ঢাকা, সোমবার, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বাঁক খেয়েছে বিশ্বকাপ, গায়ে লেগেছে আগুন!

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-২৪ ৪:১৬:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-২৪ ৮:৫৫:২৪ পিএম

২১ জুনের আগে বিশ্বকাপ যে পথে চলছিল, ২১ জুনের পরে আর ঠিক সেই পথে নেই। দারুণ এক বাঁক খেয়ে সে এখন বহুমুখী! সম্ভাব্য যাদের কাছে তার যাওয়ার কথা মোটামুটি নিশ্চিত ধরে নিচ্ছিল বিশ্লেষকদের খুরধার চিন্তা, তাদের এবং অন্যদের- সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে সে। এখন বিশ্বকাপ কেবল ৩ বা ৪ দলের বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন নয়, অন্তত ৭টি দল এখনো আছে তাকে পাওয়ার দৌড়ে। ২১ জুন শুক্রবার একটি মাত্র ম্যাচ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বিশ্বকাপের। ওলট-পালট করে দিয়েছে সব হিসাব-নিকাশ। সেদিন বিশ্ব দেখেছে এবং বুঝেছে- এখনো অনেক রঙ দেখার বাকি এই বিশ্বকাপের।

হট ফেবারিট যে দলকে ভাবা হয়েছিল, ধরে নেয়া হয়েছিল যাদের সেমিতে যাওয়া একরকম ডালভাত, তাদের নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে বিশ্বাসযোগ্য সংশয়! র‌্যাংকিংয়ে একনম্বর, মাঠের লড়াইয়েও দুরন্ত, বিশ্ব আসরের সুবিধাভোগী স্বাগতিক মোড়ল- ইংল্যান্ডকে হট ফেবারিট তো বলাই যায়। বিশেষজ্ঞরা তাদের সেই তকমা দিয়ে নিশ্চয়ই ভুল করেননি। কিন্তু একটা জায়গায় সম্ভবত তারা এবং আমরা সবাই ভুল করছি। সেটা হলো, ক্রিকেটের চরম অনিশ্চয়তার খেলা। বিষয়টিকে কেউ হিসাবের মধ্যে ধরিনি।

ক্রিকেট যে আপাদমস্তক একটা অনিশ্চয়তার খেলা, এখানে যে কখন কী হয় বলা যায় না- সে কথাটা আরেকবার সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো ২১ জুনের শ্রীলংকা-ইংল্যান্ড ম্যাচ। সম্ভাব্য শিরোপা প্রত্যাশী ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়ে বিশ্বকাপটা আরও অনেকের জন্য উন্মুক্ত করে দিলো লংকানরা। সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্ট হওয়ার দৌড়ে এখন ঢুকে পড়েছে শ্রীলংকা নিজেও! আর বিপরীতে ইংল্যান্ডকে ফেলে দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তার মুখে। সেমিফাইনাল ইংল্যান্ড খেলবে কি না তা এখন অনেক হিসাব-নিকাশ, যোগ-বিয়োগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনে যে তিন প্রতিপক্ষ আছে ইংলিশদের, তারা সবাই এই বিশ্বকাপের শিরোপার দাবি নিয়ে ইংল্যান্ড এসেছে। মাঠের লড়াইয়েও এখন পর্যন্ত দুরন্ত তারা। লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দৌর্দণ্ড প্রতাপে। লাসিথ মালিঙ্গার ইয়র্কারে ধাক্কা খাওয়া স্বাগতিকরা এই তিন মোটা দেয়াল টপকাতে পারবে তো?- চারিদিকে এখন সংশয়ের বাতাস। যদি একটাও টপকাতে না পারে তাহলে নিজভূমে আবারো দর্শক হয়ে যেতে হবে ব্রিটিশদের। ছিটকে পড়বে সেমিফাইনালের আগেই। যে শিরোপার দেখা এত বছরেও পায়নি, সেটি আরেকবার মরিচিকা হয়েই রবে তাদের কাছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কিংবা এই ২১ জুনের আগেই বা কে ভেবেছিল- গণেশ এভাবে উল্টে যাবে খোদ স্বাগতিকদের কাছে!

