ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৩ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৯ ১৪২৭ ||  ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

পেশা বদলাচ্ছেন টাঙ্গাইলের মৃৎশিল্পীরা

100 || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:০৭, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০  
পেশা বদলাচ্ছেন টাঙ্গাইলের মৃৎশিল্পীরা

বাংলার প্রাচীন জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম টাঙ্গাইল। এ অঞ্চলে আছে নানা ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এসবের মধ‌্যে উল্লেখযোগ‌্য মৃৎশিল্প। সময়ের বিবর্তনে এ শিল্প আজ হুমকির মুখে। জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করছেন মৃৎশিল্পী বা কুমাররা।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টাচ্ছে লাইফস্টাইল। প্লাস্টিক, কাঁচ, সিরামিক ও মেলামাইনের পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় মাটির তৈরি পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষ। তাই মৃৎশিল্পের ব‌্যবসায় চলছে মন্দা। বংশ পরম্পরায় কিছু কুমার এখনো মৃৎশিল্পের ঐতিহ‌্য ধরে রাখলেও জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

মৃৎশিল্প শুধু শিল্প নয়, আবহমান গ্রাম-বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য। অনেকেই বংশপরম্পরায় মাটি দিয়ে হাঁড়ি, কলস, পেয়ালা, মটকা, পিঠা তৈরির ছাঁচ, সরা ইত্যাদি তৈরি করেন। একসময় টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতি, ভূঞাপুর, নাগরপুর, দেলদুয়ার এবং মির্জাপুর উপজেলায় প্রচুর কুমার ছিলেন। এসব এলাকায় তাদের হাতে তৈরি হতো কারুকার্যমণ্ডিত নানা তৈজসপত্র। একসময় পাল সম্প্রদায়ের লোকরা বড় ঝাকায় করে মাটির তৈরি পাতিল, ঠিলা, কলস, পুতুল, কুয়ার পাট, খেলনা, টব, মাটির ব্যাংক ইত্যাদি হাট-বাজারে বা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করতেন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব তৈজসপত্র পাশের জেলাগুলোতেও বিক্রি করা হতো।

দিন যতই যাচ্ছে, ততই কমছে মাটির তৈরি পণ‌্য। কাঁচ, প্লাস্টিক, সিরামিক আর মেলামাইনের পণ‌্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না মৃৎ পণ‌্য। পণ্য বিক্রি করতে না পারায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন টাঙ্গাইলের মৃৎশিল্পীরা। তাদের উপার্জন কমে গেছে। তারপরও কিছু কুমার বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখতে লড়াই করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাটির তৈজসপত্রকে যুগোপযোগী করে তুলতে পৃষ্ঠপোষকতা করা গেলে পরিবেশের ওপর প্লাস্টিকের যে বিরূপ প্রভাব তা কমানো যাবে। বাঁচানো সম্ভব হবে বিলুপ্তপ্রায় মৃৎশিল্পকে।

জেলার মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় মৃৎশিল্পের জন্য টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা বিখ্যাত ছিল। এই উপজেলার বাইমহাটি, পুষ্টকামুরি, আন্দরা, দেওহাটা, কচুয়াপাড়া, বহুরিয়া, গোড়াই, ফতেপুর, ইচাইল, ভাদগ্রাম, পাকুল্ল্যা, সাটিয়াচড়া, চুকুরিয়া, গুনটিয়া, মহেড়া, বানাইল, ওয়ার্শি, তরফপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের ৩০-৩৫টি গ্রামে প্রায় ১২ হাজার মানুষ মাটি দিয়ে তৈজসপত্র তৈরি করতেন। কিন্তু বর্তমানে পুরো জেলায় হাজার খানেক কারিগর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের বাসাখানপুরে ৩৬টি, বড় বৈন্যাফৈর পালপাড়ায় ২০টি, সদর উপজেলার ছিলিমপুর ইউনিয়নের গমজানীতে ২০টি, কালিহাতি উপজেলার উত্তর বেতডোবায় ৫০টি, ভূঞাপুর উপজেলার ফলদা কুমার পাড়ায় ৭০টি, মির্জাপুরের বাহমহাটি, ফতেপুর, পাকুল্যা ও দেওহাটায় গ্রামে প্রায় ৮০টি কুমার পরিবার বসবাস করছে। তাদের উৎপাদিত বেশিরভাগ পণ্যই থেকে যাচ্ছে অবিক্রিত।

সদর উপজেলার বড় বৈন্যাফৈর পালপাড়ার ৭২ বছর বয়সী কার্তিক পাল বলেন, ‘আমি প্রায় ৬০ বছর ধরে এ কাজ করি। কিন্তু এখন পাতিল, ঠিলা, কলস আগের মতো আর চলে না। চলে শুধু দইয়ের পাত্র। অন্য কোনো কাজ জানি না, তাই কোনো রকমে বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখছি। এখন শুধু দইয়ের পাত্র ও প্রতিমা তৈরি করি।’

সদর উপজেলার বাসাখানপুরের বলরাম চন্দ্র পাল বলেন, ‘নানা ধরনের আধুনিক জিনিসপত্রের ব্যবহার বাড়ায় মৃৎশিল্পের ব্যবসা আর আগের মতো নাই। আমরা এখন শুধু দইয়ের পাত্র বানাচ্ছি। তাতেও তেমন লাভ হচ্ছে না। ১০০ মাটির পাত্র তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় ৫০০ টাকা, তা বিক্রি করছি ৬০০ টাকায়।

কালিহাতী উপজেলার উত্তর বেতডোবার সুরেশ চন্দ্র পাল বলেন, ব্যবসায় মন্দার কারণে আমাদের এখাকার মৃৎ পণ‌্য প্রস্তুতকারী প্রায় ১০০ পরিবার ভারতে চলে গেছে। প্রায় ৫০০ পরিবার অন্য পেশায় চলে গেছে। হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছে।

উত্তর বেতডোবার খুশিমোহন পাল ও হরিদাস পাল জানান, বর্তমানে কাঠ ও মাটির দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বাজারে মাটির পণ‌্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় তাদের ব্যবসা এখন হুমকির মুখে। যদি সরকার বা কোনো সংস্থা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করে, তাহলে হয়ত ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প ঘুড়ে দাঁড়াতে পারবে।

 

টাঙ্গাইল/সিফাত/রফিক

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়