ঢাকা, বুধবার, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ০৮ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

লেবাননের প্রবাসীরা খুব বেশিই মনে করছেন তাকে

জসিম উদ্দীন সরকার : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৬ ৯:৩৪:৪৯ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১৬ ৯:৩৪:৪৯ এএম

প্রায় ৩মাস হল তিনি লেবাননে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব শেষে দেশে ফিরেছেন। তার রেখে যাওয়া কর্মকাণ্ড আজো লেবানন প্রবাসীরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

তিনি প্রবাসীদের প্রাণ উজাড় করে ভালবাসতেন। প্রবাসীদের দুঃখকষ্টকে নিজের দুঃখকষ্ট মনে করতেন। লেবাননের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালেব সরকারকে এজন্য ভুলতে পারেননি লেবাননের প্রবাসীরা।

প্রবাসীদের যেকোন সমস্যায় দিন-রাত নির্বিশেষে তাঁদের পাশে দিয়ে দাঁড়াতেন তিনি। হয়ে উঠেছিলেন লেবাননের সকল প্রবাসীর চোখের মনি। শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় উপাধি দিয়েছিল প্রবাসীবান্ধব রাষ্ট্রদূত।

দূতাবাসে যোগদানের পর থেকে প্রবাসী সেবার ধারণাটাই আমূল বদলে দেন এই রাষ্ট্রদূত। প্রবাসীদের জন্য দূতাবাসের দ্বার ছিল উন্মুক্ত। এ ছাড়া তাদের বেতন বৃদ্ধিসহ কর্মস্থলের বিভিন্ন সমস্যা যেমন- বেতন কম দেয়া, ওভারটাইম না দেয়া, অধিক সময় কাজ করানো ইত্যাদি সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ গ্রহন করেন।

তাছাড়া জাল ভিসা বন্ধকরণ, অভিবাসন ব্যয় ৬-৭ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ২-৩ লাখ টাকা করাসহ নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন নিয়োগ পদ্ধতি চালু করেন। কফিল কর্তৃক জোর করে দেশে পাঠিয়ে দেয়া বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। এমনকি অনেক শ্রমিককে বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ফিরিয়ে আনারও ব্যবস্থা করেন।

নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করে হাজার হাজার প্রবাসীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করেন তিনি। হাজার হাজার ডলার খরচ করে বড় বড় অপারেশন করিয়েছেন অনেকের। এভাবে গুরুতর অসুস্থ অসহায় প্রবাসীদের বিনা খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালেব সরকার।

তিনি নিজেকে কখনো রাষ্ট্রদূত হিসেবে ভাবতেন না। আলাপচারিতায় তিনি বলতেন, তিনি নিজেকে অন্যদের মতই সাধারণ প্রবাসী ভাবেন । তিনি মনে করেন বিশ্বে বাংলাদেশী  প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। আর এই বঞ্চনা শুরু হয় বিদেশের মাটিতে পা রাখার আগে থেকেই। তাই তিনি প্রবাসীদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছেন।

শুধুমাত্র দূতাবাস পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলেন তা তিনি। প্রবাসীদের ভালমন্দের খোঁজ নিতে তিনি চষে বেড়িয়েছেন লেবাননের উত্তর থেকে দক্ষিণ ও পূর্ব থেকে পশ্চিমে। এজন্য মাঝে মাঝেই প্রবাসীদের সাথে মতবিনিময় সভা করতেন ।

লেবাননের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ ওপরমহলে তার ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়সহ সাধারণ লেবানিজদের মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। আর এর সুফল ভোগ করেছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান তিনি  অনেক সহজেই করেছেন শুথু ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে।

লেবাননে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিসহ লেবাননের সাথে ব্যবসা-বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যেও তিনি প্রবাসীদের সাথে নিয়ে নিরলস কাজ করে গেছেন। এ কারণে লেবাননে বাংলাদেশ তার চিরায়ত দারিদ্র-পীড়িত গৃহকর্মীর দেশের তকমা পেরিয়ে একটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও দ্রুত বর্ধিষ্ণু দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

প্রবাসীদের জন্য তিনি ছিলেন বটবৃক্ষের মত।একজন প্রবাসী বিপদে পড়ে রাত ২/৩ টার সময়ও যদি তার মোবাইলে কল দিতেন, তিনি রিসিভ করতেন ও তার কথা শুনতেন। কখনো রাগ করতেন না বা বলতেন না এত রাতে কেন কল করেছেন। সমস্যা গুরুতর হলে  তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যে, তিনি রাত ৩/৪ টা পর্যন্ত জেগে থেকে হাসপাতালে রোগী ভর্তি করিয়েছেন, রাত ১১/১২ টায় থানায় ফোন করে আটক প্রবাসীদের ছাড়িয়ে এনেছেন। লেবানন পুলিশ কর্তৃক প্রবাসী কর্মীদের গণগ্রেপ্তার বন্ধ করেছেন তিনি।

তিনি দূতাবাসে চালু করেছিলেন ২৪ ঘন্টার জরুরী নাম্বার। খুলেছিলেন অভিযোগ বাক্স। প্রবাসীরা তাদের সমস্যা ও অভিযোগের কথা সরাসরি তার মোবাইলেও জানাতে পারতো।

তবে এই নরম হৃদয়ের মানুষটি অসাধু দালাল ও দূষ্কৃতিকারীদের জম ছিলেন। সাধারণ প্রবাসীদের যারা ঠকাতেন, এমন প্রতারকদের তিনি কখনো ক্ষমা করেতেন না। কেউ দালাল ও প্রতারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে গেলে তিনি তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। এজন্য দালালদের রোষানলেরও শিকার হয়েছেন তিনি। দূর্নীতিকে যিনি প্রচণ্ড ঘৃনা করতেন, অথচ তার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছিল দূর্নীতির মিথ্যা অপবাদ।

তিনি চলে গেছেন বেশ কয়েক মাস, কিন্তু লেবানন প্রবাসীরা আজও তাকে ভুলেননি। প্রবাসীদের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন তিনি। তার কর্মের জন্য তাকে লেবানন প্রবাসীরা আজো মনে করেন। লেবাননের প্রবাসীদের দুর্যোগময় মুহূর্তে প্রবাসীরা বার বার বলছেন, এই সময়ে লেবাননে প্রবাসীদের পাশে রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালেব সরকারকেই দরকার ছিল।

লেবাননের প্রবাসীরা আরেকজন আব্দুল মোতালেব সরকার চান। যিনি কাজ করবেন প্রবাসীদের স্বার্থে। প্রবাসীদের ভালবাসবেন হৃদয় উজাড় করে।

 

জসিম/লেবানন/টিপু