ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

যেভাবে প্রতিশোধ নেবে ইরান

শাহেদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০৪ ৯:১৬:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-০৫ ৮:৪৯:৫৯ এএম

২০০৮ সালে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের সাবেক প্রধান জেনারেল ডেভিড পেট্রাউসকে মার্কিন হামলায় নিহত ইরানের কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল সোলাইমানি লিখেছিলেন, ‘প্রিয় জেনারেল পেট্রাউস, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমি কাসিম সোলাইমানি ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, গাজা ও আফগানিস্তান বিষয়ে ইরানের নীতি নির্ধারণ করি। এর পরও বাগদাদে নিয়োজিত রাষ্ট্রদূত কুদস বাহিনীর সদস্য। তাকে যে পরিবর্তন করবে সেও কুদস বাহিনীর সদস্য’।

ইরানের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জেনারেল সোলাইমানি কতোটা প্রভাবশালী ছিলেন তা বুঝতে পেট্রাউসকে লেখা চিঠির এই কয়েকটি লাইনই যথেষ্ঠ। এতো গেল প্রভাবের কথা। তার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা যে বাহিনীর সদস্যদের কতোটা বেশি ছিল তা সোলাইমানির অনুগত কমান্ডারদের মন্তব্যে বোঝা যায়। তাদের ভাষ্য, কুদস বাহিনীর প্রধান সিরিয়ায় তার বাহিনীর জন্য যে কোনো অবস্থায় ঝুঁকি নিতেন। প্রতি মুহূর্তেই তিনি মৃত্যুকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত থাকতেন। আর কিছু না হোক অন্তত তার এই প্রচন্ড সাহসিকতার জন্য সোলাইমানিকে সবাই ভালোবাসতো।

অন্যতম প্রভাবশালী এই সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে ইরান। সেটা যে ‘ভয়াবহ’ হবে তা দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি জানিয়ে দিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন একটাই প্রশ্ন-কী হবে ইরানের সেই ‘ভয়াবহ প্রতিশোধ’?

ইরান বিপ্লবের পর দেখা গেছে, পশ্চিমাদের সঙ্গে সরাসারি কোনো সংঘাতে জড়ায়নি তেহরান। বরাবরই ইরান তার পোষা আঞ্চলিক বাহিনীগুলো দিয়ে তার শত্রুদের ওপর হামলা চালিয়ে গেছে। এবারও হয়তো ইরান সে ধরনের কিছু করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

নিজস্ব বাহিনী ছাড়াও ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে রেভ্যুলুশনারি গার্ডের সহযোগী বাহিনী রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও মিত্রদের ওপর কীভাবে হামলা চালানো যায়, সেই নির্দেশনা হয়তো ইতোমধ্যে তারা পেয়ে গেছে। শক্তিধর সেনাবাহিনীর মোকাবেলায় আচমকা হামলা বা গেরিলা হামলার ক্ষেত্রে ইরান রীতিমতো প্রশিক্ষক। তার নজির ইয়েমেন ও সিরিয়ায় আমরা দেখতে পাই। পাঁচ বছর ধরে চলা ইয়েমেনের যুদ্ধে আজও ইরান সমর্থিত হুতিদের হাতে নাকানি-চুবানি খেয়ে চলছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।

১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন দূতাবাসের সামনে এক আত্মঘাতী হামলাকারী ট্রাকবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে নিহত হয় ৩২ জন, যাদের অধিকাশংই ছিল সিআইয়ের গোয়েন্দা। এই হামলা চালিয়েছিল হিজবুল্লাহর অঙ্গসংগঠন ইসলামিক জিহাদ। ১৯৯৬ সালের জুনে সৌদি আরবের খোবার টাওয়ারে বোমা হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় নিহত হয় মার্কিন বিমান  বাহিনীর ১৯ সদস্য। পরবর্তীতে এর জন্য দায়ী করা হয়  ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ আল হেজাজ গ্রুপকে। গত সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের দুটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালায়। এর ফলে সৌদি আরবকে প্রায় এক সপ্তাহ তেল উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। এই হামলার জন্য তেহরানকে দায়ী করে রিয়াদ। এর আগে জুনে ওমান উপসাগরে সৌদি আরবের তেলবাহী দুটি ট্যাংকারে হামলা চালায় হুতিরা। এ ঘটনার জন্য  ইরানকে দায়ী করেছে সৌদি আরব।

গত মাসে ইরাকে কুদস বাহিনী সমর্থিত কাতাইব হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়েছিল। এর জের ধরে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ঘিরে বিক্ষোভ করে শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকরা। দূতাবাসের ভেতরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ সবই করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য শেষ পর্যন্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাস কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়। এর পেছনে যে সোলাইমানির কুদস বাহিনীর মদদ ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তা ঘোষণাই দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নীতি বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ চার্লস লিস্টার বলেন, ‘উপসাগারীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র বিশেষ করে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ইরানের বিপ্লবী বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। কাতারের আল ইউদেইদে মার্কিন ঘাঁটিও হতে পারে’।

তার মতে, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে সিরিয়ায় মোতায়েন করা মার্কিন সেনারা। ইরান সমর্থিত ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটের কাছ থেকে মার্কিন সেনাদের অবস্থান মাত্র কয়েক মাইল। ট্রাম্পের বিশ্বাসঘাতকমূলক আচরণের কারণে ইতোমধ্যে কুর্দিরাও মার্কিনিদের ওপর ক্ষুব্ধ। এই সুযোগে মিত্রহীন মার্কিন সেনাদের ওপর মরণ আঘাত হানা ইরানের জন্য জটিল কিছু নয়।

অস্ত্রের ঝনঝাানিতে না যেয়ে সাইবার হামলার দিকেও যেতে পারে ইরান। ২০১০ সালের পর দেশটি তার সাইবার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এর আগে কয়েক বার যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ইরান সাইবার হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ আছে।

সোলেমানির মৃত্যু নিঃসন্দেহে ইরানের জন্য বড় ক্ষতি। তবে তার এই মৃত্যু ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয়ে আরো উদ্দীপ্ত করবে। সেই সুবাদে যুদ্ধ যে আসছে, তা নিশ্চিত। তবে এখন দেখার পালা-কবে, কখন, কীভাবে বাঁধতে যাচ্ছে সেই যুদ্ধ।


ঢাকা/শাহেদ

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও