ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

মুহূর্তেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে আবরার হত্যার বর্ণনা

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০১ ১০:৪৯:৪১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-০২ ৭:৩৫:৫৮ পিএম

আবরারের লাশ যখন সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তখনই বুয়েটের ১৭তম ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী এক সঙ্গে ফেসবুকে নিজেদের কয়েকটি গ্রুপে স্ট্যাটাস দেয়। এতে ঘটনার বিবরণ ও করণীয় সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়।

আর এ স্ট্যাটাসের জন‌্য শিক্ষার্থীরা সকাল হতেই আবরারের হলের সামনে জড়ো হতে থাকে। মূলত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির কারণেই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ব্যর্থ হন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সাংবাদিকরা জানার আগেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে আবরার হত্যার বর্ণনা।

আবরার হত্যা মামলায় পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে এমনটাই জানিয়েছেন বুয়েট কেমিক্যাল বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইয়ামিন হোসেন। তিনি এ মামলার একজন সাক্ষী।

ইয়ামিন হোসেন পুলিশকে বলেন, ওই দিন রাত ৩টা পর্যন্ত পড়ছিলাম। রাত ৩টার পর আমার রুমের একজন বাইরে বের হয়ে পাশের রুম ১০১১ থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পায়। ও সাথে সাথে আমাকে ডাকে। পরে আমরা দুইজন পাশের রুমে গিয়ে সৈকত, রাফি আর মিজান ভাইকে অস্বাভাবিকভাবে কান্না করতে দেখি। আমি জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে। মিজান ভাই বলেন, আবরার মারা গেছে। আমি শুনে অবাক হয়ে যাই। পরে বলে, ছাত্রলীগের কয়েকজন নাকি ওকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আমি জিজ্ঞেস করি, লাশ কোথায়? বলে বারান্দায় গেটের ওখানে স্ট্রেচারে রাখা আছে। আমি বারান্দায় বের হয়ে লাশ দেখতে পাই।

তখন রুমে এসে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করি এবং আমার রুমের ঘুমন্ত আরো দুইজনকে ডেকে তুলি। ওদের নিয়ে বাইরে বের হয়ে যায়। তখন দেখি, লাশের পাশে বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি জামিউস সামি, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ শেরে বাংলা হলের অনেক নেতা-কর্মী রয়েছে যারা আমাদের সাধারণ স্টুডেন্টদের ওখানে না যাওয়ার জন্য ইশারায় নির্দেশ দিতে থাকে। ওই সময় পুলিশ, প্রভোস্টসহ আরো কয়েকজন ওখানে ছিল।

ইয়ামিন হোসেন আরো বলেন, আমরা সহকারী প্রভোস্ট ইফতেখার স্যারকে আমার রুমে দিকে আসতে দেখে তাকে বলি, এটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে না। স্যার তখন আমাদের বলেন, তোমরা হচ্ছো ১৭তম ব্যাচ, সেই হিসেবে তোমাদের উচিত কিছু একটা করা। তখন আমরা বিভিন্ন তলায় গিয়ে আমাদের ব্যাচের অন্য সবাইকে ডেকে নিয়ে নিচে আসি। তারপর আমরা সবাই ২০১১ নম্বর রুমে অবস্থান করে স্যারদের ওই রুমে ডাকি। যেহেতু ছাত্রলীগ আমাদের ওইখানে যেতে দিচ্ছিল না। স্যাররা আসার সময় মেহেদী হাসান রাসেলও পেছনে পেছনে আসতে থাকে। পরে স্যারদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাসেল রুমে প্রবেশ করতে চাইলে ইফতেখার স্যার দরজা বন্ধ করে দেন। আমরা কথা বলার এক পর্যায়ে রাসেল জানালা দিয়ে দরজা খুলে জোরপূর্বক রুমে প্রবেশ করে। কিছু পেপারে সাইন করতে হবে বলে স্যারদের রুম থেকে নিয়ে যায়।

ইয়ামিন জানায়, আবরারের লাশ বারান্দা থেকে ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন ১৭তম ব্যাচের সাধারণ স্টুডেন্টরা আমার রুমে আসে।  আমাদের ধারণা ছিল, এই ঘটনাটি ছাত্রলীগ হয়তো বা কোনোভাবে ধামাচাপা দিতে পারে। কারণ এর আগেও ছোট খাটো কিছু ঘটনা তারা  ধামাচাপা দিয়েছে। তাই আমরা পরিকল্পনা করি, এটা ফেসবুকে আমাদের বুয়েটের বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করব। তবে এক্ষেত্রে যদি কোনো একজন পোস্ট করি, তাহলে হয়তো বা পরে তাকে ছাত্রলীগের সবাই ধরতে পারে। আমরা সবাই পরিকল্পনা করি, আমরা একই স্ট্যাটাস একই সময়ে   বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করব। আমাদের পোস্টগুলো পড়ে অন্যান্য হলের ছাত্ররা আসতে থাকে এবং ভিড় বাড়তে থাকে। তখন আমরা সবাই প্রভোস্ট স্যারের রুমের সামনে অবস্থান করি। প্রশাসনের লোকজনদের কাছে দাবি করি, সিসিটিভি ফুটেজের একটা কপি দেয়ার। পরে বিকেলের দিকে আমাদের সাধারণ স্টুডেন্টদের মধ্যে থেকে সাত আটজনের জনের একটা টিম হল অফিসে প্রবেশ করি এবং ভিডিও ফুটেজ দেখি।

প্রসঙ্গত, গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরে বাংলা হলের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি থেকে অচেতন অবস্থায় আবরার ফাহাদকে উদ্ধার করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই রাতে আবরার ফাহাদকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পিটিয়ে হত‌্যা করে।

 

ঢাকা/মামুন খান/ইভা

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও