ঢাকা, সোমবার, ৫ কার্তিক ১৪২৬, ২১ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

টেস্ট বোলিংয়ে সেই অনভ্যস্ততার ছায়া

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-০৫ ৬:৫৭:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-০৫ ৮:০৩:৩৩ পিএম

চট্টগ্রাম থেকে ইয়াসিন হাসান : পড়ন্ত বিকেলে সাগর পাড়ের স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসগুলো পশ্চিমের ডুবন্ত সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। মনে হচ্ছিল, সোনা ফলা কোনো বিস্তৃত ধানক্ষেত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। সেই উজ্জ্বল আলোয় আরো ঔজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছিলেন ধবধবে শ্বেতবর্ণের দুই আফগান ব্যাটসম্যান। তাদের ‘সর্বনাশা’ ব্যাটিংয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ সাকিব, মুশফিকদের!

আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানরা ভোগাবে, তা অনুমিতই ছিল। কিন্তু এতটা দৃঢ়তা দেখাবে, তা কল্পনা করতে পেরেছিল কি বাংলাদেশ? কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যে বিশাল ফারাক। তাইতো চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিন শেষে সফরকারীদের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ২৭১ রান। রহমত শাহর ১০২ রানের অনবদ্য ইনিংস আর আসগর আফগানের অপরাজিত ৮৮ রানে বড় সংগ্রহের পথে আফগানিস্তান।

আফগানিস্তানের প্রাক্তন টেস্ট অধিনায়কের সঙ্গে উইকেটে টিকে আছেন আফসার জাজাই। দুজনের ষষ্ঠ উইকেটে অবিচ্ছিন্ন ৭৪ রানের জুটি সাকিবদের মাথা ব্যথার বড় কারণ। বন্দরনগরীতে প্রথম দিনের খেলা শেষে একটা বিষয় স্পষ্ট, টেস্ট বোলিংয়ে অনভ্যস্ততা বাংলাদেশের সাফল্যের সবচেয়ে বড় বাধা।

মাঠে নামার আগেই সাকিব ধারণা দিয়েছিলেন অলআউট স্পিন অ্যাটাকে যাবেন। সাকিব নিজের পরিকল্পনাতেই রইলেন। কোনো বিশেষজ্ঞ পেসার ছাড়া নামলেন আফগানিস্তানকে আতিথেয়তা দিতে। বাংলাদেশের কোনো পেসার ছাড়া বোলিং আক্রমণ সাজানোর দ্বিতীয় ঘটনা এটি। নিজেদের সবশেষ টেস্টে ঢাকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চমকে দিয়েছিল দল। সেই বোলিং আক্রমণ নিয়ে এবার চট্টগ্রামে দল সাজান সাকিব। তার সঙ্গে তাইজুল, মিরাজ, নাঈম।

কিন্তু আফগানিস্তান শিবিরে স্পিনাররা ভয় ধরাতে পারেন খুব সামান্যই। নতুন বলে শুরুতে তেমন টার্ন পাননি বোলাররা। বল খানিকটা পুরোনো হওয়ার পর সমীহ আদায় করতে সক্ষম হন তারা। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত বোলিং, আক্রমণাত্মক ফিল্ডিংয়ের অভাবে রান আসে সহজেই। টেস্ট ক্রিকেটে বোলিংয়ে সাফল্য পেতে হলে বোলারদের হতে হয় ধারাবাহিক। ব্যাটসম্যানদের শক্তির জায়গায় আঘাত করে পেতে হয় সাফল্য। চার মূল স্পিনার প্রথম সেশনে যা করতে পারেন অল্প। দ্বিতীয় সেশন ছিল একেবারেই নির্বিষ, নিষ্প্রভ। আর শেষ সেশনে ভালো শুরুর পর তালগোল পাকিয়ে দিন শেষ বাংলাদেশের।

দীর্ঘ বিরতির পর টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নামলে যে অভাব অনুভব হয়, তা বোলারদের বোলিং দেখে বোঝা যাচ্ছিল বেশ। সাফল্য পেতে মোসাদ্দেক, মুমিনুল, মাহমুদউল্লাহ ও সৌম্যকেও ব্যবহার করেছেন সাকিব। সেখানে মাহমুদউল্লাহই একমাত্র সফল। এক পাশে তাইজুল, আরেকপাশে সাকিব। সাকিব এক ওভার পর নিজেকে সরিয়ে নেন। বোলিংয়ে আসেন মিরাজ। বোলিং করেন ৪ ওভার।

১২ ওভারে বাংলাদেশের আক্রমণে চার স্পিনার। ধারাবাহিক বোলিং করে যাওয়া তাইজুলের হাত ধরে আসে প্রথম সাফল্য। বাঁহাতি স্পিনারের বলটা পড়েছিল লেগ ও মিডল স্টাম্পে, এরপর ব্যাট-প্যাড ফাঁকি দিয়ে আঘাত করে ইহসানউল্লাহ জানাতের অফ স্টাম্পে। তার উইকেট নিয়ে বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে দ্রুততম একশ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও গড়েন তাইজুল। সাকিব ২৮ টেস্টে পেয়েছিলেন একশ উইকেট। তাইজুল পেলেন ২৫তম টেস্টেই। 

তার হাত ধরে আসে দ্বিতীয় সাফল্য। আরেক ওপেনার ইব্রাহিম জাদরান তুলে মারতে গিয়ে মাহমুদউল্লাহর হাতে ক্যাচ দেন লং অফে। ক্রিজে এসেই রহমত শাহ নিজের কারিশমা দেখান। শুরুতে কয়েকটা শট খেলে নিজের ওপর চাপ কমান। এরপর জমাট ব্যাটিংয়ে বুঝিয়ে দেন বড় কিছু পেতেই এসেছেন তিনি। কী দারুণ ধৈর্য। কী দারুণ দৃঢ়তা।  সাদা পোশাকে ২২ গজে যেভাবে ব্যাটিং করা দরকার, ঠিক সেভাবেই যেন নিজেকে মেলে ধরলেন। কপি বুক স্টাইলের সব শট। ডিফেন্সে পুরোদস্তুর অভিজ্ঞতার ছাপ।  মনে হলো মকমলের চাদরের ওপর আরাম-আয়াশে আছেন।

মধ্যাহ্ন বিরতির আগে পঞ্চম স্পিনার হিসেবে মাহমুদউল্লাহকে আক্রমণে আনেন সাকিব। প্রথম ওভারে মাহমুদউল্লাহ ফেরান হাশমতউল্লাহকে। এক ধীরগতির বলে ব্যাট লাগিয়ে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ক্যাচ দেন স্লিপে। বিরতির পর রহমত শাহর সঙ্গে ব্যাটিংয়ে আসগর আফগান। শুরু হয় দুই ডানহাতি ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং সৌরভ ছড়ানো। ওই এক সেশনে বাংলাদেশ কোনো উইকেটই পায়নি, উল্টো রান খরচ করেছে ৩.২৩ করে। ৩৫.২ ওভারে ১১৪ রান তোলেন দুই আফগান।  ৯৭ রানে অপরাজিত থেকে বিরতিতে গিয়েছিলেন রহমত। ফিরে এসে দ্বিতীয় ওভারে তুলে নেন সেঞ্চুরি।

প্রথম আফগান ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিকেটের অভিজাত ফরম্যাটে তুলে নেন সেঞ্চুরি। সেঞ্চুরির আগ পর্যন্ত বাংলাদেশকে আউট করার কোনো সুযোগই দেননি।  যে বল যেভাবে খেলা দরকার, সেভাবেই খেললেন। কালেভাদ্রে মেরেছেন বাউন্ডারি। শট খেলতে কোনো জড়তা রাখেননি। সিঙ্গেল-ডাবল তুলে নিয়েছেন অনায়াসে। ৮৫ বলে ফিফটি, ১৮৬ বলে পেয়েছেন সেঞ্চুরি। ফিফটিতে পৌঁছতে মেরেছিলেন তিনটি চার, দুটি ছক্কা। আর সেঞ্চুরির ইনিংসে ছিল সব মিলে ১০টি চার, দুই ছক্কা। মাইলফলকে পৌঁছার পরের বলেই স্লিপে ক্যাচ দেন নাঈম হাসানের বলে। ততক্ষণে নিজের কাজটা ভালোভাবেই করে যান রহমত।  ভাঙে রহমত-আসগরের ১২০ রানের জুটি।

তিন বলের ব্যবধানে নাঈমের দ্বিতীয় শিকার মোহাম্মদ নবী। খানিকটা নিচু হওয়া বলে ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে বোল্ড হন শূন্য রানে। ওখানেই শেষ বাংলাদেশের বোলিং দৃঢ়তা। পুরো সেশনের বাকিটা সময় আসগর-আফসার ব্যাটিং করেছেন স্বাচ্ছন্দ্যে।  হাতে ৫ উইকেট রেখে আফগনরা যেখানে মাঠ ছাড়ে হাসিমুখে, সেখানে সাকিবদের চোখেমুখে ছিল বিষন্নতা। বোঝাই যাচ্ছিল আফগান ব্যাটসম্যানদের এমন ব্যাটিং প্রত্যাশিত ছিল না মোটেই।  তারা এখন কোথায় গিয়ে থামে সেটাই দেখার। তবে যে মেজাজে, যে রুটিনে আজ বোলাররা আক্রমণ করেছিল, তাতে ফুটে উঠেছিল সেই পুরোনো অনভ্যস্ততা।

সামনেই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। এর আগে বোলিং নিয়ে ভাবতেই হবে টিম ম্যানেজমেন্টকে। টেস্ট ম্যাচ জিততে হলে দ্রুত সময়ে ২০ উইকেট পেতেই যে হবে।


রাইজিংবিডি/চট্টগ্রাম/৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯/ইয়াসিন/পরাগ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন