ঢাকা, রবিবার, ২০ আষাঢ় ১৪২৭, ০৫ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

শিক্ষকের কাছে ছাত্রের চিঠি

শিহাব শাহরিয়ার : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৫ ১২:৪০:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১৫ ৩:১৮:৫৮ পিএম

ড. আনিসুজ্জামান

স্যার, বিনম্র শ্রদ্ধা জানবেন।

জানি, আমার এই চিঠি কোনোদিনই আপনি হাতে পাবেন না। তবুও কেন লিখছি? উত্তর নেই স্যার। শুধু জানি, আপনি আমার- আমাদের বাতিঘর ছিলেন। আজ বন্ধ হলো বাতিঘরের দরজা। আজ মানে, ১৪ মে ২০২০। আজ আপনি চলে গেলেন চিরতরে। স্যার আপনি কোথায় গেলেন? কোন সুদূরে? কোন আকাশের দিকে? কোন নক্ষত্রের কাছে? আমরা কি জানি সেই নক্ষত্রের ঠিকানা?

জানি না। জানি, সেখানে একবার সবাই যায়, সবাই চিরতরে পাড়ি জমায়। যারা যায়, তারা আর ফিরে আসে না! তাদেরকে আর কোথাও দেখা যায় না। না ঘরে, না জানালায়, না রৌদ্রে, না মেঘসম কুয়াশায়, না পার্কে, না বেঞ্চে, না কবিতার ক্লাসে, না অরুন্ধতি সময়ে, না জ্যোৎস্না স্নিগ্ধতায়। তবু মানুষ যায়; সবাইকেই যেতে হয়। পেছনে রেখে যায় আরো আরো মানুষ, ঢেউ, নদীর উথাল-পাথাল, ছেড়া ঘাসফুল, বসন্ত ডানা, কড়ি-কমলের হিসাবের খাতা, পুকুরে পড়ে থাকা প্রেমিকার নাকফুল কিংবা সাম্যবাদের অসমাপ্ত গল্প, নিশুতি রাতের বিপ্লবের হাহাকার, আবার কেউ কেউ রেখে যায় সিন্ধুকের তালা, বিধবার সাদা শাড়ির মতো বিকেলের আবছা আলো। আপনি কী রেখে গেলেন স্যার বিনয়, ভদ্রতা, সততা, উদারতা, নম্রতা, শিক্ষা, সুন্দর, শুভ্রতা?

হ্যাঁ, সবই রেখে গেলেন। শূন্য হাতে! আপনাকে আমরা কিছুই দিতে পারলাম না। না ফুল, না ভালোবাসা। করোনা আপনাকেও আক্রান্ত করলো! শেষ দেখাটুকুও করতে দিলো না সে!

স্যার, পৃথিবীর কোটি কোটি বছরের এই দিনটিতে ঘটে গেছে লক্ষ-কোটি ঘটনা। কিন্তু সেই ঘটনাগুলো ছাপিয়ে আজকের দিনটি, দিনের ঠিক ৪:৫৫ মিনিট আমাদের করে তুলল বেদনার্ত! আমরা শোকস্তব্ধ। এমনিতেই আছি গৃহকালে, তারপর আপনার নিঃসীম বিদায় আমাদের ক্রমশ করে তুলছে অসহায়। আপনার ছাত্রী দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আপনার হাজার ছাত্র, আপনার সহকর্মী, আপনার সংস্কৃতির সুহৃদ, সাহিত্যের বন্ধু, লক্ষ লক্ষ ভক্ত-স্বজন, কোটি কোটি বাঙালি আপনাকে হারিয়ে অথৈ নদীজলে পড়ে গেল। এখন তীরের সন্ধান কে দেবে? কে ফেলবে ভালোবাসার আলো? কে দেখাবে বাংলাদেশের সুন্দরের পথ? যে বাংলাদেশ নির্মাণে আপনি ছিলেন সুদক্ষ নিরলস কারিগর। যে ভাষায় এখানে পাখি গান গায়, নদী সুর তোলে, ফুল গন্ধ ছড়ায়, আপনি সেই মাতৃভাষার নির্যাস নিয়ে এগিয়েছেন ১৯৩৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত। আপনি কঠিন পথ হেঁটে হেঁটে আমাদের দেখিয়েছেন আলোর পথ। জাতির নানা ক্রান্তিকালে আপনি ছিলেন সাহসী অভিযাত্রী। আমরা বাঙালির দুঃসময়ে, দুর্যোগে আপনার আশ্রয় খুঁজেছি। আপনি আমাদের বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন উচ্চ শিখরে। আপনার ভেতরে ছিলো মানবতা, প্রগতি চিন্তা, সাম্য চিন্তা, অসম্প্রদায়িক চিন্তা। আপনি ধারণ করতেন মহান ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক এসব চেতনার পতাকা আপনি উড়িয়েছেন আমৃত্যু। 

স্যার আমরা জানি, বাংলাদেশে জমিদারী কাজ শেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বছর পদ্মা, ইছামতি আর নাগর নদের মায়া ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে যান অর্থাৎ ১৯৩৭ সালে, সেই একই বছর আপনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় আপনার পড়াশোনায