ঢাকা     রোববার   ০৯ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৫ ১৪২৭ ||  ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

জনপ্রিয় হচ্ছে গ্রাম আদালত

100 || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৫:১৭, ২৭ নভেম্বর ২০১৯  

মামলা বা আদালত শব্দ দুটি শুনলেই প্রথম মনে পড়ে বিচার পাওয়ার দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কথা।

দেশের আদালতগুলোর মামলা জট আর দীর্ঘ সময় চলমান হওয়ায় অনেকেই ইচ্ছে থাকলেও বিচার পেতে শরণাপন্ন হতে চান না আদালতে মামলা দায়েরের।

পাশাপাশি মামলা চালাতে প্রয়োজন হয় অর্থের, যা সম্ভব হয়না দেশের গ্রামীণ জনপথের অধিবাসীদের। কিন্তু টাঙ্গাইলের গ্রামীণ জনপথের নিম্ন আয়ের মানুষদের সঠিক বিচার প্রাপ্তিতে আশার আলো জাগিয়েছে ভিন্নধর্মী এক আদালত বা বিচার ব্যবস্থা।

সেই ভিন্নধর্মী আদালত হল গ্রাম্য আদালত। নামেই যার কার্যকারিতা প্রকাশ পায়। গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা নিষ্পত্তির জন্য ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় গঠিত হয় এই আদালত। সহজ কথায় ২০০৬ সালের গ্রাম আদালত আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদে ২৫০০০ টাকা মূল্যমানের দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা নিষ্পত্তির জন্য পরিষদে যে আদালত বসে সে আদালতকেই বলে গ্রাম আদালত।

এই আদালতে গ্রামাঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত মানুদের নানা বিষয়ে সুবিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এখতিয়ার সম্পূর্ণ এলাকার জনগণ ফৌজদারী হলে দুই টাকা এবং দেওয়ানী হলে চার টাকা দিয়ে নিজ ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে এই মামলা দায়ের করতে পারেন। এই আদালতে কোন বিচার পাওয়ার জন্য কোন আইনজীবীর প্রয়োজন না খরচের সম্মুক্ষীণ হতে হয় না বাদী বা বিবাদীর কারোরই। পরতে হয় না বিচার প্রাপ্তিতে সময়ের ভোগান্তিতে। স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং গন্যমান্য বিচারকের উপস্থিতিতে বসে এই আদালত।

এই আদালতে বিচারক সংখ্যা থাকে পাঁচজন, আর বাদী-বিবাদীর পক্ষে থাকে দুইজন করে। সেই দুইজনের একজন থাকতে হয় ইউপি সদস্য। স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে এই আদালতে বিচারকার্য পরিচালিত হয় বলে সুযোগ থাকে না কোন মিথ্যার আশ্রয়ের।

সূত্র মতে, বিচার ব্যবস্থায় দেশের দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে ২০০৬ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে গ্রাম আদালত প্রতিষ্ঠা করে সরকার। তখন থেকেই টাঙ্গাইলের ১১৮ ইউনিয়নেই শুরু হয় এই আদালতের কার্যক্রম। প্রথম দিকে তেমন জনপ্রিয়তা না থাকলেও সময়ের ব্যবধানে জেলার প্রতি উপজেলাতেই বাড়ছে এই বিচার ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে জেলার দীর্ঘ চরাঞ্চল এলাকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই আদালত।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের পাচকাহনিয়া গ্রামের আনিছুর রহমান। প্রায় কয়েক মাস আগে প্রতিবেশী জামাল হোসেনের সাথে ৮০ হাজার টাকা লেনদেনের বিষয়ে বিবাধে জড়িয়ে পড়েন। নিজেদের মধ্যে পারিবারিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেও সফল হননি এই দুই ব্যক্তি। ফলে দারস্ত হন স্থানীয় ইউনিয়নের গ্রাম্য আদালতে। সেখানেই মেলে সেই বিবাদের মীমাংসা।

আনিছুর রহমান বলেন, ‘এই আদালতে আমাদের দ্বন্দ্বের বিষয়টি জানানোর পর স্থানীয় চেয়ারম্যান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা আদালতে বিচার করা হয়। এতে আমাদের দুই পক্ষের কারোরই কোন আইনজীবী বা অর্থ খরচ হয়নি। অথচ আদালতে মামলা করলে হয়তো অনেক খরচ হয়ে যেতো। সেই সাথে বিচার সমাপ্তের দীর্ঘ সময়ের ঝামেলা তো হতো।’

একই কথা বলেন বিবাদী জামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘নিজেরা চেষ্টা করে যে বিষয়টি দীর্ঘ দিনেও সমাধানে আনতে পারিনি, গ্রাম্য আদালতের সেই বিচারে সহজেই আমরা সমাধানে পৌঁছে গেছি।’

ওই ইউনিয়নের বাউশা গ্রামের নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘জমি জমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবেশী এক ব্যক্তির সাথে আমার বিরোধ চলছিল। এই আদালতে জানানোর পর একদিনে আমাদের সেই দ্বন্দ্বের অবসান হয়। এখানে আমাদের দুই পক্ষকে বুঝিয়ে বিষয়টি সমাধান করে হাত মিলিয়ে বন্ধুত্ব করিয়ে দেয়া হয়।’

জানা যায়, জেলার ১১৮ ইউনিয়নের সবকটিতেই চালু আছে গ্রাম আদালত। এর ফলে জেলার গ্রামের মানুষেরা তাদের ছোট ছোট যে কোন বিরোধ নিষ্পত্তি করতে দারস্থ হচ্ছে গ্রাম আদালতের। আর বিচার প্রার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে দু’পক্ষের পছন্দের মেম্বারদের নিয়ে গঠন করা হয় বিচারক প্যানেল, সাথে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান সভাপতি হিসেবে থাকেন। তারা অভিযোগের ওপর আলোচনা করে বিরোধ নিষ্পত্তি করে দেন। নিজ ইউনিয়নে বিচার হওয়ায় যাতায়তের খরচও নেই। ফলে বিচার চাইতে আসা বাদি ও অভিযুক্ত দু’পক্ষই খুশি। গ্রাম আদালতে বিচার হওয়ায় এখন সময়ও কম লাগে সেই সাথে খরচও নেই।

দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আরিফুর রহমান বলেন, ‘মূলত গ্রামের ছোটখাটো বিষয়, চুরি, জমি সংক্রান্ত বিরোধ, মারামারি নিয়ে এই আদালতে বেশির ভাগ অভিযোগ আসে। পরে এখানে খুব সহজ ও সুন্দরভাবে সেটার সমাধানের ব্যবস্থা করা হয়। আর এতে বাদী-বিবাদীর কোন অর্থ খরচ হয় না। এই অভিযোগই যদি জেলা আদালতে করা হতো তবে সেখানে আইনজীবির চার্জ, যাতায়াতসহ নানা বিষয়ে খরচ হতো।

কিন্তু এই আদালতে সেসব কোন কিছু খরচ না হওয়ায় বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষই খুশি থাকে। বাদী চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করলে পরবর্তীতে নোটিশের মাধ্যমে নির্ধারিত তারিখে বাদী ও বিবাদি হাজির করা হয়। পরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে ৫ সদস্যদের একটি বোর্ড গঠন করা হয়। পরে বাদী ও বিবাদী উভয়ের পক্ষেই একজন করে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও একজন করে মাতাব্বর নিয়ে আদালত পরিচালনা করা হয়।

সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লাভলু মিয়া বলেন, ‘সারাদেশের সকল ইউনিয়ন পরিষদেই গ্রাম আদালত রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা যখন তাদের ছোটখাটো বিভিন্ন সমস্যা, লেনদেন সংক্রান্ত সমস্যা, জমিজমা সংক্রান্ত সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসে, আমরা দ্রুতই সেটির সমাধান দেয়ার চেষ্টা করি। প্রতিটি ইউনিয়নেই সপ্তাহে একদিন করে গ্রাম আদালত বসে। সেখানে আমরা দুই পক্ষ থেকেই অভিযোগ শুনে তারপর গণ‌্যমান্যদের সাথে পরামর্শ করে সমাধানে যাওয়া হয়।

ফলে এই আদালতে মানুষ খুব সহজেই সমাধান পায়। এখানে উকিল রাখতে হয় না। ফলে কোন টাকা-পয়সাও খরচ হয় না। এ কারণে গ্রাম আদালতের ওপর মানুষের আস্থা বেশি। গ্রাম আদালতে নিস্পত্তি হওয়ার যোগ্য কোন মামলা চিফ জুডিশিয়াল আদালতে গেলেও অনেক সময় আদালত তা আবার গ্রাম আদালতে পাঠিয়ে দেন। সেগুলো নিষ্পত্তি করে আবার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর কাছে প্রতিবেদন পাঠাতে হয়। আমরা খুব সহজভাবে গ্রাম আদালতে বসে গ্রামের মানুষের সমস্যা সমাধান করতে পারি।’

জেলা জজ কোর্টের পিপি মো. আকবর আলী খান (এস আকবর খান) বলেন, ‘সরকারের গ্রাম আদালত গঠনের উদ্দেশ্যই হলো যাতে করে মানুষ ছোটখাটো বিষয়গুলোর সমাধান দ্রুত পায়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়ররা এই গ্রাম আদালতের প্রধান। সাধারণত ছোট খাটো ক্ষতির মামলা, চুরির মামলা বিশেষ করে যে সকল চুরিতে ৫০ হাজার টাকার কম ক্ষতি থাকে সেগুলো গ্রাম আদালতে বিচার করা হয়। আর ৫০ হাজার টাকার বেশি হলে জেলা আদালতে বিচার করা হয়। আর গরু চুরির ক্ষেত্রে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত গ্রাম আদালত বিচার করবে।

সাধারণত দেখা যায়, কোর্টে মামলা হলে সেখানে হাজিরার একটি সময় থাকে, সাক্ষী আনা নেয়ার বিষয় থাকে, আইনজীবির বিষয় থাকে। তাতে অনেক দীর্ঘ সময় চলে যায়। কিন্তু গ্রাম আদালতে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়ররা স্থানীয় মাতব্বরদের নিয়ে অল্প সময়েই সেটি মীমাংসার একটি বন্দবস্ত করে থাকেন। আর এই আদালতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দোষীদের সাজার পরিবর্তে দুই পক্ষের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দেয়, আর তাতে সমাজে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ থাকে।

সাবেক জিপি এডভোকেট আব্দুর রশিদ বলেন, ‘১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে গ্রাম আদালত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রাম আদালতের যে ভূমিকা তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটাকে আরো বেগবান করা উচিত। প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদে যদি গ্রাম আদালত ভালোভাবে কাজ করে তবে সাধারণ মানুষকে কোর্ট চত্বরে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। সামাজিকভাবেই তারা অনেক বিষয় নিষ্পত্তি করতে পারবে। এতে কোর্টের মামলা জটও কমবে।’

এ ব্যাপারে জেলার স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শরীফ নজরুল ইসলাম বলেন, জেলার ১২ উপজেলার ১১৮ ইউনিয়নেই গ্রাম আদালত রয়েছে। প্রতিমাসেই তারা এই আদালতের রিপোর্ট আমাদের কাছে জমা দেয়। আমরা বছর শেষে এগুলো মূল্যায়ন করে সরকারকে অবহিত করি। তাতে কে ভালো বিচার করছে, কে খারাপ বিচার করছে সেগুলো হিসেব করা হয়। সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদ ভবনেই গ্রাম আদালত স্থাপন করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এজলাসের জন্য ফার্নিচার সরবরাহ করা হয়। গ্রামের লোকজন গ্রাম আদালতে অভিযোগ দিলে আদালত গঠন করা হয়। এ আদালত আগে থেকে থাকে না। বাদী-বিবাদী দু’পক্ষই দুজন মোট চারজন মেম্বারের নাম বলে আর চেয়ারম্যান সভাপতিত্ব করেন। এই আদালতে কাউকে জেল ফাঁসি দেয়া হয় না, শুধু জরিমানা করা হয়। জরিমানা আদায় না করলে পরবর্তীতে কোর্টে যাওয়া যায়। আর এখানে বিচার হওয়ায় বিচারপ্রার্থীর কোর্টে মামলা লড়ার যে খরচ সেটি যেমন কমে যায়, তেমনি তেমনি আদালতের উপরও চাপ কমে যায়।



টাঙ্গাইল/সিফাত/বুলাকী

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়