ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ কার্তিক ১৪২৬, ২২ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মালয়েশিয়ায় কত অবৈধ অভিবাসী আটক, জানে না হাইকমিশন

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১৫ ৮:০৪:২২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-২২ ১০:০৪:৫৭ পিএম
মালয়েশিয়ায় একটি ইমিগ্রেশন ডিটেনশন ডিপোর প্রিজন ভ্যানে বিভিন্ন দেশের আটক অভিবাসী

হাসান মাহামুদ : অপরাধের কারণে কিংবা অভিযানের সময় আটক হওয়া অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করছে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ। কিন্তু এসব আটক অভিবাসীর মধ্যে কতজন বাংলাদেশি রয়েছেন তা জানে না দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন। ফলে তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়া আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছে। এরইমধ্যে অবৈধ অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় নিজ নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য ‘ব্যাক ফর গুড বা বিফরজি’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। যারা এই ‍সুযোগ নেননি কিংবা সুযোগ নেয়ার আগেই কোনো না কোনোভাবে আটক হয়েছেন, অভিবাসন বিভাগ নিজেরাই তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে।

মালয়েশিয়া অভিবাসন বিভাগ নিয়মিতই অবৈধ অভিবাসী আটকের জন্য অভিযান চালায়। ২০১৮ সালে এই বিভাগ ৪১ হাজার ১৮ অবৈধ অভিবাসীকে আটক করে। তাদের মধ্যে ৮ হাজার ৭৪৮ বাংলাদেশি ছিলেন। তাদের সবাইকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৬৬৪ জনকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি ৮ হাজার ৫৬ জন। কিন্তু কূটনৈতিক সূত্র বলছে, দেশটিতে আটক বাংলাদেশির সংখ‌্যা উল্লিখিত সংখ‌্যার থেকে অনেক বেশি।

এর বাইরে গুরুতর অপরাধের কারণে দেশটির অভিবাসন বিভাগ আটককৃতদের মধ্যে ৯ হাজার ৫৩২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে। তাদের সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে কিংবা নিজেদের বা হাইকমিশনের উদ্যোগে প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে- সাজাপ্রাপ্ত এসব অভিবাসীর মধ্যে কতজন বাংলাদেশি রয়েছেন তাও জানা যায়নি এখনো।

এদের অধিকাংশই মালয়েশিয়ার ১৪টি ইমিগ্রেশন ডিটেনশন ডিপোতে আটক রয়েছেন। জানা গেছে, দেশটির নিয়ম মোতাবেক ইমিগ্রেশন ডিপোতে আটক এসব অবৈধ অভিবাসীর এক থেকে দুই মাসের জন্য সেখানে রাখা হয়। সেখান থেকে তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে তাদের কূটনৈতিক মিশন (দূতাবাস) দ্বারা পরিচয় ও আনুষাঙ্গিক কার্যাদি সম্পন্ন শেষে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। আর যাদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়, তারা কারাগার ও ক্যাম্পে বন্দি থাকে।

আটক বাংলাদেশিদের সংখ্যার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের অভিযানে আটকদের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে কোনো না কোনো অপরাধে আটক বাংলাদেশির সংখ্যাও খুব একটা কম নয়। কিন্তু কাগজপত্র না থাকায় আটককৃতদের বিষয়ে খুব সহজেই জানা যায় না। এজন্য হাইকমিশনের অনেক সময় কিছু করারও থাকে না।

মালয়েশিয়া অভিবাসন বিভাগ থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের দেয়া তথ্যের ‍ওপরই তাই বেশিরভাগ সময় নির্ভর করতে হয়। তবে বাংলাদেশি কমিউনিটিগুলো মাঝে মাঝেই এ বিষয়ে হাইকমিশনের বিরুদ্ধে ‘সহযোগিতা না করা’র অভিযোগ তোলেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় ১২ হাজার ৪৪৮টি অভিযান চালায় দেশটির অভিবাসন বিভাগ। এসব অভিযানে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭৭ জন বিদেশি নাগরিকের নথিপত্র যাচাই করা হয়। বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে এদের মধ্য থেকে ৩৬ হাজার ৬৬৪ জনকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আটক করা হয়। এ সময়ে অবৈধ অভিবাসীদের চাকরি দেয়া অথবা তাদেরকে সহায়তা করায় ৯২২ জন চাকরিদাতাকেও আটক করা হয়।

আটককৃতদের মধ্যে ১২ হাজার ১৪২ জন ইন্দোনেশিয়ার, ৮ হাজার ৫৬ জন বাংলাদেশের, ৩ হাজার ৬৩৫ জন মিয়ানমারের, ৩ হাজার ১৪৯ জন ফিলিপাইনের, ২ হাজার ১২৭ জন থাইল‌্যান্ডের, ২ হাজার ৬ জন ভারতের, ১ হাজার ৪৩৬ জন পাকিস্তানের, ১ হাজার ৩১৩ জন ভিয়েতনামের,  ৮০০ জন চীনের, ৭৬৫ জন নেপালের এবং ১ হাজার ২১৫ জনসহ অন্যান্য দেশের নাগরিক বলে জানা গেছে। এদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইন, ১৯৫৯-এর ধারা ৬ (১) সি/১৫ (১) সি এবং পাসপোর্ট আইন, ১৯৬৬-এর ১২ (১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এরই মধ্যে বিদেশি অভিবাসী যার যার দেশে ফেরত গেছেন বা পাঠানো হয়েছে। তবে গুরুতর অপরাধে ৯ হাজার ৫৩২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে অভিবাসন বিভাগ। এসব বন্দি সাজা শেষে দেশে ফেরত যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। 

জানা গেছে, প্রতি বছরই মালয়েশিয়া সরকার আটক অবৈধ অভিবাসীদের একটি নির্দিষ্ট সময় আটক রাখার পর নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠায়। চলতি বছরেও আটকদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হবে। এর মধ্যে দেশটির বুকিত জলিল, কুয়ালালামপুর, কেলআইএ, সেপাং, লেংগিং, নেগরি সেমবিলান, জুরু ও পুলাউ পেনাং ডিপো থেকে কিছু অভিবাসীকে দ্রুত যার যার দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম শাখার প্রথম সচিব হেদায়েতুল ইসলাম মন্ডল অনলাইনে রাইজিংবিডিকে বলেন, বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে মালয়েশিয়ার প্রতিটি ক্যাম্প পরিদর্শন করা হয়েছে। তাদের বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব যাচাই এবং শনাক্ত করার কাজ প্রক্রিয়াধীন। পাশাপাশি প্রত্যেকটি ক্যাম্পে কতজন বাংলাদেশি আটক রয়েছে তাদের তালিকা দ্রুত মিশনে পাঠাতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রক্রিয়াগত কারণে পুরো সংখ্যা জানতে কিছু দিন সময় লাগবে।

হেদায়েতুল ইসলাম মন্ডল আরো জানান, অনেক সময় দেখা যায়, একটি ক্যাম্প থেকে তালিকা দিতে এক থেকে দুই সপ্তাহ বিলম্ব হওয়ায় দূতাবাস থেকে ট্রাভেল পাস ইস্যু করতে সমস্যা হয়। আবার ক্যাম্প থেকে তালিকা পাঠানো হলেও ব্যক্তির ফরম থাকে না। পরে ক্যাম্পে যোগাযোগ করে তা নিয়ে আসতে হয়।

বন্দিশিবিরে যারা আটক আছেন, তাদেরকে দ্রুত দেশে পাঠানোর সব রকম ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, ভাগ্য ফেরানোর আশায়, দালালদের প্রলোভনে পরিবারের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের অনেক যুবক লুফে নেন স্বল্প খরচে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ। কিন্তু অবৈধভাবে দেশটিতে এসে তাদের অনেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হন।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও সেবা অধিশাখা) মো. সারোয়ার আলম রাইজিংবিডিকে বলেন, দালালদের মাধ্যমে অনেকেই মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। আমরা সব সময়ই বিষয়টিকে অনুৎসাহিত করছি। কিন্তু অবৈধভাবে বিদেশগমন বন্ধ করা যাচ্ছে না এখনো।  এসব ক্ষেত্রে দূতাবাস বা মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের তথ্য থাকার সুযোগ নেই। তাই অনেক সময় খুব প্রয়োজন হলেও তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা বা সহযোগিতা নিতে পারেন না।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯/হাসান/রফিক

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন