ঢাকা, বুধবার, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বব মার্লে : এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-১১ ৯:৪০:০৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-১১ ৯:৪২:৫১ এএম

রুহুল আমিন :  বব মার্লে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন জ্যামাইকান রেগে শিল্পী। যিনি কালোদের ওপর করা শোষণ-নিপীড়ন ও মুক্তির কথা বলতেন।

১৯৮১ সালের ১১ মে মহান এই প্রতিবাদী শিল্পীর মৃত্যু হয়। বর্ণবাদ বিরোধী প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি বব মার্লে ফুসফুস ও মস্তিষ্কের ক্যান্সারে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান। সঙ্গীত বিশ্ব আজো এই মহান শিল্পীকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।

বব মার্লে ১৯৪৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জ্যামাইকার সেইন্ট অ্যান প্রদেশের পাহাড়ঘেরা দরিদ্র অধ্যুষিত গ্রাম নাইন মাইলে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পুরো নাম ছিল রবার্ট নেসতা বব মার্লে। কিন্তু জ্যামাইকার পাসপোর্ট অফিস নামের কিছু অংশ কেটে দেওয়ার পর তিনি হয়ে যান বব মার্লে। ‘মার্লে’ পদবিটা বাবার কাছ থেকে পাওয়া। বাবার নাম নরভাল মার্লে।

তার বাবা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ কর্মচারী। আর মা কৃষ্ণাঙ্গ জ্যামাইকান। এই কারণেই ছোটবেলা থেকেই বব মার্লে সাদা-কালো দ্বন্দ্বে ভুগতেন। মজার ব্যাপার হলো স্কুলে তার কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধুরা তাকে ডাকত ‘সাদা বালক’ বলে। আর শ্বেতাঙ্গ দুনিয়ায় তিনি পরিচিত ছিলেন ‘কালো’ হিসেবে।

১০ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। পরে মায়ের সঙ্গে রাজধানী কিংস্টনে চলে  আসেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই গানের দিকে ঝুঁকে পড়েন বব মার্লে।  তার পরিবারকে সঙ্গীত পরিবারই বলা যায়। কারণ তার মামা-খালা-নানা সবাই সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি স্কুলে পড়ার সময় সহপাঠীদের নিয়ে তৈরি করেন গানের দল। দলের নাম ছিল দ্য ওয়েইলার্স ব্যান্ড। পরবর্তীতে যা বিশ্ব বিখ্যাত হয়। দলের সদস্য ছিলেন বব মার্লে, পিটার টশ ও বানি ওয়েইলারসহ আরো কয়েকজন। গানের ব্যাপারে তারা সিরিয়াস ছিলেন। মঞ্চভীতি কাটানোর জন্য স্কুলে পড়ার সময়ই তারা মাঝ রাতে কবরস্থানে রিহার্সাল করতেন।

১৯৬০ সালের  মাঝামাঝি থেকেই ওয়েইলার্সের অ্যালবাম বেরোতে থাকে।  তবে বব মার্লে দুনিয়াজুড়ে পরিচিতি পান  ১৯৭৩ সালে। ‘ ক্যাচ আ ফায়ার ’ ও ‘বার্নিং’ শিরোনামের জোড়া অ্যালবাম প্রকাশের পরই তিনি এই পরিচিতি পান।  এরপর  ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অনেক কনসার্টে গান গেয়েছেন তিনি ও তার দল। বিশ্বজুড়ে খ্যাতি আসতে থাকে তার। সাদাদের সমাজে দাপটের সঙ্গে আসন গেড়েছিলেন বব মার্লে। জ্যামাইকান রেগে, স্পা ইত্যাদি লোকছন্দের ধারার গান দিয়ে তিনি বিশ্ব জয় করেন। উন্নত বিশ্ব মানে পশ্চিমাদের কালোদের ওপর শোষণ-নিপীড়নের কথা বলেছেন তিনি পশ্চিমে অবস্থান করেই।

বব মার্লে রাসটাফারি ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। রাসটাফারি হলো আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের একটি সহজিয়া মতাদর্শ। এই ধর্মে কালো মানুষদের স্রষ্টার পছন্দের বান্দা হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়। ইথিওপিয়ার তৎকালীন সম্রাট প্রথম সেলাসিকে যিশুর পুনরুজ্জীবিত অবতার মনে করেন রাসটাফারিয়ানরা। অনেক রাসটাফারিয়ান জটাচুল রাখেন। আর এই ধর্মের জীবনধারায় গাঁজাকে পবিত্র বলে গণ্য করা হয়।

জীবনঘনিষ্ঠ গান গাইতেন বলেই বিশ্বজুড়ে মার্লের বিপুল জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার নিয়ে গান গাওয়ায় অনেকের প্রিয় মানুষে পরিণত হন মার্লে। গানে নানা ক্ষোভ ও সমস্যার কথা বলে মন জয় করেন তরুণদেরও। তার বার্নিং অ্যালবামের বেশ কয়েকটি গান মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে।

বব মার্লে একাধারে গায়ক, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। তিনি প্রায় ৫০০ গান লিখে সুর করেছেন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই তার গান ও তিনি পরিচিত। বিশ্বব্যাপী বব মার্লে এতোটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, একবার তার দেশ জ্যামাইকার সরকার একটা ভয়াবহ রাজনৈতিক দাঙ্গার হাত থেকে বাঁচার জন্য বব মার্লেকে হাজির করে দেশে। বব মার্লে ছিলেন তৃতীয় বিশ্বের আইকন। ৩৬ বছরের ছোট্ট জীবনে তিনি আলোড়ন তুলেছিলেন পৃথিবীব্যাপী।

১৯৯৯ সালে 'বব মার্লে এন্ড দ্য ওয়েইলার্স' অ্যালবামকে 'বিশ শতকের সেরা অ্যালবাম' নির্বাচিত করে টাইম ম্যাগাজিন। তার গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘গেট আপ স্ট্যান্ড আপ’, ‘বাফেলো সোলজার’, ‘ওয়ান লাভ’ ও ‘নো ওম্যান নো ক্রাই’। বিবিসি তার ‘ওয়ান লাভ’ গানটিকে শতাব্দীর সেরা গান নির্বাচিত করেছে।

ব্রিটিশ জনমত জরিপে সর্বকালের সেরা গীতিকারের তালিকায় তিন নম্বরে আছেন বব মার্লে। বব ডিলান ও জন লেননের পর পরই তার অবস্থান। আর  রক এন রোল গানের হল অব ফেম তালিকায় তৃতীয় বিশ্ব থেকে জায়গা পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি বব মার্লে। ব্রিটিশ মিউজিকের হল অব ফেমেও আছেন তিনি । গ্র্যামিতে পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা।  ২০০৭ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন মৃত তারকাদের উপার্জনের  যে তালিকা করে সেখানে বব মার্লের অবস্থান ১২ তম।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ মে ২০১৭/রুহুল/শাহ মতিন টিপু

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও