ঢাকা, রবিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

জাপা চেয়ারম্যান হচ্ছেন রওশন, নির্বাহী সভাপতি কাদের!

মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১৯ ৪:৫২:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২০ ৯:৪০:১২ এএম

প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রেখে যাওয়া জাতীয় পার্টির আনুষ্ঠানিকভাবে হাল ধরছেন তারই স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ এমপি। ২৮ ডিসেম্বর কাউন্সিল হলে, সেখানে বিরোধীদলের নেতাকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেয়া হতে পারে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে স্ত্রী রওশন এরশাদও ছিলেন জাতীয় পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। লাঙল প্রতীক বরাদ্দে প্রয়াত স্বামীর সঙ্গে তার নামও জুড়ে আছে। বিএনপি সরকার আমলে এরশাদের সঙ্গে জেলও খাটেন তিনি। বিএনপির মত দলকে ছিটকে দশম ও একাদশ সংসদে জাতীয় পার্টিকে বিরোধীদল করার পেছনে তার রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা, তা না হলে জাতীয় পার্টির অবস্থা হতো বিএনপির মতো, এমনটাই মনে করেন দলটির পর্যবেক্ষক মহল।

জাতীয় পার্টির কাউন্সিলে রওশন এরশাদ দলের চেয়ারম্যান হচ্ছেন এটা অনেকটা নিশ্চিত বলে জানা গেছে। আর দেবর গোলাম মোহাম্মদ কাদের হবেন জাতীয় পার্টির নির্বাহী সভাপতি।

এমন পরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছে এরশাদের জাতীয় পার্টি। এ বিষয়টি নিয়ে দলের সিনিয়র নেতারা কাজ করছেন। দফায় দফায় বৈঠকও করেছেন তারা। এ নিয়ে দু-একদিনের মধ্যে রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক হতে পারে। দলের সিনিয়র নেতারা একসঙ্গে দুজনকে সম্মানজনক নেতৃত্বে রেখে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী জাতীয় পার্টির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

এ প্রক্রিয়ায় জড়িত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের প্রভাবশালী এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, বেগম রওশন এরশাদই দলের চেয়ারম্যান হচ্ছেন। তার নির্দেশে দল পরিচালনা করবেন জিএম কাদের। তিনি হবেন দলের নির্বাহী সভাপতি। এ বিষয়ে দলের সিনিয়র নেতারা একমত হয়েছেন।

তিনি বলেন, রওশন চেয়ারম্যান আর জিএম কাদের নির্বাহী সভাপতি হলে দলে আর কোনো গ্রুপিং থাকবে না। জাতীয় পার্টি শক্তিশালী হবে।

এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও জাপা চেয়ারম‌্যান জিএম কাদেরকে পাওয়া যায়নি। ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব‌্য দেয়া যায়নি। পরে এসএমএস করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

জানা গেছে, রওশন এরশাদই জাপা চেয়ারম্যান হচ্ছেন এ বিষয়টি ইতিমধ্যে জিএম কাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। খবর শুনে তিনি হতাশ হয়েছেন। চেয়েছিলেন, ২৮ ডিসেম্বর যেনতেন একটি কাউন্সিল করে তিনি হবেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সর্বসর্বা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়তো তা হচ্ছে না। তারপরও হাল ছেড়ে দেননি তিনি। নিজের অনুসারী নেতাদের নিয়ে নানান ছক কষছেন। যোগাযোগ করছেন সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গেও। ভাবীকে ম্যানেজ করে ২৮ ডিসেম্বর কাউন্সিলে যেকোনো মূল্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জিএম কাদের।

দলটির ঘনিষ্ঠসূত্র জানায়, জিএম কাদেরকে জাপা চেয়ারম্যান করতে উঠে পড়ে লেগেছেন এক সময়ের তার (জিএম কাদের) কট্টর বিরোধী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু, মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ও পার্টির প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, সুনীল শুভরায়, সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, দক্ষিণের সেক্রেটারি জহিরুল আলম রুবেল, প্রেসিডিয়াম সদস্য রেজাউল ইসলাম ভুইয়া, আলমগীর সিকদার লোটন, রংপুরের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, যুগ্ম মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয়, মনিরুল ইসলাম মিলন, জিয়া উদ্দিন বাবলুর শ‌্যালক এমপি আদেলসহ দলের পদোন্নতিপ্রাপ্ত একটি অংশ। রওশনের সঙ্গে জিএম কাদেরের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে তাদের কেউ কেউ ইতিপূর্বে বিরোধী নেতার বিরুদ্ধে বনানী অফিসে প্রকাশ্য শ্লোগান দিয়েছেন। কেউ কেউ রওশনের নেতৃত্ব নিযে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন, আবার কেউ কেউ বিরোধী নেতাকে ইঙ্গিত করে ফেসবুকে কুরুচিপূর্ণ অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগ আছে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার পর জিএম কাদের এরশাদের অবর্তমানে দলের নেতৃত্ব পাকাপোক্ত করতে এরশাদের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে দলের বেশ কিছু নেতাকে ইচ্ছামত পদোন্নতি দিয়ে নিজের গ্রুপ ভারি করেন। তাদেরকে দিয়ে এরশাদকে অসুস্থ অবস্থায় জিম্মি করে নিজের নামে চেয়ারম্যান পদে সাংগঠনিক আদেশ করান বলেও অভিযোগ আছে। তারপর তাদের নিয়েই নিজের গ্রুপ সৃষ্টি করে প্রথমে চেষ্টা করেন বিরোধীদলের নেতা হতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের একটি অংশের বিরোধিতার মুখে সরকারের হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হন জিএম কাদের। একপর্যায়ে ভাবী রওশনকেই বিরোধী নেতা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন। বিনিময়ে তার কপালে জুটে বিরোধীদলের উপনেতার পদ। তারপর থেকেই তিনি অনুসারীদের নিয়ে দলের চেয়ারম্যান হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বরং সময় সুযোগে তিনি তার অনুসারী নেতাদেরকে রওশন এরশাদের বিরুদ্ধে দাড় করান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রওশনপন্থী জাতীয় পার্টির একটি অংশের অভিযোগ, সাবেক রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর পর থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন জিএম কাদের। কিন্তু দলের সিনিয়র নেতাদের এখনো এক করতে পারেননি তিনি। দলের একটি অংশ তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে মানতেও নারাজ। বরং একক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জাপার বেহাল অবস্থা। তিনি নিজেই এখন দিশেহারা। তাই জাতীয় পার্টিকে টিকিয়ে রাখতে হলে রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান করার বিকল্প নেই। তাহলে জাতীয় পার্টি হবে রওশন এরশাদের নির্দেশে জিএম কাদেরের নেতৃত্বে একটি ব্যালেন্স দল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, জাতীয় পার্টির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবক দরকার। আর তিনি হলেন বেগম রওশন এরশাদ। তার কথা সবাই শুনবেন, মানবেন। সরকারের কাছেও তিনি আস্থাভাজন। তাই সবকিছু বিবেচনা করে তাকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চান নেতাকর্মীরা।

জানা গেছে, দশম নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন বর্জন করলে তার স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেয়। জাতীয় পার্টির সহযোগিতায় সরকার গঠন করে বর্তমান আওয়ামী লীগ। রওশন এরশাদের এই অবদান এখনো স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অন্যদিকে বড় ভাই এরশাদের পথ অনুসরণ করে জিএম কাদেরও দশম নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। সে সময় মহাজোটের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর ছিলেন তিনি। যে কারণে তিনি এমপি হতে পারেননি। একাদশ নির্বাচনের সময়ও বিএনপি এবং এক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বিষয়টি চাওর আছে।

রওশনপন্থী জাপার এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘জিএম কাদের এককভাবে জাপার চেয়ারম্যান হলে যেকোনো সময় স্বৈরাচারি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে মুহূর্তেই পল্টি মারতে পারেন তিনি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জিএম কাদেরপন্থী দলের এক জ্যেষ্ঠনেতা জানান, জিএম কাদের ক্লীন ইমেজের লোক। ভাল মানুষ হিসেবে সারা দেশে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কাউন্সিলকে ঘিরে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। যাতে তিনি চেয়ারম্যান হতে না পারেন।

তিনি বলেন, রওশন এরশাদের নির্দেশেই জিএম কাদের দল পরিচালনা করছেন। তাকে মায়ের মতই জানেন এবং শ্রদ্ধা করেন তিনি। দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু নেতা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। নিজেরা ফায়দা লুটতে বিরোধীনেতাকে সামনে রেখে দলের মধ্যে বিভাজন করার চেষ্টা করছেন।


ঢাকা/নঈমু্দ্দীন/সাইফ