ঢাকা, শুক্রবার, ২ কার্তিক ১৪২৬, ১৮ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

পরীক্ষা ছাড়া ইয়াবার মামলায় সাজা অবৈধ

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২৬ ৭:১৯:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-০১ ৬:৪৪:৫৮ পিএম

মামুন খান : ‘ইয়াবা’ উদ্ধার হলে ‘রাসায়নিক পরীক্ষা’ ছাড়া মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক আসামিকে সাজা দেয়া সম্পূর্ণ অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন আদালত।

সাধারণত মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে মাদক বিক্রেতা ও মাদক সেবীদের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসামিদের সাজা প্রদান করে থাকেন। আবার অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাদকসহ আসামিদের গ্রেপ্তার করে মোবাইল কোর্টে সোপর্দ করেন। তবে উভয়ক্ষেত্রেই ‘ইয়াবা’ উদ্ধার হলে ‘রাসায়নিক পরীক্ষা’ ছাড়া সাজা দেয়া সম্পূর্ণ অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন আদালত।

অতিসম্প্রতি যুগান্তকারী এ রায় ঘোষণা করা হয়। কারণ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইন ১৯৯০ অনুসারে ইয়াবা মাদকের শ্রেণীভুক্ত নয় (সরাসরি মাদক নয়)। কোনো কোনো ইয়াবার মধ্যে ‘মিথাইল অ্যামফিটামিন’ এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আইন অনুসারে এই ‘মিথাইল অ্যামফিটামিন’ই হচ্ছে শ্রেণীভূক্ত মাদক (সরাসরি মাদক)। আর রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া ইয়াবা বা কোনো ট্যাবলেটে ‘মিথাইল অ্যামফিটামিন’ আছে কিনা- তা বোঝার কোনো উপায় নেই। ফলে ইয়াবার মামলায় রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া সাজা প্রদান অবৈধ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, একইভাবে ফেনসিডিলও মাদক আইন অনুসারে সরাসরি কোনো মদক নয়। ফেনসিডিলের মধ্যে ‘কোডিন’ এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আর এই কোডিন আইন অনুসারে সরাসরি মাদক। ফলে ইয়াবার মতো ফেনসিডিল উদ্ধারের মামলায়ও রাসায়সিক পরীক্ষা করেই রায় প্রদান করা আইনানুগ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।\

এ সম্পর্কে দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম বলেন, রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া ইয়াবাকে মাদক বলার কোনা সুযোগ নেই। লাল রঙের ট্যাবলেট হলেই তাকে মাদক বলা যাবে না। সেটা মাদক না হয়ে ভিটামিন ওষুধও হতে পারে। তাহলে তো লাল রঙের যে কোনো ট্যাবলেট দিয়েই বলে দেয়া যাবে-এটা ইয়াবা। অতএব কোনো পুলিশ কিংবা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তখনই একটি ট্যাবলেটকে ইয়াবা বলতে পারবেন যখন তার রাসায়নিক পরীক্ষা করা হবে। যদি রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া এটাকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে যে কাউকেই ফাঁসিয়ে দেয়ার সুযোগ থাকবে।

একইভাবে ফেনসিডিল বলতেও মাদক আইনের তফসিলে কিছু লেখা নেই। সেখানে লেখা আছে কোডিন। কোডিন সরাসরি মাদক। তাই ফেনডিসিল উদ্ধারের ক্ষেত্রেও রাসায়নিক পরীক্ষা করতে হবে। যেমন জাল টাকা, জাল স্বাক্ষর- এগুলোকে জাল বলতে গেলে বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে বলতে হয়। তাই ইয়াবা উদ্ধার কিংবা ফেনসিডিল উদ্ধারের মামলায় অবশ্যই রাসায়নিক পরীক্ষা করেই রায় দেয়া আইনানুগ।

এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ইয়াবা ও ফেনসিডিল সরাসরি কোনো মাদক নয়। ইয়াবার উপাদান মিথাইল অ্যামফিটামিন এবং ফেনসিডিলের উপাদান কোডিন মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে সরাসরি মাদক। এই (মিথাইল অ্যামফিটামিন ও কোডিন) মাদক পাওয়া গেলে অপরাধ এবং শাস্তি হবে। আর কোনো কিছুতে এই মাদক আছে কিনা- তা নিশ্চিত না হয়ে ‘মামলা এবং শাস্তি’ হতে পারে না। এক্ষেত্রে রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া ইয়াবার মামলায় সাজা অবৈধ মর্মে আদালত সঠিক সিদ্ধান্তই দিয়েছেন।

তিনি বলেন, মাদক পরীক্ষার সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য প্রতিটি জেলায় রাসায়নিক পরীক্ষাগার বা ল্যাব স্থাপন করতে হবে।

যুগান্তকারী সেই রায় : গত বছরের ১৯ জুলাই র‌্যাব-২ এর মো. মাসুদ রানা শামিম সঙ্গীয় ফোর্সসহ মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে রাজধানীর জেনেভা ক্যাম্প থেকে উপস্থিত লোকজনের সামনে নাজমা বেগমের (৩০) কাছ থেকে মহিলা র‌্যাব দিয়ে তল্লাশী করে লালচে গোলাপী রংঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মো. মাসুদ রানা শামিম র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন। এ ভিত্তিতে র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুর রহমান নাজমা বেগমকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী আপিল দায়ের করেন। ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নাহিদ রসুল আসামির ফৌজদারী আপিলের রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিনি মোবাইল কোর্টের রায় বহাল ও বলবৎ রাখেন। এরপর নাজমা বেগম ওই দুই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে বিশেষ ফৌজদারী আপিল দায়ের করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯ এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শেখ হাফিজুর রহমান গত ১২ জুন যুগান্তকারী এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিচারক ইয়াবার মামলায় রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া সাজা অবৈধ বলে ঘোষণা করেন এবং আগের দুটি আদালতের আদেশ রদ রহিদ ও বাতিল করেন।

রায়ে বলা হয়, মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালীন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অপরাধ সংগঠিত বা উদ্ঘাটিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মোবাইল কোর্ট কর্তৃক সাজা দেয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। আর সাজা দেয়া হলে তা মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর ৬(১) ধারা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন। এ ধারা মতে, মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম পরিচালনার সময় কোনো অপরাধ মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সংগঠিত বা উদ্ঘাটিত হয়ে থাকলে ওই ম্যাজিস্ট্রেট আইনের ওই ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যথাযথ দণ্ড দিতে পারবেন। আইনের এ ধারাটি উল্লেখ করে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আপিলকারী (আসামি) ফৌজদারী আপিল করলেও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তার রায়ে সে বিষয়টি আলোচনা করেননি। এছাড়া আসামির কাছ থেকে ৪৩ পিস ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ এর ১৯(১) এর ৯(ক) ধারায় শাস্তি দেয়া হয়েছে।

আইনের তফসিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মাদকদ্রব্যের মধ্যে ‘ইয়াবার’ (বাবা) নাম নেই। ফলে আসামির কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ইয়াবা সরাসরি মাদক নয়। এটা সত্য যে, বাজারে প্রচলিত লালতে গোলাপী রঙের ট্যাবলেট (যা ইয়াবা নামে পরিচিত) এর রাসায়নিক পরীক্ষা করলে কোনো কোনো ট্যাবলেটে মিথাইল অ্যামফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই মিথাইল অ্যামফিটামিন আইন অনুসারে মাদকের শ্রেণীভুক্ত। আর ট্যাবলেটের গায়ে মিথাইল অ্যামফিটামিনের অস্তিত্ব নির্ধারণকারী কোনো লেভেলও থাকে না। রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া ইয়াবা ট্যাবলেটকে মাদকদ্রব্য আইন, ১৯৯০ এ উল্লেখিত মাদকসমূহে অর্ন্তভুক্ত করার কোনো সুযোগ আইনে নেই।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ আগস্ট ২০১৯/মামুন খান/নবীন হোসেন

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন