ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

দেড় লাখ শিশুর কী হবে?

আবু বকর ইয়ামিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২৫ ৯:৫৭:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২৬ ৮:২৪:৪৯ এএম
ফাইল ফটো

শেষ হয়েছে প্রাথমিক ও ইবদোয়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। এবার পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো অভিযোগই ওঠেনি। প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনীতে ছয়টি বিষয়ের পরীক্ষায় বহিস্কৃত হয়েছে ১১৭ জন। এর মধ্যে প্রাথমিকে ২৬ জন এবং ইবতেদায়ীতে ৯১ জন। প্রাথমিকের গণিত ও ইংরেজি পরীক্ষায় কোনো বহিস্কার নেই।

তবে, ইবতেদায়ীতে ইংরেজী বহিস্কার হয়েছে ১১ জন, গণিতে ৫০ জন। প্রাথমিকের এ তথ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, গণিত ও ইংরেজী নিয়েই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি বেশি। এ ভীতি শুধু প্রাথমিকেই নয়, উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও এ ভীতি বিরাজ করছে দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে। কিন্তু উক্ত দু’দিনের (গণিত ও ইংরেজী) পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী নকলের অভিযোগে বহিস্কার না হওয়ার তথ্যকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে অভিযোগ করেছেন পরীক্ষা মনিটরিং করা সংস্থা বা ব্যক্তিরা।

তারা বলেন, এটি কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এর মধ্যে কোনো ধরনের শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে।

এবারের প্রাথমিকে পরীক্ষায় বহিস্কার হয়েছে, ২৬ জন। এরা সবাই ভূঁয়া পরীক্ষার্থী বলে জানা গেছে এবং নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকেও জানানো হয়েছে। তারা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল না। তাদের প্রায় সবাই এবারের জেএসসি’তে অংশ নিয়েছিল। তারা অন্যের নামে পরীক্ষা দিতে এসেছিল। তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, তারা কম বয়সী। তারা স্ব-প্রণোদিত হয়ে পরীক্ষা দিতে আসেনি। তাদের পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য করেছে কিছু অসাধু শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) মহাপরিচালক এ এফ এম মনজুর কাদির বলেন, বেসরকারি সাহায্য সংস্থা পরিচালিত স্কুলের শিক্ষার্থী এরা। এদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেয়া হবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে।

সমাপনী শুরুর বছর থেকেই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযাগ উঠেছে। এর জন্য তদন্ত কমিটিও করতে হয়েছে। কিন্তু তাও ঠেকানো যায়নি।

এবার (২০১৮ সালের সমাপনীতে) প্রশ্ন ফাঁস হয়নি বলে এক প্রকার বাহবাই নিচ্ছে মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। প্রশ্ন ফাঁস না হওয়ার কারণ হচ্ছে, সমাপনী পরীক্ষায় বহু নির্বাচনি প্রশ্ন (এমসিকিউ) বাদ দেয়া হয়েছে গত বছর থেকে। প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকে মূলতঃ এমসিকিউ’র জন্য। গত বছর থেকে এমসিকিউ বাদ দেয়ায় পরীক্ষার্থীদের বৃত্ত ভরাট বা টিক চিহ্ন দেয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু ছয়টি বিষয়ের প্রতিটিতে ১০০ নম্বর করে মোট ৬০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। ফলে ছোট্টমনিদের লেখার চাপ বেড়েছে।

পরীক্ষার শেষ দিনে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ীতে অনুপস্থিত ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৪ জন পরীক্ষার্থী। এরা সবাই সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছিল।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে যে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে তাতে দেখা যায়, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনীতে মোট পরীক্ষার্থী ছিল বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রবেশপত্র সংগ্রহ করে ২৯ লাখ ৮ হাজার ১৮৭ জন ক্ষুদে শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রাথমিকে ২৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯২ জন এবং ইবতেদায়ীতে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫ জন পরীক্ষা।

গত ১৭ থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলা সমাপনী পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল প্রাথমিকে ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫২ জন। ইবতেদায়ীতে উপস্থিত ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪জন। প্রাথমিকে অনুপস্থিত ছিল বা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি ১ লাখ ৬৪৩ জন। আর ইবতেদায়ীতে অনুপস্থিত ছিল ৪৮ হাজার ২৬১জন। দু’ধারায় মোট অনুপস্থিত হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৪ জন।

এ সংখ্যাটিই ঝরে পড়েছে বলে মনে করছেন প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্তরা। প্রাথমিক স্তরেই প্রায় উক্ত দেড় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়াকে আশঙ্কাজনক ও হতাশার বলে মন্তব্য করেছেন তারা।

পরীক্ষায় এরা কেন অংশ গ্রহণ থেকে বিরত রইল তার কোনো ব্যাখ্যা বা জবাব নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই)।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার পরীক্ষার আগ মুহূর্তে দেশব্যাপী ঘূর্ণি ঝড় বুলবুল-এর প্রভাবে দেশে তিন বিভাগের ১৭ জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বহু মানুষ আশ্রয়হীন হয়েছিল। এ প্রাকৃতিক বিপর্যয় কারণে শিক্ষার্থী কমেছে। এ কারণে সমাপনী পরীক্ষা ও জুনিয়র স্কুল ও জুনিয়র দাখিল পরীক্ষাই (জেএসসি/জেডিসি) হুমকীর মুখে ছিল।

মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দারিদ্রতাই মূল কারণ বলে মনে করা হয়। কিন্তু সরকারের এত উদ্যোগের পরও এত বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি বা ঝরে পড়ে। যাই বলি না কেন, এটা হতাশাজনক।

শতভাগ ভর্তিও এখন প্রায় নিশ্চিত হয়েছে। তবে, এবারের পরীক্ষায় প্রাথমিকে পরীক্ষার্থী কমেছে এবং ইবতেদায়ীতে পরীক্ষার্থী বেড়েছে। এটিকে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেছেন, ‘দেশে জন্ম হার কমেছে। তাই প্রাথমিকে ভর্তি কম হয়েছে।’ ‘ইবতেদায়ীতে কেন বাড়ল?’ তার উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মাদ্রাসা পর্যায়ে এখনো জন্ম হার রোধ করা যায়নি।’

এবার প্রাথমিকে পরীক্ষার্থী বিগত বছরের চাইতে ২ লাখ ২৩ হাজার ৬১৫ জন কম। ইবতেদায়ীতে গত বছরের তুলনায় ৩০ হাজার ৯৮৩ জন ছাত্র-ছাত্রী বেড়েছে। প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা, ২০১৯-এ ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৬৬ হাজার ৮৭৪ জন বেশি। এটিই আশাব্যঞ্জক তথ্য।

প্রাথমিকে ছাত্রী বাড়ার কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে ছাত্রী সংখ্যা বাড়ছে। এটা আশাব্যঞ্জক।

পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ সম্পর্কে ডিপিই’র মহাপরিচালক এ এফ এম মনজুর কাদির বলেন, ‘কিছু বেসরকারি স্কুল এবং এনজিও’র কারণে এমনটি ঘটছে। এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এনজিওকে চিহ্নিত করতে এ বছর ব্যবস্থা নেয়া হবে। মাঠ পর্যায়ে তথ্য নেয়ার পর প্রকৃত অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করা হবে এবং স্কুলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।’ তিনি এসব শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়েছে মানতে নারাজ।

দেশে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কর্মরত এনজিওগুলোর মোর্চা গণ-স্বাক্ষরতার প্রধান নির্বাহী রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘সমাপনী পরীক্ষা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এতদিন যতটা উৎসব ও আনন্দময় ছিল, এখন এটি ফিকে হয়ে গেছে। কারণ, সমাপনী পরীক্ষা এখন তাদের মধ্যে বোঝা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সমাপনীকে ঘিরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার- নোট গাইড এবং এক শ্রেণির শিক্ষকের মধ্যে ভয়ানক বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। এগুলোকে সামাল দেয়া রাজধানীর অভিভাবক ও উচ্চ বিত্তের জন্য সম্ভব হলেও, নিন্মবিত্ত ও গ্রামীণ জনগোষ্টির জন্য এটি এখন বোঝা। একারণেই চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীকে পৌঁছানোর পর অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে পারছেন না। এর ফলে ঝরে পড়ছে বেশি।’

এটি শুধু এ বিশেষজ্ঞের মত নয়, এটি এখন গণ দাবিতে পরিণত হয়েছে। সমাপনী পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। সমাপনী হলে জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষা কেন? আর জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষা চালু থাকলে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা কেন? এর যে কোনো একটি পরীক্ষা চালু থাকতে পাবে। এ মত প্রায় সকল অভিভাবকের এবং শিক্ষাবিদদেরও।

তারা বলছেন, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পাবলিক পরীক্ষা রাখা উচিত নয়। কোমলমতি শিশুদের আনন্দ পাঠ বা খেলাধূলার মাধ্যমে শেখানো উচিত। জোর করে খুঁদে শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়ে ভালো কিছু আশা করা উচিত নয়।


ঢাকা/ইয়ামিন/সনি

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও