ঢাকা, সোমবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ছুঁয়ে দিলে মন : ভালোবাসা এবং মম’র দৌড়

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৫-১২ ৫:০৮:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৮:২৯ এএম

নাবীল অনুসূর্য : কয়েকটি কারণে ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ সিনেমাটি আগ্রহের দাবিদার। প্রথম কারণ, সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন সারা যাকের। দ্বিতীয়ত, সিনেমাটির নায়িকা জাকিয়া বারী মম, খলনায়ক ইরেশ যাকের। তৃতীয় কারণটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। অনেকদিন পরে মিশা সওদাগর খলনায়ক নয়, একটি ইতিবাচক পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাও আবার একবার মাত্র গুলি ফুটিয়ে শালাকে (নায়ককে) বাঁচানো ছাড়া সে চরিত্রের তেমন কোনো গুরুদায়িত্বও নেই। চতুর্থ কারণ, সিনেমাটি ব্যবসা করছে। সুতরাং সিনেমাটির বিশ্লেষণে প্রয়াসী হওয়াই যায়।


এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের সিনেমার বাস্তবতায়, সিনেমার কাহিনির মৌলিকতা বিচার করা বাতুলতা। তবে ‘ছুঁয়ে দিলে মন’-এর কাহিনিতে গতানুগতিকতা থেকে বের হওয়ার একটা চেষ্টা অন্তত আছে। অবশ্য তাতেও ছোটবেলার প্রেমতত্ত্ব থেকে বের হওয়া যায়নি। ছোটবেলায় যে ছেলেমেয়েদের মধ্যে এক ধরনের নিষ্পাপ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়, আমাদের সিনেমা দেখলে সেটা বিশ্বাস করা বেশ শক্ত। এই ছোটবেলার প্রেমতত্ত্ব, দীর্ঘদিন পরে আবার দেখা, নায়ক-নায়িকার অসম সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক বিরোধ, বড় হয়ে বাবা-মায়ের অপমানের প্রতিশোধ প্রভৃতি প্রথাগত উপাদান থাকার পরও কাহিনিটিকে খানিকটা অন্যরকমই মনে হয়েছে। তার একটা বড় কারণ, বেশ কিছুদিন ধরে আমরা যে অ্যাকশন-রোম্যান্স ঘরনায় পড়ে আছি, সিনেমাটি সেখান থেকে খানিকটা বের হয়ে এসে শুধু রোম্যান্স ঘরনায় ঘাঁটি গেড়েছে। কাহিনিটিকে আবার একেবারে অ্যারিস্টটলিয় ট্র্যাজেডির ছকেও ফেলা যায়, সমাপ্তির মিলনটুকু ছেঁটে ফেললে।


কাহিনিতে যে শহর দেখানো হয়েছে, তার নাম হৃদয়পুর। এর মাঝ দিয়ে একটি নদী বয়ে গেছে। এর দুপাড়ের মানুষের মাঝে দ্বন্দ্ব। দুইপাশে দুই দল রাজত্ব করে। কারণে-অকারণে তারা একজন আরেকজনের সঙ্গে মারামারি করে। এই বিষয়টা যে বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ, সেটাও রসিকতা করতে করতে বলে দেয়া হয়েছে— ‘জানো না কোন দুই দল? দেশে থাকো, না বাইরে থাকো?’


কাহিনিতে বেশ কয়েকটা ভালো টুইস্টও আছে, যেগুলো অনুমানদুরূহ। বিশেষ করে সিনেমার মাঝপথে নায়ক-নায়িকার বিচ্ছেদটা ভীষণই আকস্মিক। বিপরীতে সিনেমার ক্লাইমেক্সটা অনেকটাই শিথিল; পুরো সিনেমা যেমন বেশ একটা গতি ধরে রেখে এগোচ্ছিল, দর্শকদের আগ্রহও ধরে রাখছিল, ক্লাইমেক্স তার তুলনায় যুৎসই হয়নি। তবে কাহিনিতে যে টুকরো টুকরো রঙ্গ-রসিকতা ছিল, সেগুলো খারাপ ছিল না। বিশেষত সেগুলো অন্তত অতি-স্থূলতা দোষে দুষ্ট ছিল না।


কাহিনিতে কন্টিনিউয়িটি বেশ ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছে। সম্ভবত স্ক্রিপ্টিংয়ের সময় কন্টিনিউয়িটির বিষয়টা বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। যেমন আবিরের পরিবারকে ধাপে ধাপে হৃদয়পুরে একঘরে করা দেখিয়ে তাদের সেখান থেকে চলে আসার কার্যকারণ প্রতিষ্ঠিত করা, নায়িকার বাবা শেখ আফজাল খানের দাদার মূর্তি প্রসঙ্গে বারবার বাজপাখির কথা বলে আগে থেকেই বাজপাখির গুরুত্ব জানিয়ে রাখা, বাচ্চাদের গান শেখানোর পরে তাদের দিয়ে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই না করিয়ে পরেও একদম সিনেমার শেষে গিয়ে গান গাওয়ানো, বারবার হৃদয়পুর শহর বলে বেশ কিছু জটিলতা এড়ানো (কেন রেলস্টেশনে এত আগ্রহোদ্দীপক একটা ঘটনা ঘটার পরও শহরের কুতুব ড্যানি কিংবা শেখ আফজাল সেগুলো জানতে পারল না? গ্রামে-মফস্বলে এ ঘটনা রাষ্ট্র না হওয়া অসম্ভব, একমাত্র নাগরিক সমাজেই এসব ঘটনার চরিত্রের পরিচয় ‘হয়তো-বা’ গোপন থাকা সম্ভব) ইত্যাদি।


তবে শুটিংয়ের সময় মনে হয় কন্টিনিউয়িটির বিষয়টি সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। আর তাই আবিরের মাথার উপরের দিকে ইট লাগলেও পরে ক্ষত দেখা যায় কপালে! আবার আবিরকে রড দিয়ে মারার পর তার মুখমণ্ডলে যে ক্ষতগুলো হল, সেগুলোও আঘাতের তুলনায় কোমল বলেই মনে হয়। একবার তো নীলার পিছে দাঁড়িয়ে থাকা একটা আস্ত গাড়িই অদৃশ্য হয়ে যায়। আর একবার হঠাৎ করেই ড্যানি ভাইয়ের কানের পাশের চাঁছা চুল বড় হয়ে পরের সিকোয়েন্সেই আবার ছোট হয়ে যায়।


সিনেমাটিতে নায়ক আবির চরিত্রে আরেফিন শুভ-র অভিনয় তার অন্যান্য সিনেমার মতোই, মোটের উপর মন্দ হয়নি। তবে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, এবং তার নিজস্ব একটা দর্শকশ্রেণীও তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে তিনি এখন ভিনদেশি কোনো নায়কের অনুসরণ না করে নিজস্ব শৈলি-ঢং-নাচ-দৌড় ইত্যাদি নির্মাণের চেষ্টা করতেই পারেন। নায়িকা নীলার চরিত্রে মম-র অভিনয় প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। বিশেষত তিনি যেহেতু সংশ্লিষ্ট বিষয়েই পড়াশুনা করেছেন, তার কাছ থেকে প্রত্যাশা থাকে আরও বেশি। তবে তার চরিত্রে ‘দৌড়ে’র এত আধিক্য না থাকলে হয়তো তার অভিনয় আরো উপভোগ করা যেত। খলনায়ক ড্যানি ভাইয়ের চরিত্রে ইরেশ যাকেরের অভিনয় ভালো হয়েছে। মিশা সওদাগর সাধারণত যেমন চরিত্রে অভিনয় করেন, এ সিনেমায় তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাতে অবশ্য তার অভিনয়ের ধার কমেনি। চরিত্রের ধরন বদলালেও, তিনি ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছেন। অন্যান্যদের অভিনয়ও চলনসই। সব মিলিয়ে কারও অভিনয়ই তেমন পীড়া দেয়নি।


নীলা তথা মমর কস্টিউম সুন্দর হলেও, খানিকটা যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘চুলকানি’ দেয়। পাশাপাশি তাকে বাসায় হাই হিল পরানোটা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছিল কিনা, সেটাও ভাববার বিষয়। আর তার মেকআপও খানিকটা যেন বেশিই হয়ে গিয়েছিল। আলোর কারসাজিতে কিংবা কালার কারেকশনের কারিকুরিতে সেটা চোখে পীড়াদায়ক না ঠেকলে অবশ্য সমস্যা ছিল না। নায়ক আবিরের কস্টিউম, কিংবা খলনায়ক ড্যানি ভাইয়ের কস্টিউম ভালোই হয়েছে। বাকিদের কস্টিউমও চরিত্র অনুযায়ী চলনসই।


সিনেমাটিতে সবচেয়ে দুর্দান্ত কাজ হয়েছে মিউজিক ডিপার্টমেন্টে। গানগুলো বেশ ভালো। টাইটেল গান‘তুমি ছুঁয়ে দিলে এই মন’ অনেকদিন মনে রাখার মতো। নায়ক-নায়িকার ছোটবেলার প্রেমের স্মৃতিধন্য গানটিও বেশ। পাশাপাশি প্রায় অবশ্যম্ভাবী আইটেম সং না থাকলেও, তার অভাব সেভাবে অনুভূত হয়নি। সে অভাব পুষিয়ে দিয়েছে গানগুলোতে নায়িকার পোশাক এবং ক্যামেরার যুগপৎ কারিকুরি। শুধু গানেই না, পুরো সিনেমাতেই মম-র মুখের সৌন্দর্যর প্রতি কিংবা তার সামগ্রিক সৌন্দর্যের প্রতি যত মনোযোগ দেয়া হয়েছে, তারচেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দেয়া হয়েছে মম-র কোনো একটি বিশেষ সৌন্দর্যের। আর সে মনোযোগ এতটাই বেশি ছিল, তাতে পরিমিতিবোধের এতটাই অভাব ছিল, শেষ পর্যন্ত সে সৌন্দর্যটা আর তেমন আকর্ষণীয়ই থাকেনি। আকর্ষণীয় সেই বিষয়টা নিতান্ত ‘দুধ-ভাত’ মনে হচ্ছিল।


আবার বড় হয়ে রকস্টার হওয়ার পথে থাকা নায়ক যখন নায়িকার কলেজে গিয়ে তাদের ছোটবেলার প্রেমের স্মৃতিধন্য গানটি গাচ্ছিলেন তার অঙ্গভঙ্গিতে রকস্টার ভাব থাকলেই বোধ হয় ভালো হত। নিদেনপক্ষে তার ঘরে যেহেতু প্রচুর মাইকেল জ্যাকসনের পোস্টার সাঁটানো ছিল। তার অঙ্গভঙ্গি পপস্টারের মতো হলেও মানা যেত। কনসার্টের অঙ্গভঙ্গি অবশ্যই মিউজিক ভিডিও ধরনের হওয়ার কথা নয়।


সিনেমাটিতে অ্যাকশন দৃশ্য কম, অপ্রয়োজনীয় অ্যাকশন দৃশ্য নেই-ই বলা চলে। অ্যাকশন দৃশ্য খুবই কম বলে, সেই অল্পকিছু অ্যাকশন স্ট্যান্ট বেশ মনোযোগ দিয়ে করা যেত। নায়িকার বাবার দাদার মূর্তি দাঁড়া করাতে গেলে, নায়ক আবির আর তার কমেডিয়ান বন্ধু রাহাতকে ছুঁড়ে মারা ইটগুলো যে ফোমের ছিল না, তা বিশ্বাস করা বেশ কষ্টকরই ছিল। তবে মাঙ্কি পাঞ্চের বিষয়টা বেশ উপভোগ্য ছিল, বিশেষ করে সারা সিনেমায় রম্য উপাদান হয়ে থাকা মাঙ্কি পাঞ্চ যখন শেষ দৃশ্যে গিয়ে ভীষণ কার্যকর উপাদানে পরিণত হয়।


সিনেমাটির সিনেমাটোগ্রাফি দুর্বল। শটগুলো প্রায়শই ডিফোকাস্ড। কিছু জায়গায় মুন্সিয়ানা থাকলেও, সব মিলিয়ে সিনেমাটোগ্রাফিকে ভালো বলা মুশকিল। কালার কারেকশন আরও দুর্বল। আর তাই লোকেশন বেশ ভালো হলেও, তার পুরো স্বাদ পাওয়া যায়নি। সাউন্ড ডিজাইনিং অবশ্য ভালোই হয়েছে। নায়িকার নিঃশ্বাসের শব্দ একটু বেশি জোড়ালো হয়ে গেলেও, বাকি সময় সব ঠিকঠাকই ছিল।


প্রথার বাইরে এসে নিতান্ত একপেশে অ্যাকশন নির্ভর সিনেমা না বানানোর জন্য একাধারে সিনেমাটির কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক শিহাব শাহিনের ধন্যবাদ পাওনা। যদিও শেষ পর্যন্ত ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ মনে থাকবে দুটি কারণে— অসাধারণ গানগুলোর জন্য, এবং মম-র দৌড় আর তার বিশেষ সৌন্দর্য উপস্থাপনের আধিক্যের জন্য।

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ মে ২০১৫/নাবীল/রাশেদ শাওন

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন