ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘বাচ্চারা ভূত বলে দৌড়ে পালায়’

বেলাল রিজভী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১৪ ৭:২৭:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-১৪ ৯:২৩:১৬ পিএম

বেলাল রিজভী, মাদারীপুর : মুখসহ সারা গায়ে ছোটো বড় টিউমার। ডান পায়ে সমস‌্যার কারণে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। দিন দিন বিকৃত হয়ে যাচ্ছে মুখ। খেতে পারেন না। চোখেও কম দেখেন।

আফসোস করে বলেন, ‘ইদানিং আমাকে দেখে বাচ্চারা ভয় পায়। ভূত বলে দৌড়ে পালায়। কেউ আমার সাথে কথা বলে না। এমনকি নিজের সন্তানও কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।’ কথাগুলো বলার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার লামচরী গ্রামে বাড়ি মিলন হাওলাদারের (৪০)। স্ত্রী, ছেলে গোলাম রাব্বানী ও মেয়ে সাদিয়াকে নিয়ে সংসার।  এসব সমস‌্যার কারণে এলোমেলো হয়ে গেছে তার জীবন।

শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মিলন শুরুতে এমনটা ছিলেন না। ১০ বছর বয়সে মাথার উপরে একটি ছোট গুটি দেখা দেয়। তারপর সেই গুটি টিউমারে রূপ নেয়। ৩০ বছর ধরে আস্তে আস্তে সারা শরীরে আগ্রাসন চালায় টিউমারগুলো। এখন চলতে ফিরতেও সমস‌্যা হয়। কৃষিকাজ তার পেশা। শারীরিক এই অবস্থায় কাজ-কর্মও বন্ধ হয়ে গেছে তার। বিভিন্ন সময় স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করালেও অভাবের কারণে উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি।

মিলন বলেন, ‘আমার জীবটা যন্ত্রাময়। এতটা ব্যাথা নিয়ে বাস করা খুব কঠিন। ডান পায়ে সমস্যার কারণে ঠিকমত হাঁটতে পারি না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। হাঁটতে গেলে শরীরটা অনেক ভারী ভারী লাগে। ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চুলকানি। আমাকে দেখে সবাই দূরে সরে যায়। আমার সঙ্গে কেউ কথা বলতে চায় না। ’

তিনি বলেন, ‘এক সময় আমার এ অবস্থা ছিল না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে রোগও বেড়েছে। আজকাল আমার ছেলে গোলাম রাব্বানী আমার সাথে ঠিক মত কথা বলে না। আমি জানি, কেন সে এমন করে। আমি পরিবারের জন্য কিছুই করতে পারছি না। খুব খারাপ লাগে। রাতে চিন্তায় ঘুমাতে পারি না। ’

কাজ ছাড়া বাড়ির বাইরে খুব একটা বের হন না মিলন। নিজেকে সবার কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে চান। তবে পরিবারের জন‌্য তাকে এ অবস্থায়ও কাজে যেতে হয়। রোগের কারণে কাজও জোটে না ইদানিং। এজন‌্য রোগমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে চান দিনমজুর প্রতিবন্ধী মিলন হাওলাদার।

তার স্ত্রী নূরজাহান বলেন, ‘আমার স্বামীর এই বিরল রোগটি দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তার কষ্ট ও যন্ত্রণা আমি কাছ থেকে দেখেছি। অভাবের কারণে চিকিৎসা করাতে পারিনি। বিভিন্ন কবিরাজী ওষুধ খাইয়েছি, কাজ হয়নি। তার উপার্জনেই সংসার চলে। মানুষটা এখন আর কাজ করতে পারে না। উপার্জন ছাড়া সংসার চলবে কী করে?’

শারীরিকভাবে মিলন প্রতিবন্ধী হলেও সরকার প্রদত্ত ভাতা জোটেনি তার কপালে। প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডের জন‌্য বহুবার মেম্বার-চেয়ারম‌্যানের কাছে ছুটে গেছেন। লাভ হয়নি কিছুই। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন এখন। সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হতে চলেছে।

নূরজাহান বলেন, ‘এমনিতেই কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। তারউপরে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডও জোটেনি। আমরা এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’

এদিকে মিলনের শরীরের টিউমার নিয়ে আলাপ হয় কালকিনি হাসপাতালের মেডিক‌্যাল অফিসার (আরএম) মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘ওই রোগী হাসপাতালে এলে পরীক্ষা করে তার রোগ সম্পর্কে বলা সম্ভব হবে। পুরোপুরি না দেখে বা পরীক্ষা না করে কোনো রোগ সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব নয়। রোগটি বিরল কি না সেটাও পরীক্ষা করেই বলা সম্ভব।’

সহজ সরল মিলন ও তার পরিবার রোগটি সম্পর্কে তেমন ধারণা রাখেন না। ডাক্তারও পরীক্ষা না করে কিছু বলতে পারবেন না। কিন্তু অসহায় এই পরিবারটির পাশে কেউ না দাঁড়ালে তারা সাহসে বুক বাঁধতে পারছেন না। টিউমারের যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট মিলন এখন সমাজের হৃদয়বানদের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি বাঁচতে চান। ফিরে পেতে চান স্বাভাবিক জীবন।


রাইজিংবিডি/মাদারীপুর/১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯/বেলাল রিজভী/সনি

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : মাদারীপুর, ঢাকা বিভাগ