ঢাকা, রবিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘পরীক্ষার আগে পড়ে লেটার মার্কসের প্রত্যাশা করা ভুল’

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২৭ ৮:১৭:৪৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-২৮ ১১:৩৬:৩৩ এএম

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে নামার আগে এই ফরম্যাটে কতটা পরিণত বাংলাদেশ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বেশ। বিশেষ করে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হারের পর তো বাংলাদেশের টেস্ট ভবিষ্যত নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। 

কারণ, যেভাবে বাংলাদেশ হেরেছে, তা এক কথায় হতশ্রী। সামনেই বাংলাদেশের ভারত সফর। দুই টেস্টের পাশাপাশি খেলবে তিনটি টি-টোয়েন্টি। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াই শুরু হবে সেখানেই। আর সামনের বছর আছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। তিন দফায় বিসিবিতে ১৬ বছর কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সারোয়ার ইমরান জানালেন, দীর্ঘ পরিকল্পনায় না এগোলে সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে।

টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতির জন্য ঘরোয়া ক্রিকেট আকর্ষণীয় করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করা সারোয়ার ইমরান। বৃহস্পতিবার রাইজিংবিডি’র সঙ্গে কথোপকথনে টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন তিনি।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স কেমন দেখলেন? যারা খেললেন তাদের অনেকেই তো আপনার হাতে গড়া

সারোয়ার ইমরান: যদি বলি খুব কষ্ট পেয়েছি, তাও ভুল হবে না। অনেক অচেনা লেগেছে পুরো দলের পারফরম্যান্স। ওদের (আফগানিস্তান) যতটা ঐক্যবদ্ধ লেগেছে, আমাদের ছেলের ততটা আলাদা।

আফগানিস্তান বাংলাদেশ দলের পার্থক্য কোথায়?

সারোয়ার ইমরান: মানসিকতার পার্থক্য আমার কাছে বড় লাগছে। ওদের কিছু রহস্যজনক বোলার আছে। টেস্টে রশিদ খান, জহির খান ছিল। টি-টোয়েন্টিতে রশিদ খানের সঙ্গে মুজিব-উর-রহমান। এ দুজন বোলার ব্যাটসম্যানদের ভুগিয়েছে বেশ। তবে মানসিকতার পার্থক্য দেখেছি। ওদের দেখে মনে হয়নি মাত্র টেস্ট শুরু করল। আর বাংলাদেশকে দেখে মনে হলো মাত্রই টেস্ট শুরু করল। পুরোটা উলট-পালট। শেষ দিনের কথাই চিন্তা করুন না, একটু ধীরস্থির হয়ে খেললে এ ম্যাচ তো ড্র করা যেত।

পরিকল্পনার কোনো ঘাটতি চোখে পড়েছে?

সারোয়ার ইমরান: এটা আসলে আমার পক্ষে বলা কঠিন। তবে আফগানিস্তান কেমন দল সেটা ভেবে পরিকল্পনা করা উচিত ছিল অবশ্যই।

বাংলাদেশ টেস্ট খেলছে প্রায় ২০ বছর হয়ে এলোঅবাক করে না এমন পারফরম্যান্স?

সারোয়ার ইমরান: আচ্ছা আগে বলুন, টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করার জন্য আপনি কি অনুশীলন করেন? টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আলাদা কী করা হয়? ঘরোয়া ক্রিকেটে দুটো টুর্নামেন্ট হয়। জাতীয় লিগ যেনতেন। বিসিএল হয় মোটামুটি। ওখানে আপনি যেটা খেলছেন সেটা কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, তা আপনাকে হিসাব করা উচিত। বললেই তো আপনি পাঁচ দিনের ম্যাচে ভালো করতে পারবেন না। আমাদের এখানে একটা দলে কয়টা ভালো বোলার থাকে? টেস্ট খেলার মতো কিংবা উইকেট নেওয়ার মতো বোলার কয়টা থাকে? জাতীয় দলে যারা খেলে তারা ম্যাক্সিমাম কেউ এখানে খেলে না।

আমাদের যে জিনিসগুলো জাতীয় লিগে হয় সেগুলো খুবই হতাশার। জাতীয় লিগে হয়তো একটা বোলার বা দুইটা বোলার ভালো থাকে। বাকি দুই-তিন বোলার ভালো থাকে না। আমাদের বোলারদের ব্যাটসম্যানদের ভোগানোর ক্ষমতা কতটুকু? একজনকে যদি আমি জাতীয় লিগে ৫০ দিই, সেটা বিসিএলে আমি ৬০ দেব। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানরা যেসব বোলারদের পেয়ে থাকে তারা ৯০ ভাগ ব্যাটসম্যানদের ভোগাতে থাকে। তাই জাতীয় লিগে সেরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা লাগবে। ঘরোয়া ক্রিকেটে ন্যূনতম সেটা ৮০ লাগবে। বিপিএলে বিদেশি ক্রিকেটার থাকায় ওখানে ব্যাটসম্যানরা কিছুটা অভ্যস্ত হয়, এ ছাড়া কোথাও তো তেমন অনুশীলনের সুযোগও নেই। জাতীয় লিগে না হোক, বিসিএলে বিদেশি ক্রিকেটারদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ঘরোয়া ক্রিকেটে যারা ভালো করছে, যেমন তুষার, আব্দুর রাজ্জাক, নাঈম ইসলাম; তাদের ফেরানো উচিত কি না?

সারোয়ার ইমরান: ওরা যদি ভালো করে থাকে কেন ওদের নেওয়া হবে না, সেই সুনির্দিষ্ট কারণ বোর্ডকে দিতে হবে। এতে হবে কী অন্য যারা আছে তারাও সচেতন হয়ে যাবে যে, ওদেরকে আরো কোথায় উন্নতি করতে হবে। বয়স কোনো ফ্যাক্টর আমি মনে করি না। আমি ক্রিকেটারদের বিচার করি তার পারফরম্যান্স ও ফিটনেস দিয়ে। যদি ওদের দুটো মিলে যায় আমি খেলিয়ে দেব। আমার আর কী দেখার আছে।

টেস্ট স্কোয়াড কি আলাদা করা উচিত?

সারোয়ার ইমরান: আপনি স্কোয়াড তৈরি করবেন কাদের নিয়ে? আপনাকে তো আগে জাতীয় লিগ ও বিসিএল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে হবে। এখানে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, একটা দল অলআউট না হলে ডিক্লেয়ার করে না। প্রতিপক্ষকে ব্যাটিংয়ে না পাঠিয়ে সময় নষ্ট করে। বোলিংয়ে ধার দেখায় না। স্টিস্টেমগুলোর কারণে ওরা এমন করে। ওই যে বোনাস পয়েন্ট-টয়েন্টের কথা চিন্তা করে। ওরা আগে থেকে চিন্তা করে বসে থাকে যে আমরা পারব না অলআউট করতে। মনোবলের ঘাটতি প্রচুর। এসব চিন্তা বাদ দিতে হবে। খেলাধুলা স্পোর্টিং করতে হবে। উইকেট স্পোর্টং করতে হবে। এগুলো পরিবর্তন না হলে আপনি যেই মানের খেলোয়াড় পাবেন তাদের নিয়ে আলাদা টেস্ট স্কোয়াড বানাতে পারবেন না। এনসিএল, বিসিএলে যারা ভালো করে তাদের ডেকে নিন। ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টিতে যারা পারফর্ম করবে তাদেরই নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তাহলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতি হবে। দুই-তিন বছরে উন্নতি হবে তাহলে।

সীমিত পরিসরে বেশি মনোযোগের কারণেই কি টেস্টে এমনটা হচ্ছে?

সারোয়ার ইমরান: টেস্টের খেলোয়াড় আলাদা। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির খেলোয়াড় আলাদা। আমাদের এখানে যেটা হয়, আমাদের সবার সব ফরম্যাটে খেলতে হবে। যারা চার দিনের ম্যাচ খেলতে চায়, তারা চার দিনের ম্যাচ খেলুক না! তাদের হাতে অঢেল সময় আছে। তাদের খেলার সুযোগ করে দিতে হবে বিসিবিকে। আবার যারা টি-টোয়েন্টি খেলতে চায়, তাদের চার দিনের ম্যাচ খেলানোর কোনো কারণ দেখি না। আপনি জিনিসগুলোকে আকর্ষণীয় করেন।

ঢাকা লিগ খেলে ৪০-৫০ লাখ পেয়ে যায় ক্রিকেটাররা। জাতীয় লিগে আপনি দৈনিক ১০ হাজার টাকা করে দিচ্ছেন। এগুলোর উন্নতি করতে হবে। যুদ্ধে টিকে থাকতে হবে। ঢাকা লিগে সবাই লড়াই করে টিকে থাকতে চায়। কেন জানেন? ওরা জানে, আজ পারফর্ম করলে পরবর্তীতে অন্য ক্লাব আগ্রহ দেখাবে। বিপিএলে কতটা জৌলুসপূর্ণ খেলা হয় আমরা সবাই দেখি। মিডিয়া, স্পন্সর সবাই থাকে। এগুলো যদি না করাতে পারেন তাহলে হবে না। আকর্ষণ থাকতে হবে। আপনি পেসারদরে জন্য বাউন্সি উইকেট করে দেন। তাহলে ভালো পেসার পাবেন।

সামনেই তো জাতীয় ক্রিকেট লিগ কোনো পরামর্শ কীভাবে লিগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফেরানো যায়?

সারোয়ার ইমরান: আমাদের মূল জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে। স্থানীয় ক্রিকেটে আমাদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। জাতীয় লিগ ও বিসিএলে যদি পারিশ্রমিক না বাড়ে, খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা না বাড়ড়ে ততদিন পর্যন্ত উন্নতি হবে না। আপনাকে সারা বছরের জন্য বিভাগীয় দলের হেড কোচ, সহকারী কোচ, ফিজিও, ট্রেনার রাখতে হবে। সারা বছরের জন্য আপনাকে পরিকল্পনা করতে হবে। সারা বছর হয়তো সব ক্রিকেটার থাকবে না। কিন্তু যখন যে ফ্রি থাকবে তাকে নিয়ে কাজ হবে। এভাবেই চলতে থাকলে আপনি ফল পাবেন। ওরা কাজ করবে, পরিশ্রম করবে এবং এরপর সবাই বুঝবে যে আমাদের গোড়ায় সমস্যা ছিল।

ভারত সফর আছে সামনে এই সফর দিয়ে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ প্রত্যাশা কেমন হওয়া উচিত?

সারোয়ার ইমরান: আপনি আপনার ব্যক্তিগত জীবনের কথা চিন্তা করুন, আপনি যদি এসএসসিতে ভালো করতে চান তাহলে আপনাকে দশ বছর ভালো করতে হবে। শেষ দুই বছরে আরো কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। পরীক্ষার আগে পড়ে কিছুই হবে না। ভারতে গিয়ে তেমন কিছুই করত পারব না। এটা আশা করাও ভুল। ওরা যেভাবে টেস্টের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে গত কয়েক বছরে তার ধারেকাছেও নেই আপনি। এখন আশা করা উচিত হবে না। মন্দের ভালো, আমরা ফাইট করতে পারি সেটাতেই হবে।

ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজের পারফরম্যান্স কিছুটা সম্মানজনক ছিল?

সারোয়ার ইমরান: টি-টোয়েন্টিতে মোটামুটি ভালো খেলেছে। ব্যাটিংয়ে আমরা শক্তিশালী হলেও ভুগেছি। ফিল্ডিংটা আগের থেকে ভালো করেছে। ওদের (আফগানিস্তানের) স্ট্রেন্থ পাওয়ার হিটিং। টেকনিকে আমরা এগিয়ে আছি। সাইফউদ্দিন ক্যামব্যাক করায় ত্রিদেশীয় সিরিজে আমরা ভালো করেছি। শফিউলও ভালো বল করেছে। শেষ দুটো ম্যাচ জিতেছি। র‍্যাঙ্কিংয়ে ওরা এগিয়ে আছে। যদি আমরা এভাবে পারফর্ম করতে পারি তাহলে ওদের অচিরেই ছাড়িয়ে যাব। ব্যাটিংটা আমাদের তেমন ভালো হয়নি। একটা একটা ম্যাচ করে লিটন, সাকিব ও রিয়াদ ভালো করেছে। এ ছাড়া নতুন আফিফ এক ম্যাচে ভালো করেছে। তবে এভাবে হয় না। আন্তর্জাতিক ম্যাচে টিকে থাকতে হলে অন্তত তিনজনের ভালো করতে হবে একসঙ্গে।

আগামী বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আছে আপনার হাত ধরে ২০০৭ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলেছিল দল প্রস্তুতি এখন থেকেই নেওয়া উচিত কি না

সারোয়ার ইমরান: সময় এসেছে সবকিছু নিয়েই ভাবনার। যারা একটু হার্ডহিটার, যারা শট ভালো খেলতে পারে তাদের নিয়ে পরিকল্পনা করে সেভাবে কাজ শুরু করা উচিত। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি যারা খেলছে তাদের ধারাবাহিকতায় থাকতে হবে। বিপিএল আছে সামনে। ওখান থেকে ভালো খেলোয়াড় বাছাই করতে হবে।


ঢাকা/ইয়াসিন/পরাগ