ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, ০২ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বিপ্লবের ফেরিওয়ালা চে গুয়েভারা

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-১৪ ১২:৪৫:৪২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-১৪ ১:৩৩:৫৪ পিএম

রুহুল আমিন : ‘জঘন্য বিপদ জানার পরেও আমায় বিপ্লবের রহস্য বলতে দাও, বিপ্লব সবসময়ই গভীর আবেগ আর ভালোবাসা দ্বারা পরিচালিত হয়, সত্যিকার আবেগ আর ভালোবাসা ছাড়া বিপ্লব অসম্ভব।’

আজ ১৪ জুন, বিপ্লবের ফেরিওয়ালা চে গুয়েভারার জন্মদিন । ১৯২৮ সালের এই দিনে আর্জেন্টিনার রোসারিওতে জন্মগ্রহণ করেন আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। তার পুরো নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না।  এই মহান বিপ্লবীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

জন্মসূত্রে চে গুয়েভারা একজন আর্জেন্টাইন। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে খ্যাতিমান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের অন্যতম । পেশায় ডাক্তার। কিউবান কিংবদন্তী বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর দলে প্রথমে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকে তিনি সারা বিশ্বে রোমান্টিক বিপ্লবীদের একজনে পরিণত হন।লাতিন আমেরিকায় শুরু হওয়া সেই বিপ্লবের ঝাণ্ডার ঝাঁঝ সারা বিশ্বের মানুষকেই ঝাঁকুনি দিয়েছিল।

ছাত্রজীবনে চে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। যা তাকে অসহায় মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুধাবন করার সুযোগ এনে দেয়। চে বুঝতে পারেন ধনী গরিবের এই ব্যবধান ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য বিপ্লব ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তখন থেকে তিনি মার্কসবাদ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এবং সচক্ষে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখার জন্য গুয়াতেমালা ভ্রমণ করেন। তাছাড়া শৈশব থেকেই সমাজের বঞ্চিত, অসহায় ও দরিদ্রদের প্রতি ছিল তার ছিল গভীর মমত্ববোধ। একটি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার পরিবারে বেড়ে উঠবার কারণে খুব অল্প বয়সেই রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন চে। সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা চে-র পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বই, যা চে-কে করে তোলে সমাজ সচেতন। সে সময় তিনি কার্ল মার্কস, উইলিয়াম ফকনার, এমিলিও সরগারির বইয়ের পাশাপাশি আলবার্ট ক্যামাস, ভ্লাদিমির লেনিন, রবার্ট ফ্রস্টের বইও পড়েছেন।

১৯৫৬ সালে মেক্সিকো থাকার সময় ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দেন। ১৯৫৯ সালে ফিদেল কিউবার ক্ষমতা দখল করেন। এই সময় চে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন নিবন্ধ ও বই রচনা করেন।

কিউবার সফলতায় উদ্বুদ্ধ হন চে গুয়েভারা। তিনি ভাবেন ওই রণনীতি ছড়িয়ে দিতে পারলে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে সমগ্র লাতিন আমেরিকায়। এই সময় তিনি বলিভিয়া ও আর্জেন্টিনাকে বেছে নেন। প্রথমে বলিভিয়ায় যান। কিন্তু বলিভিয়াতে থাকার সময় তিনি সি আই এ মদদপুষ্ট বলিভিয়ান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রেনে বেরিয়েন্তোস চে'কে হত্যা করার আদেশ দিলেন। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর, বলিভিয়ার লা হিগুয়েরাত শহরে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ কার্যকর নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। নিরস্ত্র চে'কে গুলি করে হত্যা করতে রাজি হচ্ছিল না সাধারণ সৈনিকরা। অবশেষে হত্যা করার জন্য বেছে নেওয়া হলো মদ্যপ সৈনিক মারিও তেরানকে। কাঁপা কাঁপা হাতে চের পায়ে, বুকে নয়টি গুলি করে বেসামাল সৈনিক শেষ করে দিল  চিরচেনা এক বিপ্লবীকে।

মৃত্যুতে যেন চে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। তার আদর্শ সারা বিশ্বের তরুণ যুবাদের আকৃষ্ট করলো। মৃত্যুর পর তার শৈল্পিক মুখচিত্রটি একটি সর্বজনীন প্রতিসাংস্কৃতিক প্রতীক এবং এক জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিশ্বপ্রতীকে পরিণত হয়। তিনি বিশ্বের শোষিত বঞ্চিত মুক্তিকামী মানুষের নেতা হয়ে উঠলেন। তাইতো কবির কণ্ঠে শুনি, 

চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়-

বলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা
তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর
তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে
নেমে গেছে
শুকনো রক্তের রেখা
চোখ দুটি চেয়ে আছে
সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে আসে অন্য গোলার্ধে
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।  (চে গুয়েভারার প্রতি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

চে গুয়েভারা কিউবান ভাষায় লিখেছেন প্রায় ৭০টি নিবন্ধ। ধারণা করা হয় ছদ্মনামে কিংবা নামহীন অবস্থায় লিখেছেন আরো ২৫টি। এ ছাড়া তিনি লিখে দিয়েছেন পাঁচটি বইয়ের ভূমিকা। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত ভাষণ আর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রায় ২৫০-এর কাছাকাছি। বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে লেখা তার অসংখ্য চিঠির মধ্যে সংগৃহিত আছে ৭০টির মতো। তার লেখালেখি নিয়ে এখন পর্যন্ত বের হয়েছে নয় খণ্ড রচনাবলি। তার মৃত্যুর চার দশক পরেও ‘টাইম’ পত্রিকার বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় তার নাম প্রকাশিত হয়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ জুন ২০১৬/রুহুল/টিপু