ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৩ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৯ ১৪২৭ ||  ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

রুপা হত্যা : আপিল শুনানির অপেক্ষা

100 || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:২৯, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০  
রুপা হত্যা : আপিল শুনানির অপেক্ষা

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে আইন কলেজের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা রুপাকে গণধর্ষণের পর হত্যার মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের পর দুই বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। তবে হাইকোর্টে এখনো আপিল শুনানি শুরু হয়নি। বিচারে দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রুপার পরিবারের সদস‌্যরা।

রুপা হত‌্যা মামলায় ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চার আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেন নিম্ন আদালত। হত‌্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে এ রায় হলেও আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করায় তা থমকে আছে।

টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া এ রায় দেন। রায়ে বাসচালক হাবিবুর (৪৫), তার সহকারী শামীম (২৬), আকরাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীরকে (১৯) মৃত্যুদণ্ড এবং বাসের সুপারভাইজার সফর আলীকে (৫৫) সাত বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি জব্দকৃত ছোঁয়া পরিবহনের বাসটি রুপার পরিবারকে সাত দিনের মধ্যে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

নিম্ন আদালতে দেয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে হাইকোর্টের অনুমতি নিতে হয়। ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি বিচারিক আদালতের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল করারও সুযোগ পান। রুপা হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। নিম্ন আদালতের রায়ের পাঁচ দিন পর ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সাজাপ্রাপ্ত সব আসামি খালাস চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করে। কিন্তু এখনো আপিল শুনানি শুরু হয়নি। ফলে মৃত‌্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। আদালতের নির্দেশ সত্বেও ছোঁয়া পরিবহনের সে বাসটি রুপার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

হাইকোর্টে বর্তমানে ২০১৫ সাল ও তার পরে পাঠানো ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। রুপা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ২০১৮ সালের হওয়ায় এখনো এর শুনানি হয়নি। আগামী দু-এক বছরের মধ্যে আপিল শুনানি হবে কি না, তাও অনিশ্চিত।

রুপা হত্যাকাণ্ডের ১৭৩ দিন ও মামলার ১৭১ দিন পর মাত্র ১৪ কার্যদিবসের শুনানিতেই রায় হয়েছিল। দেশের ইতিহাসে এত দ্রুত কোনো চাঞ্চল্যকর মামলার রায় হয়নি।

অপরাধীদের মৃত‌্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়ায় হতাশ রুপার পরিবার। রুপার ভাই হাফিজুর রহমান প্রামাণিক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে নিম্ন আদালত থেকে কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়ে আমরা অনেকটা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করার পর থেকে সেটি ঝুলে আছে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনো বিচার পেলাম না। জানি না, বেঁচে থাকতে বোন হত্যার বিচার দেখে যেতে পারব কি না। আদালত আমাদের একটি বাস দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সেটিও এখনো পাইনি। উচ্চ আদালতে আসামিরা আপিল করার পর আমাদের কাছে সেখান থেকে মামলার সব নথিপত্র চাওয়া হয়। সেগুলো হস্তান্তরও করেছি। কিন্তু দুই বছরেও শুনানির তারিখ পড়েনি। এ রায় বাস্তবায়ন করা হলে সেটি দেশে একটি দৃষ্টান্ত হতো। সুষ্ঠু বিচার হলে অপরাধীরা ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করতে ভয় পেত। তাহলে হয়তো আর কোনো ভাইকে তার বোনের এমন দুর্ভাগ‌্য দেখতে হতো না। আর কাউকে তার বোনকে হারাতে হতো না।’

মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নিম্ন আদালতে রুপা হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী আইনজীবী ও জেলা জর্জ কোটের পিপি এস আকবর খান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘রুপা হত্যাকাণ্ডটি চাঞ্চল্যকর। এ মামলাটি নিম্ন আদালতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততার সাথে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা দুঃখিত এজন্য যে, দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে রুপার পরিবার এখনো তাদের কাঙ্ক্ষিত বিচার পায়নি। নিম্ন আদালতের এ রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকলে ধর্ষণ কমে আসবে।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আরেক সহকারী আইনজীবী ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো মাত্র ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে রুপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে এ মামলা স্থানান্তর হওয়ার পর সাক্ষী পর্যায়ে সাত কার্যদিবসে এই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়েছিল। কিন্তু আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করায় রায়টি থমকে আছে। ফলে রুপার পরিবার সঠিক বিচার এখনো পাচ্ছে না।’

এদিকে, উচ্চ আদালতে রায়ের শুনানি আটকে থাকায় ছোঁয়া পরিবহনের সেই বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৩৯৬৩) এখনো মধুপুর থানায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশ।

এ ব্যাপারে মধুপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তারিক কামাল রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘রুপা হত্যার পর থেকে বাসটি মধুপুর থানার হেফাজতে রয়েছে। নিম্ন আদালতের রায়ের সাত দিনের মধ্যে বাসটি রুপার পরিবারকে বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেও আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করায় সেটি দেয়া সম্ভব হয়নি। আইন অনুসারে উচ্চ আদালতে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে এভাবে পড়ে থাকতে থাকতে বাসের যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। রুপার পরিবার বাসটি ভবিষ্যতে পেলেও সেটির আর কোনো কাজে লাগবে না।’

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে ঢাকার আইডিয়াল ল’ কলেজের আইন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা রুপাকে ছোঁয়া পরিবহনের একটি চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে পরিবহন শ্রমিকরা। পরে তাকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে যায় তারা। পুলিশ ওই রাতেই তার লাশ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় অরণখোলা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে মধুপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।

রুপা সিরাজগঞ্জের তারাশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামের মৃত জুলহাস প্রামাণিকের মেয়ে।

ঘটনার তিন দিন পর ২৮ আগস্ট পত্রিকায় ছবি দেখে রুপার ভাই হাফিজুর রহমান প্রামাণিক মধুপুর থানায় এসে রুপাকে শনাক্ত করেন। পরে পুলিশ ছোঁয়া পরিবহনের চালক হাবিবুর, সুপারভাইজার সফর আলী এবং সহকারী শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের কাছে তারা রুপাকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে।

সেই বছরের ২৯ আগস্ট বাসচালকের তিন সহকারী শামীম, আকরাম, জাহাঙ্গীর এবং ৩০ আগস্ট চালক হাবিবুর ও সুপারভাইজার সফর আলী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

৩১ আগস্ট রুপার লাশ কবর থেকে তুলে তার ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাকে নিজ গ্রাম আসানবাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়।

২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি মামলার বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত আদালতে জব্দ তালিকা, সুরতহাল প্রতিবেদন, চিকিৎসক, পাঁচ আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গ্রহণকারী চারজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৭ জনের সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের সমর্থনে আইন দাখিল শেষে টাঙ্গাইলের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এ মামলার রায় দেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করার পর থেকে মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।


টাঙ্গাইল/শাহরিয়ার সিফাত/রফিক

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়