ধারণা করেনি, তবে মনে মনে অনেকে গণেশের এমন একটা পল্টি খাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই দোয়া করেছে! যারা মোটামুটি হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তাদের জন্য এমন কিছু ঘটনা তো দরকার ছিল বিশ্বকাপে। যেমন পাকিস্তান। পাঁচ খেলায় তিন পয়েন্ট নিয়ে যারা আছে তলানির দিকে, সেমির আশা যাদের প্রায় দূরাশা হয়ে যাচ্ছিল- এখন তারাও আশা করে, তারাও স্বপ্ন দেখে সেরা চারের! গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে তাদের ঝুলিতে আরো ২ পয়েন্ট যোগ হয়েছে। মোস্ট আনপ্রেডিক্টেবল এই দলটির হাতে যে কটি ম্যাচ আছে, সবগুলো যদি জিতে যায় সেমির টিকেট কেটে ফেলবে তারা! সেই আপাত অসম্ভব মিশনে শেষ ম্যাচে হারাতে হবে বাংলাদেশকেও। যদি সেরকম কিছু হয় টাইগারদের সেমির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। এই সমীকরণে এমনও হতে পারে শেষ গ্রুপ ম্যাচে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যে যে জিতবে- সেই সেমিফাইনাল খেলবে। সেক্ষেত্রে পাকিস্তানকে আগের তিন ম্যাচ টানা জিততে হবে আর বাংলাদেশকে আফগানিস্তান আর ভারত দুই দলের বিপক্ষেই জিততে হবে।

শ্রীলংকার ইংল্যান্ড-বধের মধ্য দিয়ে উন্মুক্ত হওয়া সেমির লড়াইয়ে শনিবার পর্যন্ত ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজও। ক্রিস গেইলের ঘুমভাঙানো ৮০ আর কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের মহাকাব্যিক সেঞ্চুরিও তাদের ভাগ্যদেবীকে তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে বহু মানুষের হৃদয় জয় করলেও ক্যারিবীয়রা ছিটকে গেছে সেমিফাইনাল রেস থেকে। বিপরীতে কিউইদের ভাগ্য এতই সুপ্রসন্ন যে হারতে হারতেও তারা একের পর এক ম্যাচ জিতে সেমির পথ অনেকটাই পাকাপোক্ত করে নিয়েছে।

২১ জুনের কথা বলছিলাম- এরপর থেকে বিশ্বকাপের গায়ে যেন হঠাৎ আগুন লেগেছে। প্রতিটি ম্যাচ ছড়াচ্ছে বারুদের আগুন! উত্তেজনায় ভরপুর ম্যাচগুলো একবার এদিকে দোলে তো আরেকবার অন্যদিকে! আফগান আর ভারতীয়দের সম্ভাব্য ম্যাড়ম্যাড়ে ম্যাচটার চেহারাই দেখুন না। কী দুর্দান্ত ক্রিকেট হয়েছে সেদিন। ম্যাচটির কোনো এক অংশে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কে জিতবে। ২২৪ রানে শক্তিধর পক্ষকে বেঁধে রেখেও এক পর্যায়ে জয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছিল আফগানরা। কিন্তু তারপরও শেষ ওভার পর্যন্ত তারা ম্যাচে ছিল, আর জয়ের পথে আগুয়ান ছিল। মোহাম্মদ নবীর ব্যাট যেভাবে সেদিন ধারালো তলোয়ার হয়েছিল ভারতভূমে কোহলিদের মুণ্ডপাত হয়ত শুরুই হয়ে গিয়েছিল। অন্তত ৪৮তম ওভার পর্যন্ত জয়ের পাল্লা ভারী ছিল আফগানিস্তানের দিকেই। শেষে এসে টুর্নামেন্টের প্রথম হ্যাটট্রিকটাও উপহার দিলো আগুনে এই ম্যাচ!

ঠিক পরের ম্যাচে কী হয়েছে তা তো সবাই জানি। আগুনে উত্তেজনায় একেবারে ভরপুর একটি ম্যাচ দেখতে পেল উপস্থিত দর্শকরা। স্থানীয় সমর্থকদের মন জয় করে নিল ট্রাজেডির মহা নায়ক কার্লোস ব্র্যাথওয়েট আর তার দল। হেরেও সাধুবাদ পাওয়া যায় যে ম্যাচে, সেই ম্যাচের মাহাত্ম্য কেমন? অসাধারণ, দুর্দান্ত এমন কিছু ম্যাচ টানা উপহার পেল বিশ্বকাপ। বৃষ্টি যে বিশ্বকাপকে একরকম শীতল করে তুলছিল, একচেটিয়া লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠছিল যে টুর্নামেন্ট- তা হঠাৎ করে এমন রূপ পেয়েছে যে, নড়েচড়ে বসেছে গোটা বিশ্ব। পয়েন্ট টেবিলে বিস্তর ওলট-পালটের সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়ে গেছে রাতারাতি। বিশ্বকাপটা এখন লোকে দেখবে, চেখবে আর উপভোগ করবে। এমন বিশ্বকাপই তো সবাই চেয়েছিল।

এখন এই হোঁচট খাওয়া কিংবা বাঁক খাওয়া বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কোথায়, কী হবে মাশরাফিদের সেমিফাইনাল স্বপ্নের, আশা কতটুকু, দূরাশাই বা কী কারণে? এমন সব হিসাব নিকাশে এখন ব্যস্ত তাবৎ পৃথিবীর বাঙালি টাইগার ভক্তরা। ফেসবুকের পাতায় পাতায় ঘুরছে অনেক হিসাবপত্র! সহজ যে হিসাবটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে সেটি হলো- বাকি তিন ম্যাচের সবকটিতে জিততে হবে বাংলাদেশকে। নিতে হবে পূর্ণ ৬ পয়েন্ট। তাহলে ১১ পয়েন্ট নিয়ে সেমির দৌড়ে বেশ ভালভাবেই টিকে থাকবে টাইগাররা। এতে অন্যদের ম্যাচগুলোর কার কী হলো- তা হিসাব করার আর দরকার পড়বে না।

যদি পয়েন্ট একটা কমে, আশাও কমবে সমান তালে। দুই পয়েন্ট কমলে হিসাবে ঢুকে পড়বে অন্যরা। যদি-কিন্তু-তাহলে শব্দগুলো তখন পাখা মেলবে। আশার পালের হাওয়া তখন দুর্বল হয়ে যাবে। হ্যাঁ, নিউজিল্যান্ডের মতো যদি ভাগ্যদেবীকে কোনোভারে তুষ্ট করা যায়, সে যদি আক্রমণের তির সোজা ব্রিটিশদের দিকে তাক করে, আর ব্রিটিশরা যদি তাতে বিদ্ধ হয়- অর্থাৎ বাকি সবগুলো ম্যাচ যদি তারা হারে- তাহলে ৯ পয়েন্ট নিয়েও সেমির পথের যদি-কিন্তুর হিসাবটা নিজেদের পক্ষে নিতে পারবে বাংলাদেশ। ইংল্যান্ড বাদ পড়ে গেলে অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাবে আমাদের সেমি। কিন্তু এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের যে উজ্জ্বল ছবি, যে দুরন্ত ক্রিকেট তারা এখানে খেলছে- তার প্রতি সম্মান রেখে বাকি ম্যাচগুলো জি্তেই সেমিতে যাওয়ার পক্ষে আমি। ভক্ত হিসেবে আমি চাই আমাদের ক্রিকেট তার মাথাটা উঁচু করেই বিজয়ের গৌরব মুকুট পরুক। অন্যের দেয়া উপহার কিংবা কেবল ভাগ্যদেবীর সহায়তায় নয়, খেলেই জয় করুক বিশ্ব। চেষ্টায় যদি নাও হয়, কিছু যায় আসে না; ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো বিশ্ব যেন আমাদের ক্রিকেটকে কুর্ণিশ করে। তারা যেন বলে, বাংলাদেশ অসাধারণ ক্রিকেট খেলেছে, তারা নিজেদের এবং ক্রিকেটের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এই ভাবমূর্তি এই অর্জন যেন অন্তত আমাদের ভাগ্যে জোটে।

লেখক: সাংবাদিক, আরটিভি

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ জুন ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন