ঢাকা, শুক্রবার, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৫ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

দাবদাহ || রুমা মোদক

রুমা মোদক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৩-২৬ ১:০৭:৫২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৪-১০ ৫:৫৮:০২ পিএম

ব্যাটা আর মরবার দিন পেল না, ছুটির দিনটাই মাটি হয়ে গেল, শালার কামলারে বলে আসছিলাম মাচাঙটা ঠিক করব, ধ্যাত্‌… বিড়বিড় করতে করতে পায়জামায় পা ঢুকায় হায়দর। শালা কে যে মোবাইলটা আবিষ্কার করছিল-আপন মনে বলতে বলতে  মোবাইলটা পকেটে পুরে ঘর থেকে বের হয়ে আসে সে।

রাস্তায় রিকশা কম। স্টেডিয়ামে খেলা, জেলা পরিষদ মাঠে গান-বাজনা, এখানে সেখানে অনুষ্ঠানের কোনো সীমা সংখ্যা নেই। রিকশাঅলারা সব প্যাডেলে পা তুলে বসে দেখছে নিশ্চই, শহরে হাঁটলে এ দৃশ্য খুব চেনা। এমন দিনে রাস্তায়ও ছুটির আমেজ!

হঠাৎ মোবাইলটা বেজে ওঠায় হায়দরের কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে ওঠে। সে তীক্ষ্ম স্বরে শালা বলে ফোনটা রিসিভ করে।এনডিসি স্যারের কল। স্যার, রাস্তায় রিকশা নাই স্যার, আইসা পড়তেছি, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে...বলতে বলতে ইশারায় একটি খালি রিকশা দাঁড় করিয়ে হায়দর উঠে বসে।

অফিসটাও সুনসান, কবরস্থান যেন। ওসি স্যারের রুমে দু’চারজন বসে আছে টেবিলে গোল হয়ে। সবার সামনে চায়ের কাপ, প্লেটে এনার্জি প্লাস। আড্ডা জমেছে ভালোই। ওসি স্যার ভ্রু কুঁচকে জানতে চান- এতো দেরি হায়দর সাহেব?

সরি স্যার, বলে হায়দর দ্রুত নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় প্রয়োজনীয় পেপারস তৈরি করতে। ওসি স্যার ডাকেন পেছন থেকে- শুনুন, আজ ডিসি স্যার, এসপি স্যার যাবেন। এটি বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালায় অন্তর্ভুক্ত হবে।
প্রচণ্ড রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে হায়দরের মুখে কেবল একটাই শব্দ যোগায়- শালা! গত কয়েক বছর ধরে এ এক নতুন উৎপাত। তারা যখন তখন যেখানে সেখানে মরবে আর ঘাড়ে লেজ তুলে দৌড়াও ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’ জানাতে। স্যাররা তো বলেই খালাস, তারপর পতাকা বানাও রে, ফোর্স তৈরি কর রে, কাগজ রেডি কর রে- সব ঝামেলা শালা আমাদের ঘাড়ে!

ভাইভা বোর্ডের সামনে উৎকণ্ঠিত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিভা। গোটা পনেরো জন প্রার্থীর সবাই হেঁড়ে গলায় কথা বলছে। কেউ একজন বের হলে তাকে জেঁকে ধরছে। প্রতিভার এসব কিছুই ভালো লাগছে না। লিখিত পরীক্ষায় থার্ড পজিশনে ছিল সে। পোস্ট মাত্র দু’টি। প্রথম, দ্বিতীয় দু’জনই উপস্থিত। তবু কোটার ভিত্তিতে মনে আশাটা নিবু নিবু করেও জ্বলছে-নিভছে না। ট্রান্সপারেন্ট ফাইলে আবার সার্টিফিকেটগুলো ভালো করে দেখে প্রতিভা। এক দুই তিন চার। চারটা সার্টিফিকেট, তাছাড়া বার্থ সার্টিফিকেট, ন্যাশনালিটি সার্টিফিকেট...।

দেখি আপনার সার্টিফিকেটগুলো- বোর্ডের একজন চাইতেই চারটি সার্টিফিকেট এগিয়ে দেয় প্রতিভা সেদিকে। তিনটি সার্টিফিকেটে চোখ বুলিয়ে চতুর্থ সার্টিফিকেটটা প্রতিভার সামনে তুলে ধরেন মাঝখানে বসা ভদ্রলোক। উল্টেপাল্টে দেখেন সার্টিফিকেট আসল নাকি নকল। পাশের জন জিজ্ঞেস করেন, নাম কি?

পরমানন্দ পাল’ প্রতিভার বাবার নাম উচ্চারণ করেন মাঝের ভদ্রলোক।ও হিন্দু? তাহলে আসলই হবে- পাশের ভদ্রলোক নিশ্চিত করেন।
মাঝের ভদ্রলোক এবার কাগজটিকে দু’আঙুলে উপরে তুলে শব্দ করে জানতে চান- এটি কি আপনার যোগ্যতার সনদ?
মূলত, এই কোটার আশাটিই তার মনে একমাত্র আশার প্রদীপ। কোনো গর্ব নয়, অহংকারও নয়। লড়াই করতে করতে সবকিছু ফিকে হয়ে গেছে। সার্টিফিকেট নামক কাগজটা কেবল সযত্নে ফাইলে রাখা সুবিধাভোগের জন্য, তাও স্বেচ্ছায় নয়, বাপের ইচ্ছায়। এ নিয়ে বাপের সাথে তর্কও কম হয়নি। মেয়ে সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরি করবে এজন্য যুদ্ধ করেছিলে?

এমন প্রশ্নের উত্তরে বাপ নিরুত্তর থেকেছে। আসলে উত্তরটা সে জানে না। তখন দল বেঁধে বন্ধুরা গেছে সেও গেছে। আর এখন হা-ভাতে ঘরে এটাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার, টিকে থাকার নিবু নিবু প্রদীপে তেলের যোগান দিচ্ছে। এই কাগজটা নিয়ে এতো গবেষণা মেজাজটা খিঁচড়ে দেয়।
প্রতিভা বলে, হ্যাঁ, যোগ্যতার সার্টিফিকেট। আমার বাবা দেশের জন্য অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে, পঙ্গু হয়েছে, তার পঙ্গুত্বের কারণে আমরা আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছি। এটা অবশ্যই আমার যোগ্যতার সার্টিফিকেট।

আপনার বাবা যুদ্ধ করেছে দেশের জন্য, এটা আপনার যোগ্যতা হবে কেন? মাঝের ভদ্রলোকের প্রশ্নটির মধ্যে ক্রুদ্ধতার গন্ধ পেল প্রতিভা।
আমার বাবা যুদ্ধাপরাধী হলে নিশ্চই তা আমার যোগ্যতা হতো না? আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা বলেই এটা আমার যোগ্যতা।
প্রতিভার এমন উত্তরে ক্ষেপে ওঠেন মাঝের ভদ্রলোক। শোনেন, আপনি অপ্রাসঙ্গিকভাবে ‘যুদ্ধাপরাধী’ প্রসঙ্গ টানছেন কেন? কোথায় প্রবৃদ্ধির কথা ভাববেন, বিদেশী বিনিয়োগের কথা ভাববেন, মানবসম্পদের কথা ভাববেন, তা না যুদ্ধাপরাধী!
লোকটি বলতেই থাকে। আর এই যে সিস্টেম! বাপ কোন আমলে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, এখন তাদের ছেলেমেয়েদের চাকরি দাও। সম্মান জানতে হয়, রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে টাকা দিয়ে দাও, চাকরি কেন? এতে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে না? অযোগ্যরা সব সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে!
তাদের পারস্পরিক আলোচনা জমে ওঠে। প্রতিভার বলতে ইচ্ছে হয়, আমি অতি উত্তম তিনটি পরীক্ষা পাসের সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছি। আমি অযোগ্য নই। কিন্তু এ কথা বলার রুচি হয় না। কী লাভ বলে?

স্বাভাবিক মরা বাড়ি মনে হয় না বাড়িটিকে। যদিও তার বউ-নাতি সবাই আছে, তবু তেমন কান্নাকাটির রোল নেই। সবাই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আসলে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বিছানায় শুয়ে ছিল অথর্ব হয়ে। পায়খানা, প্রস্রাব সবই বিছানায় করেছে।  দুর্গন্ধে ঘরে ঢোকা ছিল কঠিন। হুঁশ ছিল ষোলো আনা, কেবল খাই খাই। আর এক ভাঙা রেকর্ড- ঐ যে তেলিয়াপাড়া রেললাইনটা পার হইয়াই ইন্ডিয়া, ভাবলাম যা থাকে কপালে। বন্দুকটা মাটিতে থুইয়া উইঠা খাড়াইলাম…। তার এসব কথা শোনার জন্য কেউ আর অপেক্ষা করত না। এক গল্প আর কতো দিন? যতদিন সম্ভব ছিল হুইল চেয়ারে চেপে তৈরি হয়ে বসে থাকত এ দিনটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাবার জন্য। মুদি দোকানদার ছেলে মুখ ঝামটা দিয়ে উঠত- একটা টাওয়েল গায়ে পরাইয়া দিব আর এক টুকরা কেইক। যাইবার লাইগ্যা পাগল হইয়া যাও। আমি পারতাম না।

মেয়েটা শিক্ষার গুণেই হোক কিংবা স্বভাবগুণে বাপের মুখের উপর কিছু বলতে পারত না। চুপচাপ নিয়ে যেত হুইল ঠেলেঠুলে। আর বাপ অনুষ্ঠানে গিয়েই অস্পষ্ট আড়ষ্ট ভাষায় গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে শুরু করত বক্তৃতা। যে বক্তৃতার জন্য সবাই চিনত তাকে। শেষদিকে ওষুধপথ্য মিলত না। খরচটা অভাবের সংসারে বাহুল্য মনে হতো সবার। পায়খানা করে বিছানা নষ্ট করবে ভয়ে খাবারও দিতে চাইত না কেউ।কপালটা ভালো। মরল এমন দিনে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে ‘রাষ্ট্রীয় সম্মান দান’ অনুষ্ঠানটা।

আধুনিক শবদাহ চুল্লিটা স্থাপিত হয়েছে অল্প ক’দিন। কোনো এক কানাডাপ্রবাসী তার স্বর্গীয় পিতার নামে শশ্মানের সংস্কারে লাখ খানেক টাকা দান করেছে গেল বছর। আর তাতেই বদলে গেছে পুরো শশ্মানের চেহারা। পরমানন্দ পালের তুলার মতো হালকা দেহটা চুল্লিতে তুলে একমাত্র ছেলে পুরোহিতের সামনে দাঁড়ায় মুখাগ্নি পূর্ববর্তী কৃত্যগুলো সারবার জন্য। কেউ একজন পুরো এক টিন কেরোসিন ঢেলে দেয় সাজানো কাঠগুলোর উপর। কাঠগুলো খুব পোক্ত নয়, বেশ কাঁচা। জ্বলতে অনেক সময় নেবে। কাঠের মাথায় আগুন ধরিয়ে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের সাথে সাথে প্রদক্ষিণ করে চুল্লিটা। তারপর মুখে আগুন দিয়ে শুরু হয় দাহপর্ব। দাউ দাউ জ্বলে ওঠে আগুন। এক সময় ছাই হয়ে যায় নশ্বর দেহ। গনগনে চুল্লির চারপাশে আগুনের আলো অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবাই ফিরতে থাকে। শুধু ঘুরে দাঁড়ায় একটি মেয়ে। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় চুল্লির দিকে।হাতের কাগজটা ছুড়ে দেয় চুল্লির উপর। কয়েক সেকেন্ড, তারপর ছাই হয়ে যায় কাগজটা।  দেশের জন্য বাপের চেতনা ছিল। বাপ জানুক বা না জানুক, যুদ্ধের সেই চেতনার বিনিময়ে সুবিধা নেওয়ার চিন্তা আজ থেকে সে আর নাই বা করলো!



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ মার্চ ২০১৫/তাপস রায়