ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৭ ভাদ্র ১৪২৬, ২২ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘বিজয়ের আনন্দ কখনো ভোলা সম্ভব নয়’

সাইফুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-১২ ২:০৯:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-১২ ২:০৯:২৭ পিএম
‘বিজয়ের আনন্দ কখনো ভোলা সম্ভব নয়’
Walton E-plaza

সাইফুল ইসলাম: একাত্তরে কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রাখার পথে যারা ছিলেন তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধে যোগদান বেশ ভীতিকর ছিল। কারণ তখন তরুণদেরকেই পাকসেনারা খুঁজে বের করত। কোনো বাড়ির ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে শুনলে তারা বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতো। পরিবারের অন্যদের মেরে ফেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করত না। এই ভীতি উপেক্ষা করেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন কান্দাপাড়া গ্রামের স্কুল শিক্ষক কছিমউদ্দিন আহমদের ছেলে আলী আহমদ টুংকু।

১৯৭১ সালে সিরাজগঞ্জের ভিক্টোরিয়া স্কুলের ছাত্র ছিলেন টুংকু। গ্রাম থেকে স্কুলে যেতেন অন্তত চার মাইল পথ হেঁটে দল বেঁধে। গ্রামের বড় ভাইয়েরা বিএ কলেজে ছাত্র রাজনীতি করতেন। প্রায় সবাই ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত। শহরে মিছিল করার প্রয়োজন পড়লেই তারা প্রথমে ঢুকে পড়তেন ভিক্টোরিয়া স্কুলে।  টুংকুরাও প্রস্তুত হয়ে থাকত। মিছিলে যোগ দিতো হৈচৈ করতে করতে। এভাবেই ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি। অসহযোগ আন্দোলনের সময় প্রতিদিন মিছিলে থেকেছেন। ২৫ মার্চের পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্ব। এর আগে, কিশোর-তরুণদের মধ্যে তফাৎ খোঁজার চেষ্টা ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অমুক পারবে, অমুক পারবে না, ওর এখনো বয়স হয়নি- এ ধরনের কথা টুংকুর কাছে বিরক্তিকর মনে হতো। এর মধ্যে বড় ভাই আলী ইমাম দুলু বাড়ি থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলেন। টুংকু তখন উপায় খুঁজতে লাগলেন কী করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া যায়। বললেন এক সিনিয়র ভাইকে।

একদিন পলাশডাঙ্গার সিএনসি সোহরাব আসেন কান্দাপাড়ায়। সেদিন টুংকু গিয়ে দেখা করলেন। কিন্তু বয়স কম বলে সেদিন তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল। টুংকুও নাছোড়বান্দা। সে পিছু ছাড়ল না। সেই সিনিয়র ভাই ইসমাইলের সঙ্গে তিনিও দলের পেছনে পেছনে চলতে লাগলেন। কয়েক গ্রাম পার হওয়ার পর সিএনসির সঙ্গে দেখা হলো তাদের। তখন ইসমাইল বলতে বাধ্য হলেন, টুংকু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পাগল হয়ে গেছে। তাই ওকে রেখে আসতে পারলাম না। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হয়েছিলেন টুংকু। সিএনসির সেকশনেই ঠাঁই দেওয়া হয় তাকে।

প্রশিক্ষণের প্রথম দিনেই গ্রেনেড চালানো শিখতে গিয়ে বিপত্তি। গ্রেনেডের ভিতরের ডেটোনেটরটা লাগানো ছিল, হাতের মুঠোতে ধরা লিভার। বেশি সাবধান হতে গিয়ে স্পিং বা লিভার আলগা হয়ে আঘাত করে ডেটোনেটরে। সঙ্গে সঙ্গে টুংকুর হাত থেকে গ্রেনেডটি কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। ভাগ্য ভালো, গ্রেনেডের পিছনের অংশ লাগানো ছিল না। না হলে টুংকুসহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভীষণ বিপদে পড়তেন। সলঙ্গার রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন করেছেন টুংকু। গভীর রাতে পলাশডাঙ্গার একটি গ্রুপ আক্রমণ করে সলঙ্গার রাজাকার ক্যাম্পে। ক্যাম্পের দরজা ভেঙ্গে ফেলতে জোরে লাথি মারে সহযোদ্ধা শামসুল। দরজা ভেঙ্গে যায়, কিন্তু দরজার পাশেই ছিল এসিডের বোতল। এসিড ছিটে এসে লাগে শামসুলের শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে যায় তার শরীরের বিভিন্ন অংশ। যুদ্ধে বেশ কিছু রাজাকার আটক ও অস্ত্র উদ্ধার হলেও এই দুর্ঘটনা সেদিনের বিজয়ের আনন্দকে ম্লান করে দেয়।

কখনো আক্রমণ করে, কখনো আক্রান্ত হয়ে বয়ে যেতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের দিন। তারা শত্রুর দুর্বল স্থানে আঘাত করার কৌশল নিলেও তাদের ওপর আক্রমণ হতো বেশ জোরে। এমনি এক আক্রমণ ঘটে ১১ নভেম্বর তাড়াশের নওগাঁয়। সেখান থেকে বেড়িয়ে আসতে তাদের যুদ্ধ করতে হয়েছিল ১৮ ঘণ্টা। এরপর তারা নভেম্বরের শেষের দিকে মুক্ত এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারীতে চলে যায়। সেখানেই অন্তত ছয় মাস পর দেখা হয় বড় ভাই আলী ইমাম দুলুর সঙ্গে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে সেখানেই তারা খবর পান পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের। উল্লাসে মেতে ওঠে আপামর জনগণসহ সেখানে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা। সে আনন্দ উল্লাসের কথা কখনো ভোলা সম্ভব নয়।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge