ঢাকা, শুক্রবার, ৮ ভাদ্র ১৪২৬, ২৩ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

নির্মাণ কাজ চলিতেছে || রাশেদ শাওন

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৭-১০ ৫:৩৩:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:০৫ এএম
Walton E-plaza

বুকের ঠিক মাঝখানে ধক্‌ করে উঠল। মাথার ভিতরে কেমন দপ দপ করছে! তবে তার চেয়ে বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে চোখে। খচ খচ করছে। কিছুক্ষণ পর লোনা পানি ভরে উঠল চোখের কোটর। তাতে সামান্য স্বস্তি পেল সাজিদ। এ যন্ত্রণাটা শরীরে। বুকে যে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে তার, সেটা মানসিক। আসলে শরীরে ব্যথা হলে তা উপশম হয় একটা সময়। মনের যে অসুখ তার ওষুধ জানে কয় জনে! অথচ সাজিদ এখন মনের অসুখে আক্রান্ত। তার মনটা বেজায় খারাপ।

চারপাশে সবকিছুই বদলে গেছে। মাঝে মাত্র ছয়টা বছর। এর মধ্যে এতো কিছু হয়ে গেছে! রিকশা ভাড়া বেড়ে হয়েছে দিগুণ। রাস্তা ভরা গাড়ি। গাড়িতে উপচে পড়া মানুষ। নগরীর তাপমাত্রাও কি বেড়েছি কিছুটা! এতো এতো পরিবর্তন তবু তাতে অবাক হয়নি সাজিদ। সেও তো বদলে গেছে অনেক। চেহার-সুরত থেকে শুরু করে স্বভাবেও বদল এসেছে। কিন্তু যারা তাকে চেনে, জানে তারা ঠিকই বলে দিতে পারে সাজিদ তো তারই মতোন। ঘোর লাগে না কারও। আজ তার এ বিষ্ময়ের কারণ চারপাশ। এতটা বদলে যেতে পারে চেনা রাস্তাটা, দুপাশের ইমারত! এর আগে টানা দশ বছর ধরে সে যা দেখে এসেছে, মানস পটে যে ছবি আঁকা, এখন তা স্মৃতি।

জনকণ্ঠ ভবনটা ছিল। তার পর যে নতুন বহুতল ভবনগুলো চোখে পরছে সেগুলোও বেমানান নয়। আটো পারর্টসের দোকানগুলো দেখে কোনো পরিবর্তন চোখে পরে না। কিছু দোকানে নাম বদলে গেছে, সাজসজ্জাতেও নতুনত্ব। তা হতেই পারে। তবে রাস্তার মাঝখান দিয়ে ছয়-সাত তলা সমান সমান যে মোটা মোটা পিলার দেখা যাচ্ছে সেগুলো বদলে ফেলেছে এই এলাকার চেহারা। আকাশের দিকে উঠে যাওয়া পিলারগুলোকে বেমানান ঠেকছে সাজিদের কাছে। উড়ে এসে জুড়ে বসা অযাচিতের মতো এ কাঠামোগুলোকে সহ্য করতে পারছে না সে।

চওড়া রাস্তার বুকের ঠিক মাঝখান দিয়ে উঠে গেছে পিলারগুলো। এতেই কমে গেছে রাস্তার অংশ। সরু হয়ে গেছে রাস্তার দুই পাশ। চিকন রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে রিকশা, সিএনজি, গাড়ি, মটরসাইকেল সবাই জট পাঁকিয়ে ফেলছে। সেই জটে রিকশার সংখ্যাই বেশি। অসংখ্য রিকশার মধ্যে সাজিদও একটিতে বসে আছে। অবহাওয়াটা মন্দ নয়। মাঝে মাঝেই ঠান্ডা বাতাস বইছে। বিকালে এমন অবহাওয়া বেশ উপভোগ্য। তবে সাজিদ ঘামছে। তার চেয়ে বেশি অস্থতি হচ্ছে ধোয়ার মতো ধুলা উড়ছে। মনে হচ্ছে চারপাশের উড়তে থাকা ধুলাগুলোর পাখা গজিয়েছে আজ। এখানে বাতাস-আলো সবই যেনো ধুলার দখলে। সেই দখলদার ধুলা কণার দাপটে চোখ মেলা দায়। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। এটা শরীরের কষ্ট। তার মনে আঁকা যে ছবি তার সঙ্গে চারপাশ মেলাতে পারছে না বলেই তার মাথা ঘুরছে। বমি বমি লাগছে। বুকেও ধুকপুক করছে। এক ধরণের নার্ভাসনেস ভর করেছে। মানসিকভাবে খানিকটা দুর্বল সে আগ থেকেই। হাইপার টেনশন হয় তার যখন তখন।

একটা শহরে অবকাঠামোতে পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। সেটা দেখে কেন যে এমন আপসেট সাজিদ সেটা বুঝতে পারছে না সে। তাহলে সেকি ভয় পাচ্ছে! নিজের মধ্যেই অনেক যুদ্ধ চলছে তার। হয়তো এভাবেই বদলে যায় সবকিছু। পুরনো সম্পর্কগুলো এক সময় মলিন হয়ে যায়। নতুনের কাছে হার মেনে নেয় সমকাল।

জট পেরিয়ে এগিয়ে চলে সাজিদকে বহনকারী রিকশা। বামে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয় পার করে আরো খানিকটা এগিয়ে যায় সে। মনে মনে কিছুটা উচ্ছ্বাস জাগে তার। ‘আরে ওইতো ইস্পাহানী স্কুল।’ তার পরে আরো একটি পুরানো ব্লিডিং। এর পর রেস্টুরেন্ট থ্রি স্টার। এই সেই রেস্টুরেন্ট! মনে মনে হাসে। আর স্মৃতি থেকে কিছু টুকরো স্মৃতি তার মনোজগত আচ্ছন্ন করে নেয়। ইস্পাহানী স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণী পড়ত রুহী। থ্রি স্টারের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ই একদিন সাজিদকে পিছন থেকে ডেকেছিল সে। প্রথম ডাক কানে আসলেও তাকে পাত্তা দেয়নি সাজিদ। ভুল শুনছে ভেবে এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার হাঁটা শুরু করেছিল। এর পর কেউ একজন পিছন থেকে তার ব্যাগ টেনে ধরে।

‘এই যে আপনাকে ডাকছি তো। শুনতে পান না।’

অচেনা মেয়েটির দিকে ঘুরে তাকাতেই প্রচন্ড ঘাবড়ে গিয়েছিল সে। তবে মেয়েটি তাকে আরো বেশি অবাক করে দিয়ে বলেছিল, ‘আমি চিনি আপনাকে। আপনি যে মেসে থাকেন তার ঠিক উল্টো পাশের ছয়তলা বাড়িটা আমাদের। আমার ঘর থেকে আপনাকে দেখি রোজ।’
মেয়েটির কথা শেষ হওয়ার আগেই তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো সাজিদ দৌড়ে পালিয়ে ছিল সেদিন। এক দৌড়ে মগবাজার ওভারব্রিজে উঠে গিয়েছিল। সেই ওভারব্রিজটা কই?

নতুন যে কেউ এ এলাকায় আসলে ঠিকই বুঝে যেত সে মগবাজারে পৌছে গেছে। কি অদ্ভুত ছিল ওভারব্রিজটা। রাস্তার ঠিক মাঝখানে গোল পিলারটি তিন হাতওয়ালা ব্রিজটাকে দাড় করিয়ে রেখেছি।

রুহীকে প্রথম দিন ভয় পেলেও পরে অবশ্য দুজনের প্রেম হয়। সাজিদ সেদিন যতই মেয়েটিকে ভয় পাক সেও তো আড়াল থেকে মেয়েটিকে দেখত। সেদিনও ঠিকই চিনেছিল রুহীকে। এর পর সে তার মেসের বুয়ার কাছ থেকে জানতে পারে মেয়েটির নাম রুহী। তিন বোনের মধ্যে সে ছিল বড়। ফুটফুটে মেয়েটি গান গাইত। প্রতি শুক্রবারে গানের ওস্তাদের কাছে গান শিখত সে। আর অন্য দিন গলা সাধতো নিজে নিজে। গলা সাধার সময় মেয়েটি হারমনিয়াম বাজাত। আর নিজের আনন্দে যখন গান করত তখন খালি গলায় গাইত সে। তখন জানালায় টাঙানো পর্দার আড়াল থেকে ব্যালকুনিতে দাড়ানো মেয়েটিকে দেখতো সাজিদ। এর পর যখন তাদের সম্পর্ক হল তখন তারা বাইরেই দেখা করত বেশি।

বিশেষ করে মগবাজারের ওভারব্রিজের উপরে বহুদিন তারা একসঙ্গে দাড়িয়ে থেকেছে। তারা দুজনে মিলে রিকশা, বাস, মটরসাইকেলের আসাযাওয়া দেখতো। মাঝে মাঝে ‍কিছুই দেখতো না। শুধু তাকিয়ে থাকতো রাস্তার দিকে। সেই ওভারব্রিজটি এখন আর নেই। ঠিক যেখানে গোল পিলারটি দাড়িয়ে ছিল সেখানে আজ একজন আনসার দাড়িয়ে তাড়াহুড়ো করতে থাকা যানবাহনগুলোকে নিয়ন্ত্রেণের বৃথা চেষ্টা করছে। যে রিকশায় সাজিদ বসা ছিল সেই রিকশাওয়ালাও সিগন্যাল না মেনে হুড়মুড় করে এগিয়ে গেল। রমনা থানার দিক থেকে এগিয়ে আসা একটি সিএনজিও ঠিক তখনই মাথা বের করে দিল তেজগাঁওয়ের দিকে যাওয়ার জন্য। সাজিদ শুনেছে ওই রাস্তার দিকে যেতে যে ঝিল ছিল সেটা এখন বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যদিও ঝিলের বুকে এখন ছবির মতো বেশকিছু রাস্তা। এখন তো অনেক সিনেমাতেই বা নাটকে এই হাতিরঝিল দেখা যায়। তবে সেদিকে নয় সাজিদ যাবে মালিবাগ।

মার্স্টাস পরীক্ষা শেষ করেই সাজিদ বিসিএস পরীক্ষায় বসে। আর বরাবরই ভালো ছাত্রের তকমা লাগা সাজিদ প্রথম বারেই ম্যাজিস্টেট হিসেবে নিয়োগ পায়। তার পোস্টিং হয় হোম ডিস্ট্রিক দিনাজপুরে। এর পর কেটে গেছে ছয় বছর। ট্রেনিং, মিটিং-এ অংশ নিতে বার কয়েক ঢাকায় আসতে হলেও এই এলাকায় আসা হয়নি গত ছয় বছরে। অথচ টানা আট বছর মালিবাগ থেকে বাংলামটর তার যাতায়ত ছিল প্রতিদিনই। বিশেষ করে যখন থেকে রুহীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠল সেদিনের পর থেকে রুহীর ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিল সে। তবে চারকরির সূত্রে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে দুরুত্ব তৈরি হয়। দিনে দিনে তা বেড়ে তাদের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়। তার পর সাজিদ একদিন খবর পায়, প্রবাসী এক ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে। সেই থেকে কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। আর সে কারণেই যে এলাকাকে ঘিরে কত অজস্র স্মৃতি সেই মুখী হয়নি সাজিদ।
 
মৌচাক মার্কেটের নাম বহুবার শুনেছেন আছিয়া বেগম। এ মার্কেটের বিজ্ঞাপন টিভিতেও প্রচার হতো এক সময়। তাছাড়া ছেলের মুখে শুনেছেন এ মার্কেটের নাম। তাই বহুদিন আগ থেকেই তার ইচ্ছা ছেলের বউয়ের বিয়ের শাড়ি কিনবেন এ মার্কেট থেকে। সাজিদই হয়তো মাকে কোনো একদিন কথায় কথায় আবদার করে রেখেছিল- তার বউকে এ মার্কেট থেকে শাড়ি কিনে দিতে হবে। যখন সাজিদের বিয়ের সব ঠিকঠাক তখন মা ছেলের হাতে বেশ কিছু টাকা দিয়ে বললেন, ‘যাও, নিজে পছন্দ করে বউয়ের শাড়ি কিনে নিয়ে আস।’ ছেলে যখন আপত্তি করল, তখন মায়ের হুকুম, ‘নিজের জিনিস নিজে কিনতে হয় বাবা। তোমার বাবা আমাকে তাই শিখিয়েছেন। তাছাড়া আমার বহু দিনের ইচ্ছা আমার ছেলের বউ ঘরে আসবে মৌচাক মার্কেট থেকে কেনা শাড়ি পরে।’ মায়ের ইচ্ছাতে বিয়ের বাজার করতে ঢাকায় এসেছে সাজিদ। কিন্তু এ কি হয়ে গেল তার! পুরনো যতো স্মৃতি ও ছবি সবই যে হারাতে বসেছে আজ। প্রথম প্রেমে যে সুখস্মৃতি এতদিন সে লালন করে এসেছে বুকের গহীনে তা এখন ধুলো আস্তরে ঢাকা।

সাজিদকে বহনকারী রিকশা এগিয়ে যায় মগবাজার থেকে ওয়্যারলেস গেট হয়ে মৌচাকে দিকে। রুহীও যেনো স্মৃতির ফ্রেম থেকে বেরিয়ে এসে রিকশায় পাশে বসে সাজিদের। গরমে শরীর চিটমিট করে তার। তবু তাতে অস্বস্থি হয় না। তবে চোখের সামনে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের পিলারগুলোকে তার কাছে মনে হয় একেকটা দেওয়াল। যে দেওয়ালগুলো ধীরে ধীরে সব ছবি পাল্টে দিচ্ছে। বদলে ফেলছে চির চেনা পথ ঘাট। নির্মাণ কাজ চলতে থাকায় এলাকায় রাস্তা ঘাটও খানাখন্দে ভরে গেছে। রাস্তার বুক জুড়ে অসংখ্য ক্ষত। তারই একটা ক্ষততে রিকশার চাকা পরে গতি হারায়। সাজিদের ভাবনাগুলোর তাল কেটে যায় ঝাঁকুনিতে। গ্র্যান্ড প্লাজা পাশ দিয়ে ভিতরে ঢুকি যাওয়া ডাক্তার গলি দেখতে পায় সে। এই গলির ভিতরেই রুহীদের ছয় তালা বাড়ি। সে শুনেছে, আগের বাড়িটি আর নেই। সেখানে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট হয়েছে। মুখ ঘুরিয়ে সাজিদ তাকায় রাস্তার অপর পাড়ে। সারি সারি চশমার দোকান সে পাড়ে। কিন্তু সেসব কিছুই দেখতে পায় না সাজিদ। সে দেখে নতুন ঢালাই দেওয়া একটি পিলারের গোড়ায় একটি বোর্ড। তাতে লেখা- ‘সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত। সাবধানে চলুন, নির্মাণ কাজ চলিতেছে।’

সাজিদ নিজে নিজেই হাসে। মনে মনে বলে, ‘নির্মাণ কাজ চলিতেছে।’ সত্যি জীবনের নামে বুঝি এটাই। রোজই তো আমরাও আমাদের ভিতরে ও বাইরে নির্মাণ কাজ চালাচ্ছি। প্রতিদিনই তো গড়ছি নতুন আমিকে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জুলাই ২০১৫/তাপস রায়

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge