ঢাকা, শুক্রবার, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বসির প্রিন্সিপাল: যার ত্যাগ ভোলার নয়

মো. আকতারুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-০২ ১০:২২:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-০৩ ৪:২২:৩৩ পিএম
বসির প্রিন্সিপাল: যার ত্যাগ ভোলার নয়

মো. আকতারুল ইসলাম: ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের গঠন করা শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে এই বাংলায় শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। সেই দুর্বার ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজশাহীতে জীবন বাজি রেখে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের গাড়িতে জুতা ছুঁড়ে মেরে ছাত্রত্ব হারান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা বসির উদ্দিন। এ দেশে ছাত্র আন্দোলনের পথিকৃত বসির উদ্দিন পরবর্তী সময়ে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মাতৃভুমির জন্য তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল। 

বসির উদ্দিন ১৯৪১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বলিষ্ঠ ও সাহসী চেহারার অধিকারী এবং  গ্রামের জোতদার পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহেব হিসেবে পরিচিতি পান।

বসির সাহেব ১৯৫৭ সালে বাঘা উপজেলার কালিদাসখালী হাইস্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করেন। আই এ পাস করেন নাটোর নবাব সিরাজদৌলা কলেজ (এনএস কলেজ) থেকে। এই এনএস কলেজে বিএ পড়ার সময় ১৯৬১-৬২ সালে কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। বিএ পাস করার পরে ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয় নিয়ে মাস্টার্স-এ ভর্তি হন। তখন শরীফ কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে বাংলার মাটিতে ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন বসির উদ্দিন। এসময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব  খান রাজশাহী সফরে গেলে বসির তাঁর গাড়িতে জুতা ছুঁড়ে মারেন। তাকে আটক করা হয়। সে দফায় প্রাণে বেঁচে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব হারান।

জানা যায়, তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার সার্টিফিকেটে লাল কালি দিয়েছেন যাতে তিনি সরকারি চাকুরি কোন দিন না পান। এতে জীবনে বড় ধরণের একটি ধাক্কা খান বসির উদ্দিন কিন্তু দমে যাননি। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকার মানুষদের সংগঠিত করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় চার সন্তান নিয়ে তাঁর স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এতে বড় ধরনের আঘাত পান বসির সাহেব। তাঁর জীবনে নেমে আসে চরম হতাশা। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর সময়ে ৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেয়। ইতোমধ্যে তাঁর সরকারি চাকুরির বয়স শেষ হয়ে যায়।

১৯৭২ সালে আবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে পা রাখেন তিনি। মাস্টার্স পাশ করেন ইংরেজীতে। তিনি পাবনার পাকশি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজে ইংরেজীর শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপরে তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন ঠাকুরগাঁয়ের রহিয়া ডিগ্রি কলেজে। ১৯৭৮ সালে বশির সাহেব অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন রাজশাহী জেলার আড়ানী কলেজে।

আড়ানী কলেজে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হন এবং ১৯৮৪ সালে তাঁকে কলেজ থেকে বিদায় নিতে হয়। বেকার হয়ে পড়ায় তিনি পৈত্রিক ভিটা রঘুনাথপুরে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

স্ত্রী তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। সে সংসারে স্ত্রী ও পাঁচ ছেলে নিয়ে বেকারত্বের কারণে বড় কষ্টে পড়ে যান তিনি।

আড়ানী কলেজের ম্যানেজিং কমিটির বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন কিন্তু মামলার খরচ চালিযে নেওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও মামলা চালিয়ে নিয়েছেন। নিম্ম আদালতে নিজের পক্ষে রায়ও পেয়েছেন। ততদিনে গেছে অনেকগুলো বছর।

জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি ১৯৯১ সালে নাটোর জামহুরিয়া আলীয়া মাদ্রাসায় ইংরেজীর শিক্ষক হিসেবে সামান্য বেতনে চাকরিতে যোগ দেন। জামহুরিয়া মাদ্রাসায় ১০ বছর চাকরি করে অবসর নেন ২০০১ সালে। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে জীবনের শেষ দিকে এসে খুব কষ্টে দিন কাটে বসির সাহেবের।

পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক, ছাত্র আন্দোলনের পথিকৃত, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মনের কাছে পরাজিত হয়ে নিভৃতচারী হয়ে সংসারের বোঝা মাথায় নিয়ে অভাব অনটনে জীবনকে টেনে নিয়ে আসেন ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ পর্যন্ত। মৃত্যুর পর রঘুনাথপুরে পৈত্রিক ভিটায় চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি।

প্রতিবাদী কন্ঠ, এক সময়ের তুখোড় ও ত্যাগী ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, শিক্ষানুরাগী এই সাহেব তার প্রাপ্য মূল্যায়নটুকু পাননি। নিভৃত পল্লী থেকে উঠে আসা এমন শিক্ষাপ্রেমী, ছাত্রনেতা ও সংগঠক আমাদের জন্য অনেক বড় একটি  দৃষ্টান্ত। দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই সাহেবকে নতুন প্রজন্ম স্মরণে রাখবে চিরদিন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: সরকারি কর্মকর্তা।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ এপ্রিল ২০১৯/হাসান/শাহনেওয়াজ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন