ঢাকা, শুক্রবার, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৫ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

রুমা মোদকের গল্প || প্যান্ডোরার বাক্স

রুমা মোদক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-৩০ ৭:৩৯:২৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-৩১ ১২:১৪:৫৭ পিএম
অলঙ্করণ: অপূর্ব খন্দকার

সিলেটের আতিয়ামহলে অপারেশন টোয়াইলাইট সমাপ্ত। আটকে পড়া ৭৮ জন উদ্ধার। সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলনের পর ২ দফা বোমা বিস্ফোরণে ছয়জন নিহত। মৌলভীবাজারে অপারেশন হিটব্যাক। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সাথে যোগ দিয়েছে সোয়াত। নারী শিশুসহ ছিন্নভিন্ন সাত দেহ উদ্ধার। কুমিল্লায় আস্তানা ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস সরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে কোনো জঙ্গীকে জীবিত ধরা সম্ভব হয়নি।

দেশের নানা প্রান্তে উত্তপ্ত বিষয় ঘিরে উত্তপ্ততার আঁচে তখন দাউ দাউ জ্বলছে সংবাদপত্রের হেডলাইন, টিভি চ্যানেলের নিউজফিড। তখন এক কাকডাকা ভোরে মৃত্যু হয় বাক্সবুড়ার। গত কয়েক বছরে গাঁয়ের মানুষ মোটামুটি তার পিতৃপ্রদত্ত নাম বিস্মৃত হয়ে গেছে। বয়সের কারণে তার সশরীর উপস্থিতি খুব একটা প্রয়োজনীয় ছিল না এখন আর। তার সমবয়সী কোনো পুরুষ মানুষ তখন বেঁচে নেই যে, নাম ধরে ডেকে তার পিতৃপ্রদত্ত নামটি প্রচলিত রাখবে। কর্মক্ষম কিংবা কর্মে অক্ষম যুবা, বৃদ্ধ, বউ-ঝি, বয়স্ক স্ত্রীলোক কারো সাথেই তার দরকারি কিংবা অদরকারি কোনো যোগাযোগ ছিল না। ফলে সারা দিন সবুজ রঙের গায়ে লাল-হলুদ লতাপাতা নকশা আঁকা একখানা টিনের বাক্স বগলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বৃদ্ধ লোকটিকে কখন যে গাঁয়ের পথে-ঘাটে চড়ে খেয়ে দিনকাটানো বালকের দল ‘বাক্সবুড়া’ নাম দিয়েছে, তা কেউ খেয়ালও করেনি। এই বাক্সের ভিতরে আসলে কী আছে কিংবা বৃদ্ধ লোকটি কেন বাক্সটি বগলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়- প্রশ্নগুলো খেয়ালের অভাবেই গাঁয়ের মানুষের মাঝে তেমন কোনো আগ্রহের জন্ম দিতে সক্ষম হয় না, যেমন সক্ষম হয় সংবাদপত্র কিংবা টিভি চ্যানেলের উত্তপ্ত নিউজফিডের দাউ দাউ জ্বলন্ত অগ্নিগর্ভ সংবাদগুলো। গাঁয়ের একমাত্র পিচ করা রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়ে হাইওয়েতে মিশে গেছে সেখানে সদ্য গজিয়ে ওঠা চায়ের স্টলে কনডেন্সড মিল্ক আর দু-চামচ চিনি দিয়ে কড়া মিষ্টির চা খেতে খেতে তারা টকশো দেখে, বক্তাদের সাথে সাথে দলে-উপদলে বিভক্ত হয়, আর উত্তপ্ত প্রসঙ্গের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেরাও উত্তপ্ত হয়, ঝগড়াঝাটি করে। শরীর উত্তপ্ত করা প্রসঙ্গের তো অভাব নেই। একটার পিঠে আরেকটা। জঙ্গী ধরা শেষ না হতেই তিস্তা চুক্তি, তিস্তা চুক্তি শেষ না হতেই অপু-শাকিব। এত সব উত্তপ্ত এজেন্ডা মাথায় নিয়ে, ঝগড়াঝাটি শেষে বাড়ি ফেরার সময় তাদের কাছে একটা সবুজ রং ভরা গায়ে লাল-হলুদ লতাপাতা নকশা আঁকা টিনের বাক্সের আসলেই কি আদৌ কোনো গুরুত্ব থাকে? বৃদ্ধ লোকটিও চলাফেরায় সক্ষম ছিল না খুব একটা। থাকার ঘর থেকে খুঁটিতে হেলান দেয়া বারান্দা, কয়েক কদম দূরত্বে পায়খানা আর বড়জোর কোনো কোনো দিন রান্নাঘর লাগোয়া ধানী জমির আল দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে পিচের রাস্তায় ওঠার মুখ অবধি। বয়স, অপ্রয়োজনীয়তা কিংবা অথর্বতার কারণে তার দিকে কেউ খুব মনোযোগ দিয়ে তাকাতো না। বাক্সখানা বগলে নিয়ে বৃদ্ধও যে এখানে বসে রাস্তা দিয়ে যাতায়াতরত মানুষকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতো, তার উদাস দৃষ্টিতে তেমন কোনো চিহ্ন থাকতো না। তবু সে বসে থাকতো ঠিক সন্ধ্যা অবধি, বাজার ফেরত মানুষগুলোর ঘামে-দুর্গন্ধে ক্লান্ত পাঞ্জাবির পকেটে করে অন্ধকার নেমে না আসা পর্যন্ত। শুধু দূর থেকে রাতের রান্নার আয়োজন সামলাতে সামলাতে কাঠকয়লার ধোঁয়ায় চোখ বেয়ে নেমে আসা জলধারা মুছতে মুছতে রান্নাঘরের খোলা জানালা দিয়ে তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতো একজন। জমিলা।

সেদিন কাকেদের কর্কশ হল্লায় যখন ভোর নামবে নামবে করছে, গাঁয়ের মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করা মানুষগুলোর অসমাপ্ত ঘুম নিত্য অভ্যাসে অলস আড়মোড়া ভাঙছে বিছানায়, তখন জমিলার চিৎকারে ঘুম ভাঙে সমুজ আলীর। দৌড়ে বৃদ্ধের ঘরে এসে, বৃদ্ধের নিষ্প্রাণ দেহ আবিষ্কার করে, পাড়া-পড়শী জমায়েত হবার আগে সে বউয়ের কানে কানে ফিসফিসিয়ে জানতে যায়- বাসকখান হরাইছস নি?

বারান্দায় পড়ে থাকা মৃত মানুষটির বয়স ঠিক আন্দাজ করা যায় না। মুখের উপর ভন ভন করছে মাছি। পরনের শার্টটা রংচটা ময়লা কিন্তু দুর্ঘটনার ছাপহীন অমলিন। প্যান্টটাও গোড়ালির উপর ঠিকঠাক লেপ্টে আছে যেখানে যতটুকু থাকার কথা ছিল। চেহারাটাও নির্লিপ্ত। কেবল মাথার পেছনটা যতোটুকু দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না পুরোপুরি, সেখানটায় রক্ত-মগজে মাখামাখি। থ্যাৎলানো মাথাটার চুলগুলো লেপ্টে আঠা হয়ে লেগে আছে অপরিচ্ছন্ন বারান্দার বালুকণা-কফ-থুতুর সাথে। বাম হাতের মধ্যমায় তীব্র ব্যথা নিয়ে তার পাশেই বসে থাকতে হচ্ছে জমিলাকে স্বামী সমুজ আলীকে সাথে নিয়ে। এই সময়ে এই রকম একটি বীভৎস দৃশ্যের অংশ হয়ে থাকা তার জন্য যতোটা বিভীষিকাময় বারবার পুলিশের আসা-যাওয়া ততোটাই উৎকণ্ঠার, ভয়ের, শঙ্কায় ঘাবড়ে যাওয়ার। পুলিশ আসলেই দু-পায়ের ফাঁকে শাড়ির পিছনে লুকানো প্লাস্টিকের ব্যাগটিকে সে আরো শক্ত করে চেপে ধরে, আর চলে গেলে অচেনা নিশ্চিন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে বুক চিরে। সমুজ আলী উদভ্রান্ত একবার জায়গা ছেড়ে উঠে যায় আবার এসে জায়গায় বসে। 

‘রঞ্জনরশ্মি’ লেখা কক্ষটির সামনে ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে মানুষের সারি। সামনে পত্রিকা খুলে লোকটা বকবক করতেই থাকে- হোনেন হোনেন ওই সব জঙ্গি ফঙ্গি সব ফাতরামি। পিএম ইন্ডিয়া গ্যালো, এ্যামনেই সব শেষ।

ডানপাশে বসা লোকটি তাল দেয়- দ্যাখলাইন নি কাণ্ড, তিস্তা চুক্তি অইলো না, খালি আগড়ম বাগড়ম। প্রসঙ্গটা মাঝপথে থামিয়ে সে গলাটা একটু নিচে নামায়, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে, অপু-শাকিবের ঘডনাডা কিতা আসলে কইনছাইন? মাঝখানের চেয়ারে বসা লোকটি ক্ষেপে ওঠে- হোনলেন বইল্যা জিগাইতাছেন ঘডনাটা কিতা, ও রকম কত ঘডনা ঘডে, বাদ দিয়া থন।

