেশের সেনারা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৬২ সালে একই জায়গায় ভারত চীন ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। যদিও এর প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সেই যুদ্ধে ভারত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। এরপর প্রায় ৫৮ বছর তেমন কোনো বড় সংঘর্ষ হয়নি দু’দেশের মধ্যে। তবে বর্তমান অবস্থা ভিন্ন। পুনরায় সীমান্ত নিয়ে দু’দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ঘটেছে হতাহতের ঘটনাও। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে দু’দেশই তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারত বিশ্বে অস্ত্র কেনায় প্রথম স্থান দখল করে রেখেছিল। কিন্তু এখন তা চীনের দখলে। সামরিক খাতে ভারতের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খরচ করে চীন।

গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার (জিএফপি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১৩৯ কোটি এবং ভারতের ১২৯ কোটি। কিন্তু ভারতের সেনাসদস্য আছে প্রায় ৩৫ লাখ আর চীনের রয়েছে প্রায় ২৬ লাখ। এদিক থেকে ভারত এগিয়ে। তবে জিএফপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরেই চীনের অবস্থান। এরপরই আছে ভারত।

বিজনেস ইনসাইডারের তথ্যমতে, সামরিক ব্যয়ের দিক দিয়ে চীনের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। তাদের বার্ষিক সামরিক ব্যয় ২৬১০০ কোটি ডলার এবং ভারতের ব্যয় ৭১১০ কোটি ডলার। যা ভারতের ব্যয়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। যুদ্ধবিমানের শক্তির দিক থেকেও চীন ভারতের একধাপ উপরে। তাদের কাছে আছে ৩২১০টি যুদ্ধবিমান, ভারতের আছে ২১২৩টি। চীনের ব্যবহার উপযোগী ৫০৭টি বিমানবন্দর থাকলেও ভারতের আছে ৩৪৬টি। 

জিএফপি-এর তথ্যমতে, চীনের ফাইটার বিমান আছে ১২৩২টি, ভারতের ৫৩৮টি। চীনের হেলিকপ্টার ৯১১টি, ভারতের আছে ৭২২টি। আক্রমণকারী হেলিকপ্টার চীনের ২৮১টি, ভারতের ২৩টি। চীনের ৩৫০০টি ট্যাঙ্ক থাকলেও, এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে ভারত। ভারতের ট্যাঙ্কের সংখ্যা ৪২৯২।

অন্যদিকে চীনের ৩৩ হাজার সাজোয়া যান আছে। ভারত এক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে। তাদের আছে ৮৬৮৬টি সাজোয়া যান। চীনের সক্রিয় আর্টিলারি ৩৮০০, ভারতের আছে মাত্র ২৩৫। উপকূলীয় টহলে চীনের ২২০টি দল থাকলেও ভারতের আছে ১৩৯টি দল। চীনের রকেট উৎক্ষেপক আছে ২৬৫০টি কিন্তু ভারতের আছে মাত্র ২৬৬টি। ভারি যুদ্ধ জাহাজ চীনের ২টি থাকলেও ভারতের আছে ১টি। চীনের রণতরী আছে ৫২টি, ভারতের ১০টি। চীনের বিশেষ রণতরী আছে ৫০টি, ভারতের ১৯টি। চীনের সাবমেরিন আছে ৭৪টি, ভারতের আছে ১৬টি। 

বিশ্ব শান্তি নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠার ‘স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এসআইআরপিআই) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ১৯৬৪ সালে, ভারত ১৯৭৪ সালে পারমাণবিক শক্তিধর দেশের তালিকায় নাম লেখায়। চীনের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ভারতের প্রায় দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। চীনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে প্রায় ৩২০টি। কিন্তু ভারতে আছে মাত্র ১৫০টি। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চীন তাদের অস্ত্রাগারে নতুন ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র যোগ করলেও ভারত করেছে ১০টি।

এদিকে বোস্টনের হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল অফ গভর্নমেন্টের বেলফার সেন্টার এবং ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সাম্প্রতিক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। বেলফার সেন্টারের মার্চ মাসে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, চীনের সামরিক বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্স (পিএলএএফ) লাদাখ অঞ্চলে যে আটটি ঘাঁটি গড়ে তুলেছে এর বেশিরভাগই এতো উচ্চতায় রয়েছে তা বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বেলফারের প্রতিবেদনে অনুমান করে বলা হয়েছে, গালাওয়ান অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ভারতীয় স্থলবাহিনীর বিপরীতে চীনের রয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজারের মতো সদস্য। তবে ক্রমেই দুই দেশ ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে।

সম্প্রতি বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে অন্তত তিনটি অস্ত্রের কারণে চীনের সামরিক শক্তি অনন্য। যা ভারত তো বটেই অন্য সকল দেশের জন্যই ভয়ের কারণ হতে পারে। যুদ্ধবিমানে স্থাপন করা হাইপারসনিক স্পিড সংবলিত অস্ত্র। এটি শব্দের পাঁচগুণ গতিতে গুলি ছুড়তে পারে। অনেকদিন ধরেই বিশ্বের অনেক দেশ এমন অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে কিন্তু চীন এক্ষেত্রে সফল হয়েছে। ‘রেলগান’ নামের এই অস্ত্রটি সেকেন্ডে আড়াই কিলোমিটার গতিতে গুলি ছুড়তে পারে। এবং দুইশ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। চীনের আরো আছে হাইপারসনিক বিমান। যেটি বিশ্বের যেকোনো মিসাইল প্রতিরক্ষা ফাঁকি দিতে সক্ষম।

সার্বিক দিক বিবেচনায় সামরিক শক্তিতে  চীন এগিয়ে থাকলেও কৌশলগত কারণে এগিয়ে আছে ভারত।

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়