ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

যেসব খাবার গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায় (শেষ পর্ব)

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১০ ৮:৩৭:০৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-১০ ৮:৩৭:০৩ পিএম
প্রতীকী ছবি

এস এম গল্প ইকবাল : অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, ডায়েট বা খাবার কি সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা (ফার্টিলিটি) বৃদ্ধি করতে পারে? বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল বলছে যে, কিছু খাবার নারী বা পুরুষের ফার্টিলিটি বাড়াতে পারে। কিন্তু আপনাকে সামগ্রিক ডায়েটে নজর রাখতে হবে। গবেষকরা পেয়েছেন যে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ফার্টিলিটি হ্রাস করতে পারে। শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে যে, একজন মানুষের ওজন তার ফার্টিলিটির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত ওজন ও অতি কম ওজন উভয়েই সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা কমিয়ে ফেলতে পারে।

যেসব খাবার গর্ভধারণের সম্ভাবনা অথবা সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাদেরকে ফার্টিলিটি সুপারফুড বলে। এসব খাবারের কোনো একটি আপনার বন্ধ্যাত্ব দূর করবে এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না। আপনার গর্ভধারণে সমস্যা হলে আপনার ডায়েটে ফার্টিলিটি সুপারফুড অন্তর্ভুক্ত করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে।

কিছু পুষ্টি নারী-পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, কিন্তু আমাদের ডায়েটের ওপর ভিত্তি করে এসব প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই সন্তান নিতে ইচ্ছুক দম্পতিদেরকে ডায়েটের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। পুষ্টির কনসেন্ট্রেড সাপ্লিমেন্ট সেবনের চেয়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া নিরাপদ। কিন্তু ফলিক অ্যাসিডের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়- অধিকাংশ চিকিৎসক গর্ভধারণের চেষ্টাকালে ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট সেবনের পরামর্শ দেন।

ফার্টিলিটি সুপারফুড কেবলমাত্র প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্যই সহায়ক নয়, এসব খাবার শরীরের অন্যান্য উপকারও করে। তাই এটা বলা যেতে পারে যে, এসব খাবার সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নেও অবদান রাখতে পারে। বাচ্চা পেতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই খাদ্য তালিকায় বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। প্রায়সময় বার্গার ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজের মতো অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে অল্প পরিমাণে ফার্টিলিটি সুপারফুড খেলে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা বা গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে এমন ১৫টি খাবার নিয়ে তিন পর্বের প্রতিবেদনের আজ থাকছে শেষ পর্ব।

* আখরোট

স্বাস্থ্যকর ফ্যাট কেবলমাত্র প্রজনন স্বাস্থ্য নয়, সমগ্র স্বাস্থ্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাদাম জাতীয় খাবার আখরোট হলো ওমেগা ৩ ও ওমেগা ৬ এর মতো স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সমৃদ্ধ উৎস, যা ফার্টিলিটি বৃদ্ধি করতে পারে। একটি ছোট গবেষণায় ১১৭ জন পুরুষকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়: কন্ট্রোল গ্রুপ ও এক্সপেরিমেন্টাল গ্রুপ। কন্ট্রোল গ্রুপের লোকদেরকে স্বাভাবিক ডায়েট বজায় রেখে সকল প্রকার গাছের বাদাম এড়িয়ে চলতে বলা হয়, অন্যদিকে এক্সপেরিমেন্টাল গ্রুপের লোকদেরকে স্বাভাবিক ডায়েট বজায় রেখে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ (৭৫ গ্রাম, খোসাসহ) আখরোট খেতে বলা হয়। আখরোট খাওয়া পুরুষদের বীর্যের স্বাস্থ্য উন্নত হয়েছিল- বিশেষ করে শুক্রাণুর জীবনীশক্তি ও গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং গাঠনিক উন্নতি হয়েছিল। আপনি ফার্টিলিটি বাড়াতে বৈকালিক স্ন্যাক হিসেবে আখরোট খেতে পারেন।

* ডিম

ডিম, বিশেষ করে ডিমের কুসুম আপনাকে উর্বর করতে পারে। ডিম হলো বি ভিটামিনের ভালো উৎস, যা ফার্টিলিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ওমেগা ৩ ফ্যাটও ফার্টিলিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনি ওমেগা ৩ সমৃদ্ধ ডিম খেয়ে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা বাড়াতে পারেন। তেমন একটা মাছ না খাওয়া লোকেরা তাদের ডায়েটে এ ধরনের ডিম অন্তর্ভুক্তির কথা বিবেচনা করতে পারেন। ডিম খাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, এটি হলো চর্বিহীন প্রোটিনের সুলভ উৎস, যা নারী-পুরুষের ফার্টিলিটি বৃদ্ধিতে সহায়ক। ডিমে কোলিনও পাওয়া যায়। গবেষণা সাজেস্ট করছে যে, কোলিন কিছু জন্মত্রুটির ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে, কিন্তু সকল গবেষণায় এমনটা পাওয়া যায়নি। অনেক ডায়েট বিশেষজ্ঞ ডিমের কুসুম ফেলে দিয়ে কেবলমাত্র ডিমের সাদা অংশ খেতে পরামর্শ দেন। কিন্তু এমনটা করবেন না। যদি আপনাদের বাচ্চা নেয়ার ইচ্ছে থাকে, তাহলে উর্বরতা বৃদ্ধি করতে ডিমের কুসুমও খাওয়ার কথা বিবেচনা করুন।

* আনারস

একটি খুব কমন বিশ্বাস হলো ডিম্ব নিষিক্ত অথবা আইভিএফের সময় ভ্রুণ ট্রান্সফারের পর ৫ দিন ধরে আনারস খেলে ইমপ্লান্টেশনে (যখন মানব ভ্রুণ জরায়ু প্রাচীরে সংযোজিত হয়) সহায়ক হতে পারে। তবে এটিকে সমর্থন করার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু যখন গর্ভধারণের চেষ্টা করবেন, তখন অন্যান্য ভালো কারণেও আনারস খেতে পারেন। আনারস হলো ভিটামিন সি’র একটি ভালো উৎস। একটি আনারসে দৈনিক সুপারিশকৃত ভিটামিন সি’র ৪৬ শতাংশ থাকে। নিম্ন মাত্রার ভিটামিন সি এর সঙ্গে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমের (পিসিওএস) যোগসূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ভিটামিন সি পুরুষদের ফার্টিলিটি বৃদ্ধি করতে পারে। গবেষণায় পাওয়া গেছে, ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট অতিরিক্ত ধূমপানে আসক্ত পুরুষদের শুক্রাণুর কোয়ালিটি বৃদ্ধি করেছে, যদিও আপনি জনক হতে চাইলে ধূমপান বর্জন করাটাই শ্রেয়। আনারসে ব্রোমেলিয়ান নামক প্রাকৃতিক এনজাইম রয়েছে, যা থেকে প্রদাহবিরোধী প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়, কিন্তু এটি ফার্টিলিটি বৃদ্ধি করে কিনা তা নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা নেই। আনারস হলো একটি নিম্ন ক্যালরির ফল, যা মিষ্টি পাগল লোকদেরকে স্বাস্থ্যকর উপায়ে সন্তুষ্ট করতে পারে। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ গর্ভবতী নারীদেরকে আনারস না খেতে পরামর্শ দিচ্ছেন।

* স্যালমন

প্রায় প্রত্যেক সুপারফুড লিস্টে (ফার্টিলিটিকে ফোকাস করুক কিংবা না করুক) স্যালমন দেখতে পাবেন। কিন্তু এই মাছ খেতে চাইলে আপনাকে মার্কারি দূষণ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে গর্ভধারণ প্রচেষ্টার সময় ও গর্ভাবস্থায়। স্যালমন হলো প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড ও ওমেগা ৩ এর সমৃদ্ধ উৎস, যা নারী-পুরুষের উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। এই মাছে এমন একটি পুষ্টি রয়েছে যা ভ্রুণের সুস্থ বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্যালমনে অন্যান্য যেসব প্রজনন সহায়ক পুষ্টি পাওয়া যায় তা হলো ভিটামিন ডি ও সেলেনিয়াম। সুস্থ বীর্যের জন্য সেলেনিয়ামের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং নিম্ন মাত্রার ভিটামিন ডি নারী-পুরুষের উর্বরতা হ্রাসের কারণ হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, স্যালমন হলো ভিটামিন ডি’র অন্যতম সেরা খাবার উৎস। কেবলমাত্র তিন আউন্স স্মোকড স্যালমনে দৈনিক সুপারিশকৃত ভিটামিন ডি’র ৯৭ শতাংশ পাওয়া যায়।

* দারুচিনি

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমের (পিসিওএস) যোগসূত্র রয়েছে- নারীদের অনুর্বরতার অন্যতম কমন কারণ হলো পিসিওএস। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, দারুচিনির সাপ্লিমেন্ট ডায়াবেটিকদের স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল সাজেস্ট করছে যে, দারুচিনি ডায়াবেটিস রোগীদের গ্লুকোজ লেভেল, ট্রাইগ্লাইসেরাইড, এলডিএল কোলেস্টেরল (অপকারী কোলেস্টেরল) ও মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে পারে। এ গবেষণাটি গবেষকদের আশাবাদী করছে যে, দারুচিনি ফার্টিলিটির জন্য ভালো হতে পারে। একটি ছোট গবেষণায় পিসিওএসের ৪৫ জন নারীকে ৬ মাসের জন্য দারুচিনি সাপ্লিমেন্ট ও প্লাসেবো সেবন করতে বলা হয়। যেসব নারী দারুচিনি সাপ্লিমেন্ট সেবন করেছিল তাদের ডিম্ব নিষিক্তের হার বেড়েছিল ও মাসিক চক্র নিয়মিত হয়েছিল। কিন্তু প্লাসেবো সেবনকারী নারীদের মধ্যে কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি। আপনার সকালের ওটমিল, দই অথবা চা-কফিতে দারুচিনির গুঁড়া মেশাতে পারেন।

তথ্যসূত্র : ভেরি ওয়েল ফ্যামেলি

পড়ুন : * যেসব খাবার গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায় (প্রথম পর্ব)

* যেসব খাবার গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায় (দ্বিতীয় পর্ব)


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯/ফিরোজ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন