ঢাকা, শুক্রবার, ৮ ফাল্গুন ১৪২৬, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বস্তিবাসীর সম্পদ যখন ভক্ষকের পকেটে

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২২ ৯:৪৮:৫১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২৩ ৫:১৯:২৭ পিএম

কিছু প্রবাদ ঘুরে ফিরে সত‌্য হয়ে যায়। এই যেমন রক্ষক যখন ভক্ষক কিংবা সর্ষের ভেতরে ভূত ।‘স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য উন্নত জীবন ব্যবস্থা’ নামের বস্তিবাসীর আবাসন প্রকল্পেও এমনই সত‌্য ধরা দিয়েছে।

প্রায় দেড় লাখ বস্তিবাসীর আবাসন সুবিধা দিতে সরকার স্বপ্নের আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লায় লাখো বস্তিবাসীর স্বপ্ন যাদের হাত ধরে বাস্তবায়ন হবে, সেই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেই উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ।

শুধু অভিযোগ নয়, প্রকল্প পরিচালকসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। যারা দুর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও জাতীয় গৃহায়ণ অধিদপ্তরের সদস্য এ এস এম ফজলুল কবির ও তার স্ত্রী, ফজলুল কবিরের বিশ্বস্ত সহকারী মোস্তফা কামাল ও তার স্ত্রী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ কে এম সামছুদ্দোহার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যে কারণে তাদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দিয়েছে অনুসন্ধান কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান।

শুধু তাই নয়, গৃহায়ণের বরখাস্তকৃত নির্বাহী প্রকৌশলীর মুনিফ আহমেদসহ ওই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ঠিকাদারকে ২০ কোটি টাকা দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। যার অনুসন্ধান চলমান।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘অনুসন্ধানে এস এ এম ফজলুল কবির ও তার স্ত্রীর ৫৮ লাখ টাকার বেশি জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান মিলেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছে। সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছে ফজলুল কবিরের বিশ্বস্ত সহকারী মোস্তফা কামাল ও তার স্ত্রী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ কে এম সামছুদ্দোহার। তাদের ২১ কর্মদিবসের মধ্যে সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে।

রাইজিংবিডির অনুসন্ধানে দেখা যায়, এস এ এম ফজলুল কবির ১৯৮২ সনে বুয়েট থেকে বি এস সি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করে ১৯৮২ সনের বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গণপূর্ত ক্যাডারে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। বর্তমানে গৃহায়ণের সদস্য ফজলুল কবিরের আয়কর নথি পর্যালোচনায় তার নামে ৪৫ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। অনুসন্ধানকালে তার বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস পাওয়া যায় ৮৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা এবং ব্যয় পাওয়া যায় ৫২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে নীট আয় বা সঞ্চয় থাকে ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৯৩ টাকা।  এক্ষেত্রে নীট আয়ের চেয়ে সম্পদ বেশি পাওয়া যায় ১২ লাখ ৬৩ হাজার ৯০৭ টাকা।  যা তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তা ছাড়া তার নামে আরো সম্পদের তথ্য রয়েছে বলে জানা যায়।

অন্যদিকে ফজলুল কবিরের স্ত্রী মিসেস কাশপিয়া শিরীন পেশায় একজন গৃহিণী।  তার নিজ নামে আয়কর নথিতে প্রদর্শিত ব্যবসার পুঁজি, অলঙ্ককারাদি, আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী বাবদ মোট ২৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ পাওয়া যায়।  এ ছাড়া ৩০ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য মিলেছে। সব মিলিয়ে ৫৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ পাওয়া যায়।  আয়কর নথি ও দুদকের কাছে বক্তব্যে তিনি আয়ের উৎস দেখিয়েছেন কনফেকশনারী, চায়নিজ, রকমারী খাবার, বিভিন্ন পিঠা, হালুয়া তৈরি করে প্রতিবেশী ও পরিচিত দোকানে অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করা এবং পরিচিতজনদের রান্না ও ফুল বানানো শেখানো ইত্যাদি।  এর মাধ্যমে তিনি মোট ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকা আয় করেছেন বলে বিভিন্ন করবর্ষের আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করেছেন।  তবে উক্ত ব্যবসার স্বপক্ষে কোনো রেকর্ডপত্র সরবরাহ করতে পারেননি।

দুদকের দাবি স্বামীর অবৈধভাবে উপার্জিত টাকাকে বৈধ করার অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা ঘোষণা দিয়েছেন শিরীন। ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকার বৈধ ও গ্রহণযোগ্য কোনো উৎস নেই বলে স্পষ্টত প্রতীয়মান। অনুসন্ধানে মিসেস কাশপিয়া শিরীনের ব্যয় বাদ দিলে ৪৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।

অন্যদিকে গৃহায়ণে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করে বর্তমানে অফিস সহকারী হিসেবে ভূমি সম্পত্তি ও ব্যবস্থাপনা উইংয়ে দায়িত্ব পালন করছেন মোস্তফা কামাল। তার আয়কর নথি পর্যালোচনায় মোট আয় পাওয়া যায় ৭০ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। কর পরিশোধসহ পারিবারিক ব্যয় বাদ দিলে মো. মোস্তফা কামালে নামে ৬২ লাখ ৮০ হাজার ১৭৯ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ পাওয়া যায়। অনুসন্ধানকালে তার বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস ও ব্যয় বাদ দিয়ে নীট আয়ের চেয়ে সম্পদ বেশি পাওয়া যায় ২৩ লাখ ৬ হাজার ৯৬০ টাকা। যা অবৈধ সম্পদ বলে দুদক মনে করে।

একইভাবে মোস্তফা কামালের স্ত্রীর মিসেস নাসরিন সুলতানা পেশায় একজন গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও তার আয়কর নথি ও দুদকের অনুসন্ধানে ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস পাওয়া যায় ৯ লাখ ও ব্যয় দেড় লাখ টাকার।  সব মিলিয়ে ৪০ লাখ টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভুত অবৈধ সম্পদ বলে প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হয়েছে।  বিবাহের উপহার হিসেবে ৮০ তোলা স্বর্ণেরও উৎস পায়নি দুদক।

এর আগে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ কে এম সামছুদ্দোহার বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় গত সেপ্টেম্বরে তার বিরুদ্ধে সম্পদের নোটিশ জারি করে দুদক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও জাতীয় গৃহায়ণ অধিদপ্তরের সদস্য এ এস এম ফজলুল কবির অভিযোগ অস্বীকার করে রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এমন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বাভাবিক। কারণ বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের অগ্রগতি দেখে অর্থ ছাড় করে। এটি একটি ষড়যন্ত্র বলে আমি মনে করি। আর অবৈধ সম্পদের অভিযোগও ভিত্তিহীন।

নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লায় বাস্তবায়নাধীন চার বছর মেয়াদি ৩০৪ কোটি টাকার প্রকল্পটি এরই মধ্যে পেরিয়েছে তিন বছরের বেশি সময়। অগ্রগতি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। প্রকেল্পর আওতায় তিন জেলার ১৯ কমিউনিটির এক লাখ ২০ হাজার মানুষ পাবে আধুনিক নাগরিক সকল সুবিধা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিকল্পিত এ আবাসন ব্যবস্থা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) বাস্তবায়ন করছে।

অভিযোগের বিষয়ে আরো জানা যায়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সদস্য ফজলুল কবির বিপুল অর্থের বিনিময়ে পদের এক্সটেনশন নিয়েছেন। তিনি সকল টেন্ডার বাণিজ্যের মূল হোতা। সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লা প্রকল্পের একটি অংশ ইতোমধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে। তার সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য সাময়িক বরখাস্তকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী মুনিফ আহমেদ।

অভিযোগ রয়েছে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সিন্ডিকেটের মূল হোতা অ‌্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রবিউল রাশেদ, সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান ও তার ভাই শেখ সোহেলসহ একটি সিন্ডিকেট গৃহায়ণের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে একটি চক্র হয়ে কাজ করেন। এ ছাড়া গৃহায়ণের কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক এ কে এম শামছুদ্দোহা ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল শাহীনের নেতৃত্বে অপর একটি সিন্ডিকেট অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছে।

অভিযোগ ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে জুলাইয়ে ফজলুল কবির, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ কে এম সামছুদ্দোহা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনসুর এবং সিবিএ নেতা মোস্তফা কামাল শাহীনসহ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি টিম।

বস্তিবাসীর আবাসন প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৯ কোটি ৯৩৫ লাখ টাকা আর দাতা সংস্থার সহায়তা থাকছে ২৪৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। মোট পাঁচ হাজার ৭০০ আবাসনের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও সিরাজগঞ্জ পৌরসভায়। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিটি কমিউনিটিতে গড়ে ৩০০ পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া হবে।

আরো পড়ুন- ** আবাসন সুবিধায় বস্তির সোয়া লাখ মানুষ

       ** বস্তিবাসীর স্বপ্নের আবাসন প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া

 

ঢাকা/এম এ রহমান/ইভা