ঢাকা     শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৩ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

মিথ্যা যৌতুকের মামলা বন্ধ হোক

272 || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২২, ২১ জানুয়ারি ২০১৯  

রিয়াজুল হক : মাহবুব (ছদ্মনাম) পেশায় পুলিশ কনস্টেবল। বাবা-মায়ের বড় সন্তান এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মায়ের অসুস্থতার জন্য ছেলেকে বিয়ে করানো হয় এইচএসসি পাশ সুলতানার (ছদ্মনাম) সাথে। বিয়ের পূর্বে ছেলে পক্ষকে কিছু জানানো না হলেও বিয়ের পরে মাহবুব যখন শ্বশুর বাড়ি যায়, তখন সে জানতে পারে তার সদ্য বিবাহিত বউ একাদশ শ্রেণীতে থাকাকালে এক সহপাঠীর সঙ্গে ঘর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

এক মাস পর পরিবার যখন পালিয়ে যাওয়া সুলতানার সন্ধান পায় তখন বরিশাল থেকে খুলনায় নিয়ে আসে। আর খুঁজতে থাকে সরকারী চাকরি করা কোন ছেলে। অবশেষে মাহবুবের সাথে সুলতানার বিয়ে হয় এবং সুলতানার প্রেমঘটিত কাণ্ড বিয়ের পূর্বে সম্পূর্ণ গোপণ রাখা হয়। বিয়ের দুই দিন পর শ্বশুর বাড়ি যেয়ে ফুপা শ্বশুরের কাছ থেকে মাহবুব যখন তার বউয়ের পুরানো ঘটনা জানতে পারে, তখনই ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এইবার সুলতানার বাবার আসল চেহারা ধরা পড়ল। তিনি মাহবুবকে জানিয়ে দেন, যদি সে সুলতানাকে ডিভোর্স দেয়ার চিন্তা করে তবে যৌতুকের মামলা দেওয়া হবে। মিথ্যা যৌতুকের মামলার ভয়ে মাহবুব সব কিছু মেনে নিয়ে সংসার করে চলেছে। কারণ সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বল্প বেতনে চাকুরে মাহবুব ভালো করেই জানে, মামলা হলেই চাকরি থেকে বরখাস্ত হতে হবে।

খ) সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে ফিরোজ ( ছদ্মনাম)। ঢাকায় একটি নামকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি পেয়ে যায়। চাকরির প্রয়োজনে জেলা শহর থেকে তাকে ঢাকায় আসতে হয়। অপরিচিত শহরে এসে মোবাইলের কল্যাণে পরিচয় হয় আরিফার ( ছদ্মনাম) সাথে। পরিচয় হবার অল্প কিছুদিনের মধ্যে তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। দুই পরিবারের কারও কোন অমত ছিল না। আরিফা ঢাকার একটি কলেজ থেকে মাষ্টার্স পাস করেছে। উচ্চ শিক্ষার জন্য আরিফা এইচ.এস.সি পাশ করার পর ঢাকায় আসে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, আরিফার বাবা একজন বর্গাচাষী কৃষক এবং পারিবারিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল না।

আরিফা ঢাকা আসার পর টিউশুনি করেই তার যাবতীয় খরচ বহন করত। ফিরোজ বিয়ের আগে থেকেই আরিফার পারিবারিক আবস্থা জানত। কিন্তু ফিরোজ কিংবা তার বাবা-মায়ের আরিফাদের পারিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে সমস্যা ছিল না। কিন্তু বিয়ের কয়েকদিন পর ফিরোজ তার এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানতে পারে, আরিফা প্রতিদিন দশটার দিকে বের হয়ে যায় এবং আসে প্রায় চারটার দিকে। বিষয়টা প্রথম দিকে আমলে না নিলেও ফিরোজ একদিন আরিফাকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বাইরে যাবার কারণ জানতে চায়। আরিফার একা বাসায় থাকতে ভালো লাগে না, ভয় করে ইত্যাদি কারণে বান্ধবীর বাসায় যায় বলে ফিরোজকে জানায়। বিয়ের আগে থেকেই ফিরোজের চিন্তা ছিল, তার বাবা-মাকে ঢাকায় নিয়ে আসবে। আরিফার সমস্যার কথা চিন্তা করে আর দেরি করল না। কিন্তু বিধি বাম। আরিফার বাইরে যাওয়া বন্ধ হয় না।

এই নিয়ে আরিফাকে অনেক কথা বলার পরেও কোন কাজ হয়নি। পরে জানতে পারে অন্য এক ছেলের সাথে আরিফার পরকীয়ার কথা। ফিরোজ তালাকের সিদ্ধান্ত নেয়। আরিফার আত্মীয় স্বজন আসে সালিশ করতে। একই সাথে যৌতুক, নারী নির্যাতন মামলার ভয়ও দিয়ে যায়। আরিফা আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। সবকিছুর চাপ নিতে না পেরে ফিরোজ চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের জেলায় চলে আসে এবং তালাক পত্র পাঠিয়ে দেয়। আরিফার পরিবার দেরি না করে প্রায় পাঁচশত কিলোমিটার দূরে নিজ জেলার আদালতে ফিরোজের নামে যৌতুকের নামে মামলা দায়ের করে।

১৯৮০ সালে আইনগতভাবে যৌতুক নিষিদ্ধ করা হয় এবং যৌতুকের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয় নিম্নোক্তভাবে- (ক) কোন এক পক্ষ কর্তৃক অপর পক্ষকে, অথবা (খ) বিবাহের কোন এক পক্ষের পিতামাতা অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক অন্য কোন পক্ষকে বা অন্য কোন ব্যক্তিকে বিবাহের মজলিসে বা বিবাহের পূর্বে বা পরে যে কোন সময়ে বিবাহের পণরূপে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রদানে অঙ্গিকারাবদ্ধ যে কোন সম্পত্তি বা জামানত। (যৌতুক নিষিদ্ধকরণ ১৯৮০, আইন নং-০৫)। যৌতুক নেয়ার জন্য শাস্তি হবে ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা জরিমানা। সম্প্রতি যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এই খসড়া আইনে জরিমানা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি যৌতুক নেওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করবে তাদেরও একই রকম শাস্তি হবে এবং যে ব্যক্তি যৌতুক দাবি করবে তারও একই রকম শাস্তি হবে।

কিন্তু যৌতুক না দাবি করেও যদি কাউকে যৌতুকের মামলার মুখোমুখি হতে হয়, তবে মিথ্যা মামলাকারীর জন্য বিগত সময়ে কোন শাস্তির বিধান ছিল না। সম্প্রতি যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮’ এর খসড়া অনুযায়ী, যৌতুক নিয়ে মিথ্যা মামলা করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এটা অবশ্যই ভালো একটা দিক। অন্যায়ের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত।

অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। প্রকাশিত তথ্য মতে, টেলিফোনে কথা হচ্ছিল তিরিশের শেষের কোঠায় বয়স এমন একজন ব্যক্তির সাথে। কয়েক বছর আগের ঘটনা বলছিলেন তিনি। প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন। শ্বশুর বাড়ির লোকজন বেশ কিছুদিন পর সে বিয়ে মেনেও নিয়েছিলো। কিন্তু কিছুদিন পর স্ত্রীর পরিবারের এক আত্মীয়র সাথে জমিজমা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পরেন। আর সেটি হয়ে ওঠে পুরো পরিবারের সাথে বিবাদ। এমনকি স্ত্রীর সাথেও শুরু হয় সমস্যা। তিনি বলছিলেন, ‘তারা আমার বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা করেছিল। সেই মামলায় আমি একমাস কাস্টডিতে ছিলাম। সেই মামলায় আমি অব্যাহতি পাই। এরপর তারা আবার মামলা করে নারী নির্যাতনের। সেটি তদন্তের পর আদালত আমাকে খালাস দেয়। আদালতে মামলা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।’

প্রতিটা অন্যায়ের জন্য আইন থাকা উচিত। বিচার থাকা উচিত। যৌতুকের জন্য শাস্তির বিষয়ে কারও কোন দ্বিমত নেই। প্রয়োজনবোধে এই শাস্তির মেয়াদ আরও বাড়ানো যেতে পারে। যৌতুক সামাজিক অপরাধ। এর বিস্তার সমূলে উৎপাটন করতে হবে। কিন্তু কেউ যেন এটাকে হাতিয়ার বানিয়ে অন্যের ওপর অন্যায়ভাবে ব্যবহার করতে না পারে, সেটা খেয়াল রাখার দায়িত্ব কার? প্রকাশিত তথ্য মতে, নারী নির্যাতনের ৮০ শতাংশেরই কোন প্রমাণ মেলে না। মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে আসামিকে জেলে থাকতে হয়, না হয় অনেকে পালিয়ে থাকে। জামিন কঠিন হওয়ায় অনেকে এটি অপব্যবহার করেন। খুব দ্রুততম সময় এই মামলায় হয়রানি করার একটা সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে পুলিশের দেওয়া হিসেবে ২০১৭ সালে দেশব্যাপী ১৫ হাজারের কিছু বেশি নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে। যারমধ্যে প্রায় চার হাজার মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্তে ঘটনার কোন প্রমাণ পায়নি বলে মামলা বিচার পর্যন্ত গড়ায়নি।

মিথ্যা যৌতুকের নামে নারী যদি পুরুষের নামে মামলা করে এবং সেই মামলা যদি পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে সেক্ষেত্রে কঠিন আইন থাকা প্রয়োজন বিবেচনা করেই ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। যৌতুকের জন্য মামলা হলে একজন মানুষকে সমাজের সামনে কতটা হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়, সেটা একমাত্র ভুক্তভোগীই ভালো বলতে পারবে। মিথ্যা যৌতুকের মামলায় যদি শাস্তি পেতে হয় কিংবা ভোগান্তির স্বীকার হতে হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিছু মানুষ (পুরুষ নারী নির্বিশেষে) সবসময় ছিল, আছে এবং থাকবে যারা সুযোগের অপব্যবহার করেছে, করে এবং করবে। তাহলে ভুক্তভোগীদের জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা কি? দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধীর তকমা লাগিয়ে দেয়া কিংবা সমাজের চোখে ছোট করে দেয়া, আদৌ কাম্য হতে পারে না।

লেখক: উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ জানুয়ারি ২০১৯/হাসান/এনএ

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়