ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রতিকারের পথ একটাই || মিনার মনসুর

মিনার মনসুর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-১৯ ৮:১৬:৩৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-১৯ ১২:১৬:৪৩ পিএম
চল্লিশ দিনের মৃত সন্তান বুকে নিয়ে বাবার আহাজারি

বিশ্বজুড়ে বিস্তর হৈ চৈ হচ্ছে। চীন-রাশিয়ার মৌনতা সত্ত্বেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বিবৃতি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিবৃতির ভাষা তাদের প্রত্যাশার চেয়েও ‘জোরালো’। প্রায় একই সময়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত হয়েছে নিন্দা প্রস্তাব। সেই প্রস্তাবের ভাষাও কঠোর। মাত্র সপ্তাহখানেক আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি প্রায় শর্তহীন সমর্থন জানিয়ে আসলেও ইতোমধ্যে সেই অবস্থানেরও খানিকটা পরিবর্তন ঘটেছে- যা আশাব্যঞ্জক বলেই মনে হচ্ছে।

ভারত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যে শুধু ত্রাণসমগ্রী পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোনে আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা বাংলাদেশের পাশে আছে। শত কোটি মানুষের দেশ ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিবেশীই শুধু নয়, আঞ্চলিক পরাশক্তিও বটে। মিয়ানমারের ওপর উভয়েরই যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। সেদিক থেকে আপাতত এটুকুও কম তাৎপর্য নয়, যদিও এ দুর্যোগময় মুহূর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একটি ফোনই অধিক প্রত্যাশিত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগেই সমর্থন জানিয়েছিল বাংলাদেশের অবস্থানকে। প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্যে তাদের মন্ত্রিপর্যায়ের একজন দূত যাচ্ছেন মিয়ানমারে। এদিকে নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও খুবই সোচ্চার। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নিয়ন্ত্রিত শাসকগোষ্ঠীর রক্ততৃষ্ণা মিটছে না কিছুতেই। আলাদা করা যাচ্ছে না ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ শরিক একদা গণতন্ত্রের অগ্রদূত শান্তিতে নোবেলবিজয়ী অং সান সু চিকেও।

সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট নতুন করে যে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু হয়েছে তা থামার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না এখন অবধি। গত ১৬ সেপ্টেম্বরও মিয়ানমারের গ্রামগুলো জ্বলতে দেখেছে বিশ্ববাসী। যদিও বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্ত থেকে চর্মচক্ষেই সব দেখা যায়। তারপরও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেই অগ্নিযজ্ঞের স্যাটেলাইট প্রমাণও হাজির করেছে। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নারী-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হচ্ছে নিরাপরাধ মানুষকে। ধর্ষণ করা হচ্ছে নারীদের। এ নৃশংসতা থেকে বাঁচার জন্যে ঘরবাড়ি সহায়-সম্পদ সব ফেলে বিপন্ন মানুষ যখন সীমান্তের দিকে ছুটছে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। সীমান্তে পুঁতে রাখা হচ্ছে মাইন। সেখানে জাতিসংঘের লোকজনকেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। প্রবেশাধিকার নেই সাংবাদিকদের। অতএব, গত তিন সপ্তাহে কত লোক মারা গেছে, কত নারী ধর্ষিতা হয়েছে জানার কোনো উপায় নেই। তবে ঘটনার ভয়াবহতা উপলব্ধি করার জন্যে এ তথ্যটুকুই যথেষ্ট যে, এ কদিনে বাংলাদেশে প্রবেশ করা শরণার্থীর সংখ্যা চার লাখ ছাড়িয়ে গেছে। জাতিসংঘের দুই সংস্থার (আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ও শরণার্থী সংস্থা) আশঙ্কা, অচিরেই তা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

না, এসব মোটেও নতুন কিছু নয়। দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে খুবই পরিকল্পিতভাবে চলে আসছে এ নিপীড়ন। লক্ষ্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এথনিক ক্লিনসিং। রোহিঙ্গাদের নির্মূল করে তাদের বংশানুক্রমিক ভিটেমাটি ও ভূমি তুলে দেওয়া হচ্ছে কর্পোরেট মাফিয়াদের হাতে। তার নিকটতম সাক্ষ্য হিসেবে আমরা কেবল দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশে অবস্থানরত কয়েক লাখ রোহিঙ্গার কথা জানি। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যেখানে এ মানুষগুলো বংশ পরম্পরায় শত শত বছর ধরে বসবাস করে আসছে, সেই আরাকান বা রাখাইন রাজ্যে তাদের ওপর অব্যাহতভাবে যে অমানুষিক নিপীড়ন চলছে তার বৃহদংশই অজানা রয়ে গেছে বিশ্ববাসীর। সম্প্রতি গার্ডিয়ান পত্রিকার কলামিস্ট জর্জ মনবিও লিখেছেন: গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিবেদন সু চি পড়েছেন কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এখানে যেসব অপরাধের বর্ণনা আছে তা ভয়াবহ। এই প্রতিবেদনে নারী এবং মেয়েশিশুদের গণধর্ষণের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। নির্যাতনের পর এসব নারী ও মেয়েদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে। কীভাবে পরিবারের সদস্যদের সামনেই শিশু এবং বয়স্কদের একবারে চিরে ফেলা হয়েছে, তার বর্ণনাও আছে সেখানে। এ প্রতিবেদনে শিক্ষক, বয়স্ক মানুষ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতাদের দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ, ঘর বন্ধ করে রেখে তাতে আগুন দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, গর্ভবতী এক নারীকে সেনাদের পিটিয়ে মারার দৃশ্য আর ভূমিষ্ঠ সন্তানকে পিষে মেরে ফেলা- এমন ভয়াবহ সব বর্ণনা আছে সেই প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদনে বর্ণনা আছে, কীভাবে জোর করে ফসল ধ্বংস করা হচ্ছে এবং গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে মানুষদের গ্রামছাড়া করা হচ্ছে। আর জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনটি মাত্র একটি প্রতিবেদন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত বছর ঠিক এ ধরনের আরেকটি প্রতিবেদন তুলে ধরে। রোহিঙ্গাদের ওপর এসব নির্যাতনের পর্বতপ্রমাণ উদাহরণ আছে, যাতে এটা সহজেই প্রমাণিত হয় যে, এই জাতিগোষ্ঠীকে মিয়ানমার থেকে একেবারে নির্মূল করার জন্যই এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আর সবই ঘটছে শতভাগ সামরিক কায়দায়। মিয়ানমারের জান্তা যে সেখানে ‘পোড়ামাটি নীতি’ গ্রহণ করেছে অকাট্য তথ্যপ্রমাণসহ তাও নিশ্চিত করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

একাত্তরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানি জান্তা। ফলে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে সর্বস্বান্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীর এই ঢল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্মন্তুদ সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সেই কথা স্মরণ করছিলেন তখন তার চোখ ছিল অশ্রুসিক্ত, কণ্ঠ বেদনারুদ্ধ। এ আবেগ আমাদের জাতিগত। তবে বাংলাদেশের মানুষের সৌভাগ্য ছিল যে, তাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন নেতা ছিলেন, ছিল আওয়ামী লীগের মতো গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যমণ্ডিত মজবুত একটি সংগঠন। কিন্তু এ পর্যন্ত যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের পায়ের তলায় শুধুই চোরাবালি। দশকের পর দশক ধরে মানুষগুলো নিপীড়িত হচ্ছে, অথচ তাদের কোনো নেতার বলিষ্ঠ কোনো কণ্ঠ আমি অন্তত শুনিনি। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামে যে-সংগঠনটি দুচারটি পুলিশ মেরে ও সেনাক্যাম্পে হামলা চালিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে তাদের সুনামের চেয়ে দুর্নামই বেশি। লাখ লাখ মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করে চরমতম দুর্দশার মুখে ঠেলে দিয়ে তারা কী অর্জন করতে চায় সেটা একমাত্র তারাই জানে!

অং সান সু চি নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের ভরসার কেন্দ্র হতে পারতেন। কারণ মিয়ানমারের জান্তা কতোটা বর্বর হতে পারে সেটা তিনি অন্য যে কারো চেয়ে ভালো জানেন। এ জান্তার হাতেই বছরের পর বছর কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন তিনি। মৃত্যুপথযাত্রী স্বামীকেও তিনি দেখতে যেতে পারেননি তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে। শুধু তাই নয়, সব নিপীড়ন তিনি সহ্য করেছেন কেবল গণতন্ত্র ও নিপীড়িত মিয়ানমারবাসীর অধিকার প্রতিষ্ঠার মহান ব্রতকে সামনে রেখে। এ কথা তিনি বারবার বলেছেন। আমরা, বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ, তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছি। তার বক্তব্যকে ব্যানার হিসেবে ব্যবহার করেছি। নোবেল শান্তি পুরস্কারের মধ্য দিয়ে সেই সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে বিশ্বাসও করেছিল বিশ্ববাসী। কিন্তু সেই সু চিকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের চরম দুর্দশা দেখেও তিনি শুধু যে এ ব্যাপারে চোখ বুজে আছেন তাই নয়, বরং তিনিই হয়ে উঠেছেন নিপীড়নকারীদের কণ্ঠস্বর। প্রসঙ্গত গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের দৈনিক গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয় মন্তব্যটি লক্ষ করা যেতে পারে। তারা লিখেছেন: ‘‘লোকে তাঁকে তাগিদ দিয়েছে, মুখ খুলুন, কথা বলুন। কিছু একটা করুন। এখন পর্যন্ত সু চির কথা ও কাজ তাঁর মৌনতার মতোই জঘন্য। তাঁর সরকার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক তদন্তকারী ও সাহায্য কর্মকর্তাদের সেখানে যেতে দেয়নি। সু চি ফেসবুক পাতায় ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, চলমান সহিংসতা নিয়ে এরা ‘বিপুল পরিমাণ ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে, আমরা যার সামান্য পরিমাণই দেখতে পাচ্ছি’।”

সু চির এই ‘জঘন্য’ ভূমিকার কারণে শুধু যে তার বা নোবেল শান্তি পুরস্কারের ভাবমূর্তি ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে তাই নয়, একই সঙ্গে ভেঙে যাচ্ছে মানুষের ধৈর্যের বাঁধও। যুক্তি ও শুভবোধকে ক্রমেই ছাপিয়ে উঠতে চাচ্ছে প্রতিহিংসার দানব। তার পরিণতি কতোটা ভয়াবহ হতে পারে সেটা আমরা আফগানিস্তান-সিরিয়া-ইরাক ও লিবিয়ায় দেখেছি, এখন দেখছি বিশ্বজুড়ে। মাত্র দুদিন আগেও বোমা হামলা হয়েছে ব্রিটেনে। মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীকে মনে রাখতে হবে, যে-অজুহাতে তারা আজ একটি নিরস্ত্র নিরপরাধ জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার হিংস্রতায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে, সর্বহারা অপমানিত লাঞ্ছিত এ মানবসন্তানগুলো একদিন সত্যি সত্যিই যদি সেই উগ্রতার পথ বেছে নেয় তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আর সেটা যে শুধু নাফ নদীর দুই পাড়ে সীমিত থাকবে না তাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে মিয়ানমারের দুই প্রভাবশালী প্রতিবেশী বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের দেশ চীন ও ভারতকে। দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, যে সোভিয়েত রাশিয়া একদিন বিশ্বের নিপীড়িত মুক্তিকামী মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিল- চরম দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের হানাদারকবলিত মানুষের সেই রাশিয়াই এখন নিপীড়কদের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রায় দিগম্বর হয়ে।  

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্মিলিত উদ্যোগের জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি জাতিগত নিধনের ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, যদিও বেশ কজন নোবেলজয়ী বলেছেন, পরিস্থিতি ইতিমধ্যে ওই মাত্রা পেরিয়ে গেছে। ফর্টিফাই রাইটস নামে একটি এনজিওর কর্মী ম্যাথু স্মিথ বলেছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া বিশদ সাক্ষ্য থেকে তাঁদের মনে হচ্ছে, তাঁরা এখন নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন, (রাখাইন প্রদেশে) ‘রাষ্ট্র পরিচালিত নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্থানীয় সশস্ত্র অধিবাসীরা গণহত্যা চালিয়েছে’। স্মিথ বলেন, অবস্থাদৃষ্টে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে যে বর্মি সেনাবাহিনী দেশ থেকে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ, হাত-পা কেটে ফেলা এবং অন্যান্য অপরাধের বহু ঘটনা নথিভুক্ত করেছে ফর্টিফাই রাইটস।  রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পালিয়ে আসা সওজা নামের এক নারী স্বাস্থ্যকর্মী বলেছেন, ১৫ দিনের যাত্রায় তিনি দেখেছেন, ক্লান্তিতে শক্তি নিঃশেষ হওয়া সন্তানেরা হাঁটতে পারছে না বলে বাবা-মা তাদের পথে ফেলে রেখে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ৫০ বছর বয়সী এক লোক তাঁর ৮০ বছর বয়সী বাবাকে পথের ধারে রেখে গিয়েছেন। যেতে হয়েছে। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ‘বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গণহত্যা প্রতিরোধ এবং শাস্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী পাঁচটি কাজ যদি ‘কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী, জাতি বা গোত্রকে সম্পূর্ণ বা অংশত ধ্বংস করা উদ্দেশ্যে’ সমাধা করা হয়, তবে সেটা গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে। সু চি মিয়ানমারের অঘোষিত প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই অপরাধের চারটিই কমবেশি চালিয়ে আসছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।

বাদবাকি দুনিয়ার জন্যে এ নিধনযজ্ঞের অর্থ যাই হোক না কেন, এটা যে বাংলাদেশের জন্যে প্রায় ‘মরণফাঁদ’ হয়ে উঠেছে তাতে সন্দেহ নেই। এমনিতেই বাংলাদেশ এমন দুটি ভয়াবহ ঝুঁকির ধারালো তরবারির ওপর দিয়ে হাঁটছে-যাতে একটু এদিক-ওদিক হলেই ঘটে যেতে পারে সমূহ সর্বনাশ। তার একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপরটি অনিবার্যভাবে জঙ্গিবাদ। সর্বোপরি, দারিদ্র্যের সঙ্গে আমাদের চিরায়ত সংগ্রাম তো আছেই। পাশাপাশি এও লক্ষণীয় যে মিয়ানমারের পাশ ঘেঁষে বঙ্গোপসাগরে নেমে যাওয়া বাংলাদেশের যে সরু ভূখণ্ডটিতে এখন জলোচ্ছ্বাসের মতো ধেয়ে আসছে শরণার্থীর ঢল, সেখানে আগে থেকেই লাখ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। তারা ১৯৭৮ এবং ১৯৯১-৯২ সালের শরণার্থী ঢলে ঢুকে পড়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তারা খাদ্য, রান্নার লাকড়ি, ভূমি আর কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলগুলোর একটি। এই এলাকায় সাক্ষরতার হার ২৭ শতাংশ। ফলে দীর্ঘদিন যাবৎ এ অঞ্চলটি মাদক-বাণিজ্য আর জঙ্গিবাদ প্রসারের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এদিকে ত্রাণসাহায্য যা আসছে জনসংখ্যার হিসাবে তা কিছুই নয়। বড়ো জোর সাতদিন চলার মতো। তারপর কী হবে কেউ জানে না। শরণার্থীদের বড়ো অংশই শিশু ও নারী। যে অবস্থা পেছনে ফেলে তারা এসেছে এবং যে অবস্থার মধ্যে তারা এখন আছে তাতে মানবিক দুর্যোগের ভয়ঙ্কর কালো ছায়া থেকে কেউই মুক্ত নয়।

অতএব, যা করার দ্রুত করতে হবে। শুধু ত্রাণ দিয়ে এ বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। মিয়ানমারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সেনাবাহিনীর ওপর অর্থবহ চাপ প্রয়োগের পথ খুঁজতে হবে। সসম্মানে স্বভূমিতে পুনর্বাসন করতে হবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের। কিন্তু কাজটি যারা করতে পারেন বা পারতেন তাদের প্রায় সকলেরই অস্ত্রের আকর্ষণীয় বাজার হলো মিয়ানমার। আছে আরও নানা ধরনের স্বার্থ-সম্পর্ক। তবু মানবতার ওপর আমরা আস্থা হারাতে চাই না। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যা হচ্ছে তা স্পষ্টতই মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ। প্রতিকারের পথও একটাই-অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। মহাপরাক্রান্ত হিটলাররা পার পায়নি, এরাও পাবে না। আজ হোক, কাল হোক সব স্বার্থকে ছাপিয়ে মানবতার স্বার্থই জয়ী হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ধানমন্ডি, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন