ঢাকা     সোমবার   ১০ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৬ ১৪২৭ ||  ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

বাড়ির জন‌্য বন উজাড়

100 || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৮, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯  
বাড়ির জন‌্য বন উজাড়

বনের জায়গা দখল করে অবাধে নির্মাণ করা হচ্ছে ঘর-বাড়ি। এতে বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে, বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে।

বন বিভাগের জায়গায় বাড়ি নির্মাণে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা এবং বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার বিরদ্ধে।

এলাকাবাসী জানান, আজগানা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে মধ‌্যে চিতেশ্বরী, টেকিপাড়া, আজগানা, হাটখোলা, ভেলকার চালা, জয়নারসিট ও বেলতৈল মধ্যপাড়া এলাকায় বনের জায়গায় বাড়ি নির্মাণের প্রবণতা বেশি। গত আট বছরে এসব গ্রামে দুই শতাধিক নতুন বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজনও বাড়ি বানাচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে বন বিভাগের লোকজনের সঙ্গে যোগসাজশে ঘর তোলার সুযোগ করে দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক মীর আব্দুল লতিফ মাহমুদ। একই ধরনের অভিযোগ আজগানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সিকদার ও তার ভাই সাহাদত সিকদারের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আজগানা ইউনিয়নের আজগানা, হাটুভাঙা, কুড়িপাড়া, বেলতৈল ও চিতেশ্বরী এলাকায় বন বিভাগের ২ হাজার ২৯৭ একর জমি আছে। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, ওই ইউনিয়নে বন বিভাগের প্রায় ৬১৭ একর জমি দখল করা হয়েছে। যেখানে আট বছরে নতুন করে দুই শতাধিক বাড়ি করা হয়েছে। এগুলোসহ প্রায় ৪ হাজার বাড়ি দখলকৃত জায়গায় গড়ে উঠেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চিতেশ্বরী এলাকায় আধাপাকা দেয়ালের ঘরসহ গত আট বছরে কমপক্ষে ২০টি বাড়ি নির্মিত হয়েছে। সেখানে নতুন চারটি ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সাহেবের একলা গ্রাম থেকে আসা ফিরুজা বেগম জানান, তিনি স্থানীয় একটি কারখানায় চাকরি করেন। তিন বছর আগে এখানে বাড়ি করেছেন।

তিনি বলেন, ‘সরকারি জায়গায় ফরেস্ট গার্ডরা ঘর তুইল্যা দিছে।’

রৌমারীর ডাঠিয়ারচর গ্রাম থেকে আসা ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম জানান, ইউপি চেয়ারম্যানের সহায়তায় তারা এখানে বাড়ি করেন। বিয়ে করানোর পর ছেলের জন্য নতুন টিনের ঘর বানাচ্ছেন।

টেকিপাড়া এলাকায় আধাপাকা দেয়ালের ঘর নির্মাণ করতে থাকা রৌমারী উপজেলার নটাকান্দি গ্রামের এরশাদুল ইসলামের স্ত্রী ছালমা আক্তার জানান, বন বিভাগের জায়গায় অনেক ঘর আছে। তারাও ঘর তুলেছেন।

উপজেলার রানাশাল গ্রামের প্রয়াত কদ্দুছ সিকদারের স্ত্রী কামরুন্নাহার জানান, তিনি চার বছর আগে বনের জায়গায় বাড়ি করেছেন। এ কাজে তিনি তার চাচাত ভাইয়ের কাছে টাকা দিয়েছেন। তবে চাচাত ভাই কার কাছে টাকা দিয়েছেন, তা জানাননি।

তিনি বলেন, এলাকার চেয়ারম্যান আর মাতাবরেরা সহযোগিতা করে বাড়ি করার সুযোগ করে দিয়েছেন। নতুন করে যারা ঘর তুলছেন তাদের বেশিরভাগই উত্তরাঞ্চলের।

গ্রাম পুলিশ খোরশেদ আলম জানান, পুরো ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ঘর তোলা হয়েছে। এর মধ্যে আজগানাতে বেশি পরিমাণ নতুন ঘর রয়েছে।

আজগানা ও হাটখোলা এলাকায় দেখা গেছে, পাহাড়ের ওপর ও ঢালে টিন ও ইটের দেয়ালের ঘর বানানো হয়েছে।

রফিকুল ইসলামের স্ত্রী সুফিয়া বেগম জানান, বন বিভাগের জায়গায় গত আট বছরে ওই এলাকায় কমপক্ষে ৫০টি বাড়ি হয়েছে। এতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মীর আব্দুল লতিফ মাহমুদ সহযোগিতা করেছেন।

কী কারণে ও কী ধরনের সহযোগিতা করেছেন তা জানতে চাইলে তিনি নীরব থাকেন।

শফিকুল ইসলামের স্ত্রী আছমা বেগম জানান, ঘর তুলতে ফরেস্ট গার্ডসহ অনেকেই টাকা নিয়েছেন।

কী পরিমাণ টাকা নিয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোটা অংকের টাকা নিয়েছে।’

বেলতৈল মধ্যপাড়া এলাকায় গত এক বছরে অন্তত ১৫টি বাড়ি রয়েছে। নতুন ঘর বানাচ্ছেন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সাহেবের একলা গ্রামের জবেদ আলী। তার স্ত্রী রহিমা বেগম জানান, ইউপি চেয়ারম্যানের ভাই সাহাদত সিকদার তাদের সাহায্য করছেন।

মুঠোফোনে সাহাদত সিকদার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি কোনো অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত নই। ফরেস্টার সিরাজুল ইসলামের সময় বিভিন্ন স্থানে বনের জায়গায় ঘর উঠেছে।’ তবে সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

টাকা নিয়ে ঘর তোলার সুযোগ করে দেয়ার বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক মীর আব্দুল লতিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমি কারো কাছ থেকে কোনো টাকা নিইনি এবং বন বিভাগের কাউকে আমার হাত দিয়ে টাকা দিইনি। বনের জায়গায় ঘর তোলার কারণে নিরীহ লোকজনের নামে কিছু মামলা হয়েছিল। আমি তাদের জামিনে ছাড়িয়ে আনতে সহযোগিতা করেছি। এলাকার কিছু খারাপ মানুষ আছে, যারা নেশাগ্রস্ত, মাদক ব্যবসা করে তারা আমার নামে কুৎসা রটিয়েছে।’

আজগানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম সিকদারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় স্পষ্ট কথা বলে থাকি। বন বিভাগের কারো সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এক শ্রেণির দালাল, যারা বন বিভাগের দালালি করে, তারা আমার সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলতে পারে।’

বন বিভাগের হাঁটুভাঙা বিট কার্যালয়ের ফরেস্টার জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বন বিভাগের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ বেআইনি।’

জাহিদ হোসেন এক বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। এ সময়ে নতুন করে কেউ ঘর তোলেনি, দাবি করে তিনি বলেন, ঘর তোলার চেষ্টার অভিযোগে আমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে অন্তত ১০টি মামলা করেছি। আমার কার্যালয়ের কেউ কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।

 

টাঙ্গাইল/শাহরিয়ার সিফাত/রফিক

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়