ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোট ছেলের উৎসাহে পুরো পরিবার জঙ্গিবাদে

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১১ ৫:৪৯:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-১১ ৭:৪৭:৪৯ পিএম
ছবি : ইন্টারনেট

সিভিল অ‌্যাভিয়েশনের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার আবু তুরাব খানের পুরো পরিবার জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তুরাব খানের ছোট ছেলে নব্য জেএমবির আমির আকরাম হোসেন খান নিলয় ওরফে স্লেড উইলসন। মূলত তার উৎসাহেই পুরো পরিবার জড়িয়ে পড়ে জঙ্গিবাদে।

দুই বছর আগে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে অবস্থান নিয়ে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচিতে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনার মামলায় ঐ পরিবারের ৪ জনসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজু আহম্মেদ সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় গত ২৪ নভেম্বর ঢাকা সিএমএম আদালতে চার্জশিট জমা দেন।

একই পরিবারের ওই চার সদস্য হলেন- কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন থানার চারিগ্রামের মিছির আলী খানের ছেলে আবু তুরাব খান (৫৬), তার স্ত্রী সাদিয়া হোসনা লাকী (৪৬), ছেলে আকরাম হোসেন খান নিলয় ওরফে স্লেড উইলসন (২৪) ও মেয়ে তাজরীন খানম শুভ (২৯)। নীলয় তাদের প্রত্যেককে জঙ্গিবাদে উৎসাহিত করে। চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা এমনটাই উল্লেখ করেছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, নীলয় প্লে শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ধানমন্ডি অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়াশোনা করে। ২০১০ সালে ৮ম শ্রেনিতে উত্তরা স্কলাসস্টিক স্কুলে ভর্তি হয়। ২০১২ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিল ধানমন্ডি থেকে ও-লেভেল এবং ২০১৪ সালে এ-লেভেল পাশ করে। ওই বছর রমজান মাসে গুলশান আজাদ মসজিদে ইতেকাফে বসে। পরে নাইজেরিয়ান নাগরিক ওয়াহেবি, তামিম আহমেদ চৌধুরী, গালিব, তুরাজ, নিবরাস ইসলামের সাথে দেখা ও পরিচয় হয়। তাদের পরামর্শে আইএস এর বিভিন্ন অডিও, ভিডিও, ডকুমেন্টারি দেখে আইএস এর মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নব্য জেএমবিতে যোগদান করে। পরে জেএমবির একাংশ কথিত নব্য জেএমবির আমির নিযুক্ত হয়। আমির হয়ে তার পরিবারের সদস্যদের নব্য জেএমবিতে যোগদান করায়। তার পরিবার ও নব্য জেএমবির অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং সাংগঠনিক সন্ত্রাসী কাজে ব্যয় করে। এছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশের প্রাপ্ত রিপোর্ট হতে লেনদেন  প্রমাণ পাওয়া যায়।

চার্জশিটে বলা হয়, নিলয় ভারতে অবস্থান করে অন্যান্য সদস্যদের সাথে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন অ‌্যাপস এর মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে। তাদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেয়। ২০১৭ সালে নাজমুল হাসান মামুন, আব্দুল্লাহ আয়চান কবিরাজ, আবুল কাশেম ফকির, কিশোর তাজুল ইসলাম এবং অন্যান্যদের সহযোগিতায়  বোমা তৈরি করে আত্মঘাতী সদস্য সাইফুল ইসলামের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। উদ্দেশ্যে ছিল ১৫ আগষ্ট ২০১৭ ধানমন্ডি ৩২ এ অনুষ্ঠিত জাতীয় শোক র‌্যালিতে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বহু লোককে হতাহত করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর  কঠোর নজরদারি ও ব্যাপক তৎপরতার কারণে তা ব্যাহত হয়। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা হোটেল ওলিওতে অবস্থানরত সাইফুল ইসলামকে ধরতে সর্বোচ্চ কৌশল অবলম্বন করে। আত্মঘাতী সাইফুল ইসলাম ৩০১ নম্বর কক্ষে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং নিহত হয়।

চার্জশিট থেকে জানা যায়, নিলয়ের বাবা আসামি আবু তুরাব খান ১৯৭৯ সালে এসএসসি এবং ১৯৮২ সালে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন। তিনি সড়ক ও জনপদ বিভাগ, সিভিল অ‌্যাভিয়েশনের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। ছেলে আকরাম হোসেন নিলয়ের মাধ্যমে নব্য জেএমবিতে যোগদান করেন। নব্য জেএমবি সংগঠনের জন্য তার ছেলে নিলয় যখন অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছিলেন তখন তুরাব খান তার পাসপোর্ট ব্যবহার করে কয়েক দফা ভারতে গিয়ে নব্য জেএমবি সংগঠনের কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য নব্য জেএমবির আমির নিলয়কে বিভিন্ন অংকের অর্থ প্রদান করেন। নিলয়ের মা সাদিয়া হোসনা লাকী ১৯৮৬ সালে কুমিল্লা বোর্ড থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। ছেলে নিলয়ের মাধ্যমে নব্য জেএমবিতে যোগদান করেন। তিনিও তার পাসপোর্ট ব্যবহার করে কয়েক দফা ভারতে গিয়ে নব্য জেএমবি সংগঠনের কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য নিলয়কে বিভিন্ন অংকের অর্থ প্রদান করেন এবং অবৈধভাবে ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরির জন্য অর্থ প্রদান করে। নব্য জেএমবি সংগঠনের জন্য অর্থায়ন করে এবং নিলয় নির্দেশক্রমে নব্য জেএমবি সদস্যদের অর্থ প্রদান করে।

নিলয়ের বোন তাজরিন খানম সম্পর্কে চার্জশিটে বলা হয়, তাজরিন ২০০৬ সালে এসএসসি ও ২০০৮ সালে এইচএসসি এবং ২০১৪ সালে কম্পিউটার সায়েন্স অ‌্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক করে। পরে ভাই নিলয়ের মাধ্যমে নব্য জেএমবি যোগদান করে। তাজরিন তার পাসপোর্ট ব্যবহার করে কয়েক দফা ভারতে যায়। নিলয়ের সাথে দেখা করে। উদ্দেশ্যে ছিল বাংলাদেশে নব্য জেএমবির বর্তমান অবস্থা সবিস্তারে জানানো এবং নিলয়ের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা গ্রহণ করা। নিলয়ের নির্দেশ মোতাবেক সংগঠনের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন অপারেশনে উক্ত সদস্যদের কাছে পাঠানো।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠান চলার মধ্যেই ৩০০ মিটার দূরে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে অভিযান চালান কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও সোয়াট সদস্যরা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা ওই অভিযানের এক পর্যায়ে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল থেকে বিকট বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ পাওয়া যায়। বিস্ফোরণে হোটেলের চতুর্থ তলার রাস্তার দিকের অংশের দেয়াল ও গ্রিল ধসে নিচে পড়ে।

হামলার পরিকল্পনা ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ওই সময় কলাবাগান থানায় মামলা দায়ের করেন কলাবাগান থানার এসআই সৈয়দ ইমরুল সায়েদ।


ঢাকা/মামুন খান/সাইফ

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও