ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ মাঘ ১৪২৬, ২৩ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

পল্লীগীতির যুগস্রষ্টা আব্বাসউদ্দীন

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-১০-২৭ ১:৫৭:০৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-২৭ ৩:৫৪:৫৭ পিএম

রুহুল আমিন : ভাওয়াইয়া গান বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের নদী অববাহিকার মানুষের প্রাণের গান। এই অঞ্চলের মানুষের যাপিত জীবনের দুঃখ-বেদনা, সুখ-শোক-সমৃদ্ধি সব উঠে এসেছে ভাওয়াইয়া গানে। আর এই ভাওয়াইয়ার সম্রাট হিসেবে পরিচিত বাংলা লোকসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ আব্বাসউদ্দীন।

সংগীত জীবনে গেয়েছেন তিনি আধুনিক, স্বদেশি, ইসলামি গান, পল্লিগীতি, ঊর্দু গান প্রভৃতি। তবে পল্লিগীতিতেই তার মৌলিকতা ও সাফল্য সবচেয়ে বেশি।পল্লীগীতির যুগস্রষ্টা এই শিল্পী ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

আব্বাসউদ্দীনের বাবা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের উকিল। বলরামপুর স্কুলে আব্বাসউদ্দীনের শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯১৯ সালে তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা এবং ১৯২১ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এখান থেকে বিএ পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তবে উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

আব্বাসউদ্দীন আহমদ মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতার গ্রামোফোন কোম্পানিতে দুটি আধুনিক গান রেকর্ড করেছিলেন বিমল দাশগুপ্তের সহায়তায়। গান দুটি ছিল শৈলেন রায়ের লেখা ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো’এবং ‘স্মরণ পারের ওগো প্রিয়’। গান ছিল তার রক্তে। গান ছিল তার নেশায়। গানের জগতে তার ছিল না কোনো ওস্তাদের তালিম। নিজের প্রতিভার জোড়ে নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরেন তিনি।

তিনি প্রথমে ছিলেন পাড়াগাঁয়ের একজন গায়ক। যাত্রা, থিয়েটার ও স্কুল-কলেজের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি অল্প কিছুদিনের জন্য ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর কাছে উচ্চাঙ্গসংগীত শেখেন। রংপুর ও কুচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া, ক্ষীরোল, চটকা গেয়ে আব্বাসউদ্দীন সুনাম অর্জন করেন।

১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আব্বাসউদ্দীন কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিপিআই অফিসে অস্থায়ী পদে চাকরি করেন। পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি পান। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিত্বের সময় তিনি রেকর্ডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। চল্লিশের দশকে আব্বাসউদ্দীনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কলকাতাতে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় তার। এরা উভয়ে মিলে কলকাতা শহরে লোকসংগীত প্রচারে ব্রতী হন। এদের প্রচেষ্টা সফল হয় ও লোকসংগীত সম্পর্কে কলকাতা তথা নগরবাসীর মনে গভীর আগ্রহ জাগে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি নেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সংগীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তার্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেন। আব্বাসউদ্দীন আহমেদ চারটি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছেন। সিনেমাগুলো হলো- ‘বিষ্ণুমায়’, ‘মহানিশ’, ‘একটি কথা’ ও ‘ঠিকাদার’। ধারণা করা হয় যে, তিনি এর চেয়ে বেশি সংখ্যক চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও তা উল্লেখ করেননি। কারণ, সেই চলচ্চিত্রে তার চরিত্রগুলো তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। ‘আমার শিল্পীজীবনের কথা’ আব্বাসউদ্দীনের রচিত একমাত্র গ্রন্থ, যা প্রকাশ হয়েছিল ১৯৬০ সালে।

শুধু দেশে নয়, শিকাগো, নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, টোকিও, মেলবোর্নসহ পৃথিবীর বহু জায়গায় তিনি ইসলামি গান, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি পরিবেশন করে আমাদের বাংলা গানকে অলঙ্কৃত করেছেন। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘তোরষা নদী উথাল পাতাল, কার বা চলে নাও’,  ‘প্রেম জানে না রসিক কালাচান’, ‘নদীর কূল নাই’, ‘আল্লাহ মেঘ দে’, ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’, ‘এই যে দুনিয়া’, ‘ফাঁন্দে পরিয়া বগা কান্দে রে’, ‘ওরে ও দরিয়ার মাঝি’ ইত্যাদি।

১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ২০ মিনিটে এই কণ্ঠশিল্পী মারা যান।সংগীতে অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯) ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (১৯৮১) ভূষিত হন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ অক্টোবর ২০১৭/রুহুল/শাহনেওয়াজ