মাঝখানে টেবিল আর ডানপাশে একখানা চেয়ার বামপাশে লম্বা বেঞ্চ। চেয়ারে বসা দুজন চায়ের কাপে চুমুক দেয় একসাথে। আলাপচারিতায় আন্দাজ করা যায় দুজনের সম্পর্ক সহকর্মী বৈ নয়। আরো দু-তিনজন ব্যথায় কোঁকাতে কোঁকাতে এসে সারি দীর্ঘ করে। তাদের আলাপ সংক্ষিপ্ত হবার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এর মধ্যে একজন- আর কত দেরি হবে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে ধমক খায়। জমিলার বাম হাতের মধ্যমার ব্যথা আর ফুলে ওঠার তীব্রতা পাল্লা দিচ্ছে পরস্পর। ব্যথায় চিৎকার করার ইচ্ছেটাকে গিলতে খুব কষ্ট হচ্ছে জমিলার। কে একজন এসে মৃত লোকটিকে ঢেকে দেয় বিছানার চাদর দিয়ে। চেহারাটা আর দেখা যায় না। আবার পুলিশ এসে চক্কর দিয়ে গেলে, শাড়ির পিছনে লুকানো ব্যাগটা দু-পায়ে আরো জোরে আঁকড়ে ধরে সমুজ আলীকে সে তাড়া দেয় বাড়ি ফিরে যাবার জন্য। সূর্যের মধ্যাকাশে অবস্থান ফেরার তাগাদা ত্বরান্বিত করে, জমিলার উপায় নেই, ফিরতে হবে সমুজ আলীকে একাই। সমুজ আলী সম্মত হয়, বলে- হ, আমি যাইগা, মাইনষে মন্দ কইব। তর ব্যাগডা দিলা আমার ধারঅ। দু-পায়ের ফাঁকে লুকানো ব্যাগটা ইশারা করে সমুজ আলী। আঙুলের তীব্র ব্যথা অগ্রাহ্য করে স্বামীকে কর্কশ কণ্ঠে জবাব দেয়- বিশ্বাস নাই আমার উফ্রে? বাড়িত গ্যালে কার না কার হাতঅ ফড়ে ঠিক আছেনি কোনু, যান। যুক্তিটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয় সমুজ আলীর। হাসপাতালে আসতে থাকা যেতে থাকা, ব্যান্ডেজ করা, ব্যান্ডেজ ছাড়া রক্তাক্ত আহত অসুস্থ মানুষের স্রোতের সাথে মিশে বের হয়ে যায় সমুজ আলী।

লোকটি চেয়ার ছেড়ে বাইরে আসে, সিরিয়ালে বসে থাকা আহত, চিকিৎসাপ্রত্যাশী মানুষগুলোকে ধমকের সুরে ডাকে- আসেন, সিরিয়াল কাটছেন স্লিপ কই? সিরিয়াল অনুযায়ী প্রথম লোকটিকে ডেকে নিয়ে রঞ্জনরশ্মি লেখা ঘরটিতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় লোকটি। জমিলা দু-পায়ের মাঝখানে আটকানো প্লাস্টিকের ব্যাগখানা আরো জোরে আটকে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করে বসে থাকে তার সিরিয়ালের অপেক্ষায়।

যথাসময়ে মৃত্যু বৃদ্ধের। কাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। যদিও অসুখ-বিসুখ তেমন ছিলো না, তবু এ বয়সে মৃত্যু এতোটাই স্বাভাবিক যে, কাঁদলে কেউ সান্ত্বনা দেবার তেমন কোনো ভাষা খুঁজে পায় না। যদিও বৃদ্ধের তিন কন্যা যথাসময়ে এসে কান্নাকাটি সেরে কোরান খতম করতে বসে গেছে, তবুও জমায়েত পাড়াপড়শী অপেক্ষা করে একমাত্র ছেলে সমুজ আলী ফিরলে কী সান্ত্বনা দিবে, তার প্রস্তুতিতে। সমুজ আলী বাসায় ঢুকে দেখে বৃদ্ধের দাফন-কাফনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। ভাইকে দেখে বড় বোন একবার ডুকরে উঠলে পড়শীদের কেউ ধমক দেয়- কান্দে না বেটি, কান্দে না। কানলে মুর্দার আজাব হয়।

বাড়ি থেকে হাঁটা পথ, হাত পঞ্চাশেক। হরিনাকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা হবে। তারপর গাঁয়ের শেষ মাথার কবরস্থানে দাফন। ইতোমধ্যে দু-চারজন করে গ্রামবাসী জমায়েত হতে শুরু করেছে। স্কুল ছুটির অপেক্ষা। এ স্কুলেই দপ্তরির চাকরি করেছে বৃদ্ধ দীর্ঘকাল। পাশের বাড়ি থেকে আসগর বেটার বউ শামীমা এনামেলের টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে খাবার নিয়ে আসে। দু-চারজন মুরুব্বি বৃদ্ধের সন্তানদের খাবারের তাড়া দেয়। জানাজা-দাফন শেষ করে কখন আবার খাবার সুযোগ মিলবে ঠিক নেই। খেয়ে নিক দু-লোকমা। আপত্তি করে না তারা, সেই কাকডাকা ভোর থেকে অনাহারি। মাটিতে চাটাই বিছিয়ে বসে যায় চারজন পাশাপাশি। মেজো বোন তখন সমুজ আলীর কানে কানে জানতে চায়- আব্বাজানের বাসকডা কই? ফার্মের মুরগির দারুচিনি ফোঁড়ন দেয়া ঝোল মাখা ভাতের লোকমা মুখে তুলতে তুলতে সমুজ আলী ফিসফিসিয়ে জবাব দেয়- জমিলা জানে।

হ্যাঁ জমিলারই তো জানার কথা। পত্নীহীন অসহায় বৃদ্ধ মানুষটিকে বলতে গেল পিতৃশ্রদ্ধায় যত্ন করেছে জমিলা। কোনোদিন সামান্য তাচ্ছিল্য কিংবা অবহেলা দেখায়নি। পাড়াপড়শী সাক্ষী। এমন পুত্রবধূ সাতজন্ম নেক কর্মের ফসল। সবাই নির্দ্বিধায় স্বীকার করে।

কোনো কোনো দিন ঘরে ঢুকতেই সমুজের চোখ মুখের ভাব দেখে জমিলা টের পায় ভাবগতি ভালো না। চোখ দুখানা রক্ত লাল যেনো ঠেলে বের হয়ে আসতে চাইছে। পাতের ভাত আধা খেয়ে পানি ঢেলে উঠে পড়ে। তারপর ঘরে ঢুকে সিগারেটে আগুন দিয়ে ঘনঘন টান দেয়। এমন দিনগুলোতে জমিলা ভয়ে ভয়ে থাকে। অভিজ্ঞতায় সে জানে এরপর কী ঘটে। জমিলা নিঃশব্দে মশারির চারমাথা লাগিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার হয়ে আসে। ঘুমে কাদা হয়ে যাওয়া শিশুটি বেঘোরেই খুক খুক কাশে, আবার পাশ ফিরে শোয়। তামাক শেষ হয়ে ফিল্টারে লেগে যাওয়া সিগারেট মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়াতে মাড়াতে আদেশ করে আবার, যে আদেশ আগেও সে বারকয়েক করেছে- কাইলকা আবার টেহাগুলা চাইবি কইলাম। খালি চাইলে অইব না, যেমনে পারস উদ্ধার করবি। কথা শেষ হয় কি হয় না, মশারির ভিতর ঢুকে উন্মত্ত পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে জমিলার শরীরে। অন্তর্বাসসহ পরনের আবরণ দুমড়ে মুচড়ে পুরুষত্বের সবটুকু রোষ যেনো ঢেলে দেয় সোহাগের বদলে। জমিলা অভ্যস্ত এই অত্যাচারে। স্বাভাবিকভাবেই নেয় সে। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এড়াতে নিজেই গঞ্জের মাতৃমঙ্গল থেকে পিল নিয়ে আসে। জুয়া খেলে খেলে দেউলিয়া হয়ে সমুজ আলী এখন নিঃস্ব। গঞ্জের কাপড়ের দোকানখানার ঝাঁপ বন্ধ তিন মাস। উত্তর পাড়ার নিশিকান্তর বউ শ্যামলী মাতৃমঙ্গলের আয়া, গেল মাসে জমিলাকে জানিয়েছে লাখ দুয়েক টাকা ঋণও করেছে সে সুদখোর মহাজনদের কাছ থেকে।

অবিমৃষ্যকারী এই লোকটা যেদিন জুয়ায় দু-চার হাজার টাকা জিতে সেদিন তার ভাবই অন্যরকম। বাজারের বড় রুই, ইলিশ কিনে বাসায় ফিরে। জমিলা দু-একবার বলার চেষ্টা করেছে- টেহাডা এভাবে আজাইরা খরচ করলে কিতা অয়, দুই এক টুকরা বড় মাছের ফেডি না খাইলে কিতা অমন ক্ষতি অইব? টেহা হাতঅ থাকলে কত কামঅ লাগে। পাত্তাতো দেয়ই না সমুজ আলী উল্টো আরো ধমকে ওঠে- বেশি বুজছ? দয়া দেহাস রোজগার করতে পারি না বইল্যা পোলারে দুই টুকরা মাছ খাওয়ানির হাধ নাই নি কিতা? জমিলা ভেবে পায় না এ কেমন পুরুষ মানুষ, দায় নাই, দায়িত্ব নাই, জুয়া খেলে নেশা করে ঋণগ্রস্ত হয় আর দু-চার টাকা পকেটে আসলেই অহেতুক ফূর্তি করে উড়িয়ে বেড়ায়।

সাত নম্বর সিরিয়ালে জমিলার ডাক আসতে আসতে দুপুর গড়াতে থাকে বিকালের দিকে, হাসপাতালের ভিড় পাতলা করতে করতে। রঞ্জনরশ্মি লেখা রুমটিতে ঢুকে লোকটির হাতে সিলমারা স্লিপখানা দিতেই ধমক খায় একখান। জুতা বাইরে রাইখা আসেন নবাবের বেডি- এ কেমন মুখের ভাষা লোকটির? হাতের ব্যাগের দিকে ইঙ্গিত করে দ্বিতীয় ধমক দেয় সে- হাতে এইডা কী, বাইরে রাইখা আসেন। এটা কীভাবে করে জমিলা? কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না সে, প্রথমবারেই লোকটার পায়ে জড়িয়ে ধরার জন্য এগিয়ে যায়- স্যার, এইডা বাইরে রাখতে ফারতাম না স্যার। ঘটনার আকস্মিকতায় লোকটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও, কৌশলে কাজ হয়। আড়ালে রাখার অনুমতি মিলে। কী সম্পত্তি লইয়া হাসপাতালঅ আইছস- এক ধাক্কায় সম্ভ্রমাত্মক সম্বোধন ছেড়ে তুচ্ছার্থক সম্বোধনে লোকটি জমিলার বামহাতখানা ধরে মেশিনের নিচে জায়গামতো স্থাপন করে। হাতখানা না নাড়ানোর আদেশ দিয়ে লোকটি আরেকটি ছোট্টমতন ঘরে ঢুকে যায়। ভিতর থেকে আবার ধমক দেয়- ওই আসুদি বেডি, হাত অত নাড়াস কেন? সোজা রাখ। ব্যথার ভারে অসহ্য দাঁতে ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে জমিলা ভাবে, সে এতোদিন ভাবতো এসব গালি অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বদমেজাজি লোকেরাই দেয়। এখন দেখে তার ধারণা ঠিক না, এক্সরে শেষ করে লোকটি পুনরায় আদেশ করে, ওইখানে গিয়া বস, রিপোর্টের সিরিয়াল আসলে আইসা রিপোর্ট নিবি। ব্যাগখানা ডান বগলে সযত্নে নিয়ে বাইরে এসে দেখে তারই মতো বয়সি এক মহিলা চাদরে ঢাকা মৃতদেহটির উপর পড়ে আছাড়ি-পিছাড়ি কাঁদছে। আবার পুলিশ আসে, হাসপাতালের লোকজনের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। ব্যথা আর উৎকণ্ঠার যৌথ চাপে জমিলা মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে রিপোর্টের অপেক্ষায়।

আছরের আজানের সাথে সাথে বেশ লোকজন জমে যায়। সকলে বলাবলি করে, এই ভরা বর্ষায় আজ আকাশ পরিষ্কার। তবু সন্ধ্যার আগে দাফন সেরে বাড়ি ফেরা উচিত, আর দেরি করা ঠিক হবে না। সমুজ আলীকে তাড়া দেয় তারা। দু-একজন নিয়মমতো স্মৃতি রোমন্থন করে, মৃতের বাড়িতে এ রকম বলা যেনো রীতি- বড় বালা আছল তুমার বাফ, কেউর সাতঅ পাঁচঅ নাই। তবে এই বৃদ্ধের বেলায় কথাটা কেবল কথার কথা নয়। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের নিরীহ চাকরিজীবী লোকটি নিরীহ জীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছে। বউটা ছিলো ততোধিক নিরীহ। ফলে বাপের এ ভিটায় বেতনের গোনা টাকায় শাক-শুঁটকি খেয়ে নির্বিঘ্নে জীবন কাটিয়ে দিয়েছে। স্ত্রী থাকা অবস্থায় মেয়ে তিনটাকে বিয়েশাদি দিয়ে বেশ গুছিয়ে ফেলেছিল সব। তবে ওই যে কথায় বলে, সব ভালো তার শেষ ভালো যার।

একমাত্র ছেলের কারণে শেষটা বেশ দুঃসহ হয়ে উঠেছিল তার। সচরাচর যা হয় বিপত্নীক বৃদ্ধদের পুত্রবধূ কর্তৃক লাঞ্ছিত জীবন, এই বৃদ্ধের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারাটাকে মিথ্যে প্রমাণ করে বরং পুত্রবধূই আগলে রেখেছে তাকে যেন সন্তান স্নেহে। বাজারে শ্রীগুরু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পিছনে দু-একদিন ছেলেকে হাতে-নাতে জুয়া খেলায় ধরে ফেললে অভাবে কিংবা স্বভাবে ছেলে মুখ থেকে পিতার প্রতি সমীহের মুখোশটা খুলে ফেলে। ততোদিনে বাপের পেনশনের টাকায় করে দেয়া কাপড়ের দোকানখানার ঝাঁপ বন্ধ। দিনরাত পেনশনের বাকি টাকার জন্য বাপের সাথে অশান্তি, গালি-গালাজ-তুই-তোকারি। গায়ে হাত তোলাটাই বাকি ছিল শুধু, তাও ঘটে যেতো যে কোনোদিন যদি পুত্রবধূ জমিলা নিজের পিঠ পেতে দিয়ে না বাঁচাতো। এ রকম কাটানো দুর্বিষহ উপেক্ষিত জীবনে হয়তো বৃদ্ধ কাটিয়ে দিতো কিন্তু যেদিন ব্যাংকে গিয়ে সে দেখলো ছেলে স্বাক্ষর জাল  করে তার পেনশনের বেশ কিছু টাকা তুলে নিয়েছে, সেদিনই ব্যাংকের সিঁড়ির নিচে নেমে এলো দ্রুত, হাতের ইশারায় রিকশা ডাকলো একটা, তারপর রওনা হলো কামার পট্টিমুখী। বাহারি জিনিসের অত্যাচারে টিনের ট্রাংক জাতীয় অপ্রয়োজনীয় জিনিসটি বাজারে দুর্লক্ষ্য হলেও বৃদ্ধ খেয়াল করেছে কামারপট্টির লোহা পিটিয়ে দা খুন্তি বানানো কামারেরা এখনো নানা সাইজের বাক্স বানিয়ে দোকানে সাজিয়ে রাখে।

মুরুব্বিরা পুনরায় তাগাদা দেয়, সমুজ আব্বাজান দিরং করতাছ ক্যারে? হাইঞ্জার আগে ফিরন লাগব নানি? সমুজের উদ্বিগ্নতা অস্থিরতাকে তারা কেউ কেউ ভুল ব্যাখ্যা করে সান্ত্বনা দেয়- বাফ তো কেউর ছিরজনম তাকে না, বয়সখালে মরছে, বিছনাত পইড়া চাইট্টাইছে না। শোকর গোজার কর আব্বাজান। মুরুব্বিদের তাড়ায় অস্থির হয়ে এক সময় মুখ খুলতে বাধ্য হয় সমুজ আলী- ছাছা একটুখান দম দরন লাগব, জমিলা নু হাত ভাইংগা হাসফাতালঅ। মুরুব্বিদের মনে পড়ে, ও তাই তো, তারা সম্মত হয় একটু সময় নিতে, পরস্পর আক্ষেপ করে- এমন দিনঅ বেডি আবার হাতডা ভাঙল। আর দিন ফাইল না।

আগের দিন সন্ধ্যায়, নীড়ে ফেরা কাকেদের ডানায় ভর করে যখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করে, হাটফেরতা মানুষগুলোর ময়লা পাঞ্জাবির দিন শেষের ময়লামাখা ক্লান্ত ঘামের দুর্গন্ধে দিন শেষ হতে শুরু করে অন্য দিনের মতোই নিয়মমতো, বউ-ঝিরা কাঠ-কয়লা জড়ো করে শেষবেলার খাবারের জোগাড়ে, তখন জমিলাদের উঠানে ঘটে এক চমকপ্রদ নাটক। করিমুল্লাহ মহাজনের পাঠানো দুই ষণ্ডা উঠানে দাঁড়িয়ে শাসিয়ে যায়- ব্যাটারে কইছ কাইলকার মইদ্যে টেহা না দিলে ঘরের চাল-মাচাঙ সব খুইল্যা লইয়া জামুগা, লগে ঘরের বেডিরেও। হাতের কাজ অসমাপ্ত রেখে দ্রুত ঘরের বাইরে আসে পাড়ার বৌ-ঝি-পুরুষেরা। এমন নাটক তারা জীবনে প্রথমবার দেখছে। চোখে না দেখলেও, মুখে আঁচল চেপে ঘরের ভিতর ফোঁপাতে ফোঁপাতে সব শোনে জমিলাও। তামুকের শেষ টানটা অসমাপ্ত রেখে বৃদ্ধ পুত্রবধূ জমিলাকে কাছে ডাকে। মাথায় হাত বুলায়। নিজের বাপ ছিল না জমিলার। এই বৃদ্ধের কাছে পিতৃস্নেহ পেয়েছে সে। ঈদে শাড়ি, ছেলের শার্ট, ফেরিওয়ালি এলে শখের চুড়ি-ফিতা কেনার জন্য দু-দশ টাকা বৃদ্ধ সবই দিয়েছে পিতৃস্নেহে। সমুজের  হাতে মার খেয়ে কতোদিন বৃদ্ধের কাছে মিনতি করেছে- আব্বাজান টেহাডি দিয়া দেন আফনের পোলারে। বৃদ্ধ কোনোদিন রাজি হয়নি। ঐ কুলাঙ্গাররে আমি আর কিসসু দিতাম না। ইডি তর আর তর পুলার। বৃদ্ধ রাজি না হলে জমিলার কী দোষ, সমুজ তা বুঝতে রাজি না। ঋণের দায়ে জর্জরিত সমুজের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়ছিল। মুখেও কোনোকিছু আটকাতো না, এমন কী আদিম ইঙ্গিত পর্যন্ত- তর নু হউর লাগে বে, হারাদিন অত ঢলাঢলি কীয়ের? অত পীড়িত তে টেহাগুলা লইতে পারছ না ক্যারে? কানে হাতচাপা দেয় জমিলা- ছিঃ ছিঃ। পাশের ঘর থেকে কিছু হয়তো শুনতে পায় বৃদ্ধ। বাক্সটিকে আরো সজোরে চেপে ধরে বুকে। সমুজ আলী বেশ কয়দিন গভীর রাতে সন্তর্পনে চেষ্টা করে দেখেছে বাক্সটা বাপের বুক থেকে আনা যায় কিনা, কিন্তু পারেনি। ঘুম থেকে জেগে গেছে বৃদ্ধ, ইদানীং ঘরের ভিতর থেকে তালা লাগিয়ে ঘুমাতো সে, কেবল জমিলা ডাকলেই খুলে দিতো।

সেদিন সন্ধ্যায় জমিলার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বৃদ্ধ বলে- কাইল ফজরের আযানের সময় বাইর অইয়া যাবি, সোজা ভাইয়ের বাড়িত। দুই তিনদিন ফরে আমি আইয়া টেহাডি তর নামে ব্যাংকে থুইয়া আমু। সমুইজ্যা য্যান টের না ফায়। জমিলা কাঁদে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। নিঃশব্দ ফোঁপানো যেন অনাগত কিংবা বিগত দিনের অনেক হিসাব-নিকাশ নিঃশব্দে রাখারই প্রতিশ্রুতি দেয়।

সমুজ ফিরে গভীর রাতে। জমিলা দরজা খুলে দিতেই মুখ চাপ দিয়ে ধরে  জমিলার। হ্যাঁচকা টানে বিছানায় বসায়। চোখে-মুখে অন্যান্য দিনের চেয়ে রক্ত চলাচল দ্রুত। যেনো ফেটে পড়বে যেকোন সময়। জমিলার ভয় করতে থাকে কীভাবে সন্ধ্যার ভয়াবহ ঘটনাটা উত্থাপন করে তার কাছে। কিন্তু সে প্রস্তুতি নেয়ার আগেই হিংস্র পশুর মতো ঘ্যোঁৎ ঘ্যোঁৎ করতে করতে সমুজ তাকে শাসায়- কাইলকের মইদ্যে যদি টেহার বাসকখান উদ্ধার কইরা না দেছ ত হাছাই তরে নিয়া করিমুল্লার কাছাড়িতে দিয়া আমু কইলাম। আমি জেল খাটতাম না। জমিলা বুঝতে পারে না মানুষ কীভাবে এমন পাষণ্ড হয়।

রিপোর্টখানা বগলে নিয়ে ডানহাতে ব্যাগটা শক্ত করে ধরে ইমার্জেন্সিতে ঢুকে জমিলা। সন্ধ্যা হতে খুব বেশি বাকি নেই আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃসন্দেহ হয়। নিঃসন্দেহ হয়, এতোক্ষণে নিশ্চয়ই দাফন-কাফনের জন্য তার কারণে অপেক্ষা করে নেই কেউ। গলায় স্ট্যাথো লাগানো, খাতায় কী সব লিখতে থাকা লোকটার পাশে গিয়ে মিনমিন করে জমিলা- স্যার বাড়িত হউর মারা গেইছে। আমার লাইগ্যা দাফন-কাফন সব আটকাইয়া বইছে, যদি একটু তাগদা কইরা..., ডাক্তার খাতা থেকে দৃষ্টি না তুলেই মুখের কথা কেড়ে নেয়- শ্বশুর মরছে, বাপ না তো, যান ওখানে গিয়া চুপচাপ বসেন। আসতেছি। অ্যাসিস্ট্যান্টদের আদেশ দেয় যোগাড়যন্ত্র করতে। প্লাস্টার করতে করতে বারকয়েক এক্সরে প্লেটটা চোখের সামনে ধরেন আর বলেন, এই মাঝখানের আঙুলটা ভাঙলেন কীভাবে? আজব কাণ্ড! ডাক্তারের স্বগতোক্তিতে জমিলার অন্তরাত্মা অবদি কেঁপে কেঁপে ওঠে। খুব বেশি ব্যথা না লাগলেও খুব জোরে চিৎকার করে ডাক্তারকে প্রসঙ্গান্তরে নেয়ার প্রয়াসে।

হাসপাতাল থেকে বের হবার পর হাঁফ ছাড়ে জমিলা। প্লাস্টার করার পর হাতটা এখানে ওখানে চুলকালেও ব্যথা বেশ কম। ডাক্তার বেশ কিছু ব্যথার ওষুধও দিয়ে দিয়েছে। পেট ভরে ভাত খেয়ে তারপর খেতে হবে।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য একটা রিকশা খোঁজে জমিলা, এর চেয়ে নিরাপদ যান এ মুহূর্তে আর কিছু হতে পারে না, পাবলিক ইজি বাইক এড়াতে চায় সে। কোনো রিকশাচালক রাজি হয় না প্রত্যন্ত গ্রামটিতে এই অসময়ে যেতে, জমিলা উশখুস করে, এদিক-ওদিক তার এত বিভ্রান্ত ছোটাছুটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাহারারত পুলিশ দলের। এগিয়ে এসে জমিলার ব্যাগের দিকে ইশারা করে দলের একজন- এ্যাই ব্যাগে কী? কিচ্ছু না, কিচ্ছু না- জমিলার কম্পিত ভয়ার্ত কণ্ঠ পুলিশের দলটিকে আরো কৌতূহলী করে। সামনে দাঁড়ানো খালি রিকশাটায় তড়িঘড়ি উঠে বসে জমিলা। ব্যাগটা লুকায় দু-পায়ের ফাঁকে, রিকশাঅলাকে তাড়া দেয়, যাইন ভাইজান, যাইন... জমিলার আচরণ পুলিশের কৌতূহলকে সন্দেহে পরিণত করে। পুলিশ রিকশার পিছনে হাতের লাঠি দিয়ে জোরে এক বাড়ি দেয়- এ্যাই শালা দাঁড়া। হাত দিয়ে রিকশার গতি আটকায় একজন। রিকশাঅলা ভয়ে প্যাডেল ছেড়ে নেমে পড়ে। জমিলা লাফ দিয়ে নেমে পুলিশদের পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে- ভাইগো ভাই, বাড়িত হউর মরছে... জমিলার কথা শেষ হয় না। পুলিশের কাছে এই আচরণ বড় অসংলগ্ন বোধ হয়। একজন বলে আরেকজনকে- সারা দেশে জঙ্গিরা ছড়িয়ে পড়ছে। কাউরে বিশ্বাস নাই। একজন লাঠি উঁচিয়ে এগিয়ে আসে জমিলার পিঠ লক্ষ্য করে- খোল ব্যাগ, দেখা কী আছে। পুরানো শাড়িতে প্যাঁচানো টিনের বাক্স। সবুজ রঙের গায়ে লাল-হলুদ লতাপাতা নকশা। জমিলাকে কোনোভাবেই বাধ্য করতে না পেরে, বিরক্ত হয়ে কনস্টেবল একজন নিজের হাতেই বাক্সটা খুলে; খুলেই সবার চোখ চড়কগাছ। তাড়ি তাড়ি টাকার বান্ডিল। পুলিশের দলটি পরস্পর তাকায় বিস্ময়ে বিমূঢ় দৃষ্টিতে। অসহায় জমিলা মাটিতে বসে পড়ে ধপাস করে। টের পায় করিমুল্লাহ মহাজনের সুদের চক্র ছেঁড়া যদিওবা সহজ, পুলিশের আঠারো ঘা থেকে বের হওয়া এতো সহজ না। কতো স্বপ্ন ছিল এই টাকাগুলো মহাজনরে শোধ দিয়ে সমুজ আলীরে নিয়ে বাপের দেশে চলে যাবে সে ভিটে বাড়ি বেচে। সঙ্গ ছাড়লে পথে ফিরবে সমুজ আলী। সত্যিই সোনার একটা সংসার হবে তার।

সমুজ জানাজায় দাঁড়িয়েও বারকয়েক তাকায় পথের দিকে। লাশ নিয়ে বের হবার সময় বোনেরা রাগে গজগজ করে- আইলো বেডি, আইলো? ফরের বেডি! টেহাগুলার লাইগ্যাই বাপের মতো খাটনি দিছে হউরের ফিছে। অহন বিশ্বাস অইছে আরার কথা? গরিবের কতা বাসি অইলে ফলে। বেডি ভাগছে। অক্ষম ক্রোধে সমুজের নিজেকে উন্মাদ লাগে। 

গোরের ভিতর দেহখানা রাখার আগে মুরুব্বিরা সমুজকে বলে- শেষবার বাপের মুখখান দেইখ্যা লও। খালি সমুজ না, পাড়াপ্রতিবেশী জানাজায় সমবেত সবাই শেষবারের মতো মুখটা দেখে বৃদ্ধের। তারপর সযত্নে আবার কাফনে ঢেকে কবরে নামায় দেহখানা। পুনরায় বলে কেউ কেউ- বড় বালা মানুষ আছিল। ঠিক মাগরিবের আগে আগে দাফন সম্পন্ন হয় বৃদ্ধের। রহস্যময় সে সন্ধ্যায় বৃদ্ধের গলার অস্পষ্ট আঙুলের ছাপগুলো কবরস্থানে থেকে ফিরতি পথ ধরা দলটির কারো চোখেই পড়েনি।
 

 

(দেবতাদের সাবধানবাণী সত্ত্বেও একদিন বাক্সটি খুলে ফেলে প্যান্ডোরা। সঙ্গে সঙ্গে বাক্স থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে রোগ-মহামারী নানা রকমের অশুভ বিষয়াদি। হতভম্ব এবং ভীত প্যান্ডোরা সঙ্গে সঙ্গে বাক্সটি বন্ধ করে দেয়। ফলে একটিমাত্র বিষয় উন্মুক্ত হতে পারেনি তা হলো- আশা।-গ্রিক পুরাণ)

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জুলাই ২০১৭/তারা