ঢাকা, রবিবার, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৭ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

জ-য়ে জয়নুল

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৯ ১১:০৬:৪১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২৯ ১১:০৬:৪১ এএম
শিল্পাচার্যকে স্মরণ করে গুগলের ডুডল

জ- য়ে জয়নুল। বলার অপেক্ষা রাখেনা, তিনিই এ দেশে চারু ও কারুশিল্পের জনক। কারণ, তার শ্রম ও ত্যাগে এ দেশে চারু ও কারু শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে। আর এ জন্যই তিনি শিল্পাচার্য।

বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে প্রথমে যার নাম বলতে হয় তিনি জয়নুল আবেদিন। তার ১০৫তম জন্মবার্ষিকী আজ। নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর শিল্পাচার্যের জন্ম। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে তিনি পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ।

জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত শিল্পকর্ম অনেক। ১৯৭৪ সালে তার আঁকা ‘মনপুরা-৭০’দুর্ভিক্ষের চিত্রটি আজো আলোচিত। ধারণা করা হয় তার চিত্রকর্মের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে তার ৮০৭টি শিল্পকর্ম সংগৃহীত আছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সংগ্রহে সংরক্ষিত আছে আরো প্রায় ৫০০ চিত্রকর্ম। ময়মনসিংহের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে ৬২টি চিত্রকর্ম। আর তার পরিবারের কাছে এখনো চার শতাধিক চিত্রকর্ম সংরক্ষিত। এ ছাড়া পাকিস্তানের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় তার বিপুল পরিমাণ চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে বলে ধারণা করা হয়।

তার জীবনের শুরুটাও গল্পের মতো। খুব ছোট থেকেই তিনি ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। তিনি পাখির বাসা, পাখি, মাছ, গরু-ছাগল, ফুল-ফলসহ আরও কত কি এঁকে মা-বাবাকে দেখাতেন।

ষোল বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিলেন শুধু গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখার জন্য। আর্টস স্কুল দেখে আসার পর সাধারণ পড়াশোনায় জয়নুলের মন বসছিল না। তখনই মাধ্যমিক (ম্যাট্রিক) পরীক্ষার আগে, স্কুলের পড়ালেখা বাদ দিয়ে কলকাতায় চলে যান। অবশ্য মা জয়নাবুন্নেছার কিছুটা সমর্থন ছিল ছেলের প্রতি। ছেলের আগ্রহ দেখে নিজের গলার হার বিক্রি করে ছেলেকে কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে সাহায্য করেন মা।

কারণ বাবা তমিজউদ্দিন আহমেদ পুলিশের অল্প বেতনের কর্মচারী। কলকাতায় পড়ানোর মতো অর্থও ছিল না। তারপরও প্রাথমিক স্কুলজীবনের শেষ পর্বে ১৯৩৩ সালে এক অনমনীয় জেদ নিয়ে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন।

১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাখ করেন। ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায়ই চমৎকার নিসর্গচিত্র অঙ্কনে পারদর্শিতা অর্জন করেন তিনি। এই দক্ষতা ও স্বতন্ত্র চিত্রভাষা সৃষ্টিতে সাহায্য করে তাকে।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় জয়নুল তখন যুবক। দারিদ্র্যের এই লাঞ্ছনা তাকে প্রবলভাবে বিচলিত করেছিল। দরিদ্রপীড়িত মানুষদের নিয়ে তিনি ছবি আঁকলেন এবং সেগুলো প্রকাশিত হলো সংবাদপত্রে। যা তখন ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। এরপর ওই আলোড়ন থেকেই লঙ্গরখানা খোলা হয়। যে লঙ্গরখানা লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। আর দুর্ভিক্ষের এই চিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে খ্যাতিমান শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন জয়নুল।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে একটি শিল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভূত হয়। জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালে পুরান ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলের একটি জীর্ণ বাড়িতে মাত্র ১৮ জন ছাত্র নিয়ে গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু হয়। জয়নুল আবেদিন ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম শিক্ষক। ১৯৫১ সালে এটি সেগুনবাগিচার একটি বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৬ সালে গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট শাহবাগে স্থানান্তর করার পর ১৯৬৩ সালে এটি একটি প্রথম শ্রেণির সরকারি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তখন এর নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় নামে এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় নামে।

জয়নুল আবেদিন ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর এই সরকারি কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়।

এ ছাড়া জয়নুল আবেদীন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোকশিল্প জাদুঘর ও ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন।



ঢাকা/টিপু