ঢাকা, রবিবার, ৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

পানের ন্যায্য মূল্যের দাবি চাষিদের

মামুন চৌধুরী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-২৭ ১১:৫৫:১১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-২৭ ১১:৫৫:১১ এএম

মো. মামুন চৌধুরী, বরমচাল থেকে ফিরে : বনবিভাগের মৌলভীবাজারের কুলাউড়া রেঞ্জের দুর্গম পাহাড় বরমচাল। এ পাহাড়ের টিলার প্রায় ২০০ একর জমিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী খাসিয়া সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবারের বসবাস। জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উপায় হিসেবে তারা পান চাষকে প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

সময়ের ব্যবধানে এ পেশার সঙ্গে যোগ হয়েছে লেবু, আনারস, কমলা, নানা ধরনের সবজি ও ফল চাষ। তারপরও পান চাষকেই প্রধান হিসেবে তারা ধরে রেখেছে।

পুঞ্জির এ খাসিয়া পান সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীদের কাছে প্রিয়। এ পান স্বাদে একটু ঝাল এবং আকারে বড়। অর্ধশত বছর ধরে চাষ হয়ে আসা এ খাসিয়া পান এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে লন্ডন, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। খাসিয়া সম্প্রদায় এই পানকে তাদের প্রাণ বলে মনে করে। তবে এখানকার পান চাষিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত।

১৪৬টি পান মিলিয়ে একটি কুচি বা কান্তা তৈরি হয়। প্রতি কুচি পান বিক্রি করতে হচ্ছে ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ টাকার মধ্যে। পান চাষে কঠোর পরিশ্রম থাকলেও পারিশ্রমিক সেই তুলনায় অনেকটা কম। তারপরও এখানকার বাসিন্দারা বসে নেই। তারা পূর্বপুরুষের আদি পেশা ধরে রেখেছে। তবে এভাবে আর কতদিন। খুচরা বাজারে কয়েক গুণ মূল্যে পান বিক্রি হয়ে আসছে। পাইকাররা পুঞ্জিতে এসে চাষিদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে পান কিনে নিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও পরিচর্যা শেষে কতটুকু অর্থ যাচ্ছে চাষির পকেটে। এ টাকায় পুরো সংসার চালানো কঠিন। এসব সত্ত্বেও পুঞ্জির বাসিন্দারা পান চাষকে হারাতে দিচ্ছে না। তারা এ পেশাকে ঐতিহ্য মনে করে।

১৯৫৫ সালে জেলার কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল বিটের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ২০০ একর পাহাড়ি ভূমির ওপর আমছড়ি ভিলেজার পুঞ্জি গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এ পুঞ্জিতে প্রায় ২০/২৫টি পরিবার বসবাস করছে। তাদের সদস্য সংখ্যা হবে প্রায় শতাধিক। এখানকার সবাই কমবেশি পান চাষে জড়িত। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা দিনভর গাছ থেকে পান আহরণ করে। আর নারীরা সেগুলো থেকে কুচি তৈরি করে। প্রতিদিন এ পুঞ্জি থেকে প্রায় ৭/৮ হাজার কান্তা পান বিক্রি হয়। পাইকাররা পুঞ্জি থেকে এসব পান কিনে সিলেট অঞ্চলের খোলাবাজারে বিক্রি করে। অধিকাংশ পাইকার ওই পান ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে।

খাসিয়া পানের বেশি চাহিদা লন্ডন প্রবাসী সিলেটিদের কাছে। তাই আমেরিকা, ব্রিটেন ও মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এ পুঞ্জির পান রপ্তানি করছে পাইকাররা। প্রবাসীরা এ পান খেয়ে স্বাদ পান। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়ও এ পান জনপ্রিয় হচ্ছে।

পুঞ্জির প্রধান, স্থানীয়রা যাকে মন্ত্রী বলে। এ মন্ত্রী জেমসন লামিন জানান, খাসিয়া পান পাতা একটু ভারী হওয়ায় এবং সহজেই পচন হয় না বলে এই পান দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে। কোনো কেমিক্যাল ছাড়াই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এই পান রাখলে নষ্ট হয় না।

তিনি আরো জানান, তার পুঞ্জিতে পানের পাশাপাশি সুপারি, আনারস, লেবু, কলা, পেয়ারা ও পেঁপের আবাদ হয়। পান চাষে সমস্যাও রয়েছে অনেক। বিশেষ করে খরা মৌসুমে সমস্যা দেখা দেয় বেশি। এ সময় দুটি রোগ দেখা দেয়। একটি হলো উদ্ভ্রাম। এই রোগ হলে পান পাতা লাল হয়ে ঝরে পড়ে যায়। আরেকটি হলো পচন রোগ। এই রোগ হলে পুরো গাছ তুলে ফেলতে হয়।

প্রদীপ তারিং, ক্লিস পোলিং, প্লরেন্স লামিনসহ অন্যান্য পান চাষিদের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, পান চাষ লাভজনক হলেও এখানে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। বিশেষ করে রোগবালাই হলে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে যায়। আষাঢ় মাসে পান গাছের চারা লাগানো হয়। কলমের মাধ্যমে এই চারা উৎপাদন করা হয়। এই চারা বিক্রি হয় না। তবে বিনামূল্যে একই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিনিময় হয়। সুপারি অথবা অন্য কোনো গাছের গোড়ায় এই পান গাছ লাগানো হয়। সেই গাছের আশ্রয় নিয়ে পান গাছ বেড়ে ওঠে। সাধারণত ১০-১২ বছর এই গাছ ফলন দেয়।

পুঞ্জিতে রয়েছেন একজন মন্ত্রী। বংশানুক্রমে সেই মন্ত্রী মনোনীত হয়ে থাকে। তা ছাড়া তাকে সহযোগিতা করার জন্য বসবাসকারী পরিবারের ভোটে নির্বাচিত করা হয় ছোট মন্ত্রী।

সিলেটের জৈন্তাপুর, জাফলং, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, রাজনগর; সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এবং হবিগঞ্জের বাহুবল ও চুনারুঘাট উপজেলায় খাসিয়াদের বসবাস। খাসিয়ারা অস্ট্রিক গোষ্ঠীর অংশবিশেষ। ১৮৩৫ সালের ১৬ মার্চ এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে খাসিয়াদের জাইন্তিয়া রাজ্যের পতন ঘটে। এরপর থেকে তারা বিভিন্ন গোত্র, উপগোত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার খাসিয়া রয়েছে।




রাইজিংবিডি/হবিগঞ্জ/২৭ এপ্রিল ২০১৭/মো. মামুন চৌধুরী/এসএন

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন