ঢাকা, রবিবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
রম্যগল্প

লেজ || তাপস রায়

তাপস রায় : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১২ ১:২৫:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-১৭ ২:৫৮:১৮ পিএম
লেজ || তাপস রায়
অলঙ্করণ: মামুন হোসাইন

আজ ক’দিন থেকেই দুলাভাইয়ের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। চেহারায় ঘোর অমাবস্যা! দুলাভাই দেখতে কুদর্শন নন। তবে নামের আগে ‘কু’ আছে। প্রায়ই তিনি সে-কথা স্মরণ করে পরাণের গহীন ভিতর থেকে বায়বীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। নাম কুদরত কিন্তু কপাল খুলল না সারাজীবনেও। জীবনে না লাগল ভেলকি, কপালে না লাগল লটারি। উল্টো তিনি যে ব্যবসাতেই নামেন লাখ লাখ টাকা লস!

এ-নিয়ে অবশ্য দুলাভাইকে তেমন চিন্তিত মনে হয় না। কীভাবে যেন ঠিকই তিনি সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন। দোষের মধ্যে শুধু তার কথোপকথন উচ্চস্বরে পৌঁছালে ফোর হুইলের গিয়ার চেঞ্জ করার মতো নাসারন্ধ্র দিয়ে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ বেরোয়। 

অনেকের কাছে বিষয়টি ভীতিকর মনে হলেও আপা ওসব পাত্তা দেন না। এ কারণে দুলাভাইয়ের গুপ্ত মনঃকষ্ট আছে। ওটা যে অকারণ নয়, সেই কষ্ট শুধু আমরাই বুঝি।

আর কী?

না, তাকে নিয়ে বলার তেমন আর কিছু নেই। তবে হ্যাঁ, দুলাভাইয়ের ছাদে চুল কম কিন্তু সে তুলনায় বুদ্ধি বেশ! আর আছে দশাসই স্বাস্থ্য। সে কারণেই কিনা কে জানে, হালকা রসিকতা কিংবা পাতলা বুদ্ধির ধার তিনি ধারেন না। তার সবকিছুতেই ‘ওয়েট’ থাকে। ওয়েট বজায় রেখে চলাটাই তার স্বভাব, কিন্তু অভাব হলো সময়ের। ফলে প্রায় সময়ই তিনি অন্যদের ওয়েটিংয়ে রাখেন। অনেক সময় দেখা যায়, আজকের কাজ কাল তো নয়ই, পরশু এমনকি তরশুও আর করা হয়ে ওঠে না।

প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলেই দুলাভাইকে আপার কাছে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। এবার আপা ঠিক করেছেন দেশি গরু কোরবানি দেবেন। ইন্ডিয়ান কিংবা বেজাত অস্ট্রেলিয়ান গরু হলে হবে না। দেশি মানে হান্ড্রেড পার্সেন্ট দেশি গরু হতে হবে। আপার ধারণা এতে দেশি পণ্য কিনে যেমন ধন্য হওয়া যাবে, তেমনি সোয়াবও মিলবে বেশি। এ জন্য আপা কিছু শর্তও দিয়েছেন। ঘাপলার শুরু এখান থেকেই।

যেমন গরুর চোখ দুটো হতে হবে টানাটানা কাজল-কালো, লেজের চুলগুলো স্ট্রেইট, শরীরের লোম হতে হবে সিল্কি, রং রোদে পোড়া তামাটে- একেবারে ইস্টম্যান কালার। স্বভাব হবে বাপুরাম সাপুড়ের সেই সাপের মতো। অকারণে ফোঁসফাস করবে না। খোঁচা দিলেও শিং বাঁকিয়ে তেড়ে আসবে না। কথায় কথায় ঘাড় দুলিয়ে হাম্বা বলে ডেকে উঠবে না, যাকে বলে নিপাট ভদ্রলোক। তারপরও কথা আছে।

কী কথা?

গরুর ফিগার হতে হবে হলিউডের নায়কদের মতো। মাংস হতে হবে বেশি, সে তুলনায় দাম হতে হবে কম। যদিও কোরবানির গরুর প্রকৃত ক্রয়মূল্য প্রতিবেশীদের কাছে অপ্রকাশিতই থাকবে- এ ব্যাপারে বাসার কাজের বুয়ার প্রতিও আপার কড়া নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু দুলাভাই নির্দেশ পালন করছেন না দেখেই আপার মেজাজ টং।

ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আপার পরিকল্পনাও বাড়তে থাকে। সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাতে গিয়ে দুলাভাইকে প্রতিবছর দৈনিক পত্রিকায় ‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপনের মতো ‘গরু চাই’ বিজ্ঞাপন দিতে হয়। এবার বিজ্ঞাপনেও কাজ হচ্ছে না। হাম্বা ডটকমের শরণ নেবেন কিনা দুলাভাই ভাবছেন। অথচ সময় বয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেশীরা প্রায় সকলেই গরু কিনে ফেলেছেন। সে কথা তারা জানানও দিচ্ছেন বেশ জোরেশোরে। কলিংবেল বাজিয়েও যাদের দরজা খোলা যায় না, তারা স্বেচ্ছায় বাড়ির সদর দরজা হাট করে খুলে রাখছেন; হাট থেকে কেনা গরু দেখানোর জন্যই।  

দৈত্য বড় না পাহাড় বড়? দৈত্য দেখিনি, পাহাড়পুর গিয়ে টিলা দেখে এসেছি। সেই টিলাকৃতিসম গরু- দেখলেই সম্ভ্রম জাগে। কেউ আবার একাধিক কিনেছেন। সঙ্গে খাসিও আছে।

সফিক সাহেবের কথাই বলি। অবসর নিয়েছেন। রোজ নিয়ম করে সকালে বডিগার্ড নিয়ে হাঁটতে বের হন। এখন গরু নিয়ে বের হচ্ছেন। সামনে সফিক সাহেব, পেছনে গরু। তার পেছনে খাসি।

মোতালেব সাহেব বিকেল হলেই ট্রাউজার, কেডস পরে বাগানে পানি ছিটাতেন। এখন নিয়ম করে দুবেলা গরুর ঘাসে পানি ছিটান। তারপর সটান শুয়ে পড়েন পাশেই রাখা ইজিচেয়ারে।

হেনা আপা মাইক ছাড়া (অমায়িক) মহিলা। পরচর্চার চেয়ে রূপচর্চা শ্রেয় মনে করেন। বিষয়টিকে তিনি গবেষণার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এখন সাধনাটুকুই বাকি। সাধ এবং সাধ্যের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বলেই ওটা হয়নি। সে যাক, বাসায় গেলেই দেখা যায় অমুক গাছের ছাল, কচি পাতা, শুকনো লতা, দাদার আমলের মরা বীজ বুয়াদের দিয়ে হামানদিস্তায় ছেঁচছেন। ব্লেন্ডারের সঙ্গে ওসব আবার ঠিক যায় না। সেই বাড়ি থেকে গরম মসলা, আদা, এলাচের ঘ্রাণ ভুরভুর করে বের হচ্ছে। অথচ আপার গরু এখনও কেনাই হলো না।

হায় কপাল! সম্মান পাউডারের মতো গুঁড়া গুঁড়া হতে আর বুঝি দেরি নেই- আপা আর্তনাদ করে ওঠেন।

দুলাভাই সুরসুর করে পালিয়ে বাঁচেন।

কিন্তু কতদিন?

অবশেষে দুলাভাই বাধ্য হয়ে ঘরে বসেই গরু খোঁজা শুরু করলেন। মাউস টিপে টিপে দেখে ফেললেন দুনিয়ার সব গরু। অনেক সাইট ঘুরে, অনেক ভাইরাসের সঙ্গে ফাইট দিয়ে নিউজিল্যান্ডের একটা গরু পছন্দ করলেন। উৎফুল্ল কণ্ঠে আপাকে ডেকে দেখালেনও।

যদিও সেই গরুর চেহারা দেখে আপার চেহারায় কোনো পরিবর্তন ধরা পড়ল না। কিন্তু দুলাভাইয়ের উৎসাহ দেখে কে! নিউজিল্যান্ড থেকে গরু আসছে এ কি চাট্টিখানি কথা! উত্তেজনায় দুলাভাইয়ের নাসারন্ধ্র দিয়ে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ বের হতে লাগল।

আপা টিকতে না পেরে ‘মিনসের কাণ্ড দেখ’ বলে নিজেই প্রকাণ্ড হাঁক ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

দুলাভাই অনেক কসরত করে সঠিক জায়গায় কার্সর বসিয়ে ‘বাই নাউ’-এ ক্লিক করলেন। মনিটরে ভেসে উঠল, হান্ড্রেড পার্সেন্ট অ্যাডভান্স। আমদানি সংক্রান্ত জটিলতা, বিমান ভাড়া, শুল্ক চার্জ ক্রেতাকে বহন করতে হবে। দুলাভাই দমে গেলেন। বাজনার চেয়ে খাজনা বেশি মনে করে দুলাভাই ও পথ আর মাড়ালেন না।

ঘাড় গুঁজে সার্চ দিতে দিতে কাঁধ ব্যথা হলো। মাউসে হাত রাখতে রাখতে আঙুল টনটন করতে লাগল। মনিটরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ দিয়ে পানি পর্যন্ত গড়াল কিন্তু আপার মন ভিজল না।

পরদিন দুলাভাই নিজেই ঘর থেকে বের হলেন। ছুটলেন কোরবানির হাটে। কিন্তু বিয়ের পাত্রী দেখার মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গরু দেখেও তিনি স্থির করতে পারলেন না- কোন গরু কিনলে আপার মানভঞ্জন হবে। তিনিও কম মান্যবর নন। পকেটে ঘি আছে সুতরাং রাধাকে তিনি নাচিয়েই ছাড়বেন- এই হলো প্রতিজ্ঞা।

হাট ঘুরে দেখা গেল গরুর রং মিললে রুচিতে মেলে না, স্বাস্থ্যের তুলনায় শিং বড়, দেখেই কেমন পাকনা মনে হয়। দেশি গরুর চেহারার এমন জীর্ণ দশা দেখে তার জয়নুলের আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবির কথা মনে পড়ে গেল। এরা ফুসফুসে সবটুকু বাতাস টেনে নিয়ে যখন হাম্বা ডেকে ওঠে তখন সেখানে পৌরুষের তেজ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

অথচ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা নাদুস-নুদুস ফার্মের গরুগুলো দেখলেই হিংসা হয়। দুলাভাইয়ের একটু লজ্জাও লাগে। সেম সাইজ বলে কথা! কিন্তু গরু না কিনে বাসায় ফিরলে শেম তো পেতেই হবে, সাইজ হওয়ারও যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। সুতরাং সে কথাও তাকে মাথায় রাখতে হয়।

সবুরে মেওয়া ফলে- এ কথা আপা কিছুতেই বুঝতে চান না। দুলাভাইয়ের সবকিছুতেই যে ‘ওয়েট’ সেটা তো তিনি সাধে করেন না। কিন্তু আপাকে কে বুঝাবে সে কথা?

দুলাভাই বিভিন্ন হাটে ঘুরে ঘুরে গরু খুঁজতে থাকেন। আহারে! দেশি গরুর প্রতি অবহেলা তাকে ব্যথিত করে। বাইরের গরুগুলো কেমন সুন্দর সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বনের রাজাকেও কেউ এভাবে কখনও সাজিয়ে রাখে না। কপাল বটে!

পত্রিকাওয়ালারা ক্লিক ক্লিক শব্দে ছবি তুলছেন। নোটবুকে টুকে নিচ্ছেন দাম। যেন দেশজুড়ে ‘মিস্টার কাউ প্রতিযোগিতা’ শুরু হয়ে গেছে। এ নিয়ে হাউকাউও কম হচ্ছে না। সে কি উত্তেজনা!

অবশেষে অনেক ঘোরাঘুরির পর দুলাভাই গরু কিনে গলায় মালা পরিয়ে সগর্বে বাসায় ফিরলেন। আনন্দে বাসার  পরিবেশটাই পাল্টে গেল। শুধু পাল্টালো না আপার মুখশ্রী।

একটা ছাগল সাইজের গরু উটের দামে কিনে দুলাভাই যে রামছাগলের পরিচয় দিয়েছেন এ ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহ-ই নেই। নাতিদীর্ঘ একটা বক্তৃতা দিয়ে আপা ক্যালকুলেটর নিয়ে বসলেন কত কেজি মাংস হবে সেই হিসাব করতে। শাড়ি হলে ভিন্ন কথা ছিল, কিন্তু কোরবানির হাট থেকে গরু কিনে ফেরত দেওয়া যায় না, তাই আপা বিষয়টি মেনে নিলেন ঠিকই কিন্তু মনে নিলেন না।

যাক বাব্বা! আপার কাছ থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর দুলাভাইয়ের ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। তিনি গরুর গোসলের ব্যবস্থা করতে বললেন এবং গোসল করাতে গিয়েই ঘটল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।

কোরবানির গরু কিনতে গিয়ে দুলাভাই যে এভাবে প্রতারিত হবেন তিনি নিজেও ভাবেননি। হালাল সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে গরুর গোসল করানোর সময় দেখা গেল গরুর লেজটা হালাল নয়।

ঘটনা হলো, আপার নির্দেশে দুলাভাই যখন গরুর লেজের চুলে অর্গানিক শ্যাম্পু মাখিয়ে ঘষতে শুরু করলেন ঠিক তখনই টিকটিকির লেজের মতো গরুর লেজ দুলাভাইকে বোকা বানিয়ে মাটিতে খসে পড়ল। সেইসঙ্গে খসে পড়ল দুলাভাইয়ের কোরবানির ঈদের আনন্দ। প্লাস্টিকের লেজটি হাতে নিয়ে দুলাভাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

খবর বাড়িময় ছড়াতে সময় লাগল না। আপা দুলাভাইয়ের দিকে হাইস্পিডে তেড়ে এলেন।

আমি গরুর চেহারা দেখেই বুঝেছিলাম- গন্ডগোল আছে। বিয়ের আগে তোমার চেহারা দেখেও যে বুঝতে পারিনি তা নয়, কিন্তু বাবার হাই ব্লাড প্রেসারের কথা ভেবে... গর্দভ কোথাকার!

আপার কথা শুনে দুলাভাইয়ের দুঃখটা বেড়ে গেল। ইস! তিনিও যদি চেহারা দেখেই সব কিছু চিনতে পারতেন তাহলে কত ভালোই না হতো।

দুলাভাই মিনমিন করে শুধু বললেন, তুমি না করলেও হতো না। কুদরতে লেখা ছিল।

আপা এবার ক্ষেপে গেলেন। মেজবানীর রান্নার কড়াইয়ে গরম তেলে যেন মরিচ পড়ল। আমরা দূরে দাঁড়িয়ে প্রমাদ গুণলাম। আপা আক্রোশে দু’হাত সামনে বাড়িয়ে ইউ ইউ করতে করতে দুলাভাইয়ের দিকে দুই পা এগিয়ে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন। তারপর যে স্পিডে এসেছিলেন তার দ্বিগুণ স্পিডে ইউটার্ন নিয়ে সোজা ঘরে ঢুকে দরাম করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। 

দুলাভাইয়ের ততক্ষণে ঘোঁত ঘোঁত শুরু হয়ে গেছে। এটা যে সব সময় অতিরিক্ত রাগের কারণে হয় এমন না, মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত ভয়েও এমন হয়- দুলাভাইয়ের আর সে কথা বলা হয়ে ওঠে না।

ঘোঁত ঘোঁত শব্দটা ক্রমশ বাড়তেই থাকে।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ আগস্ট ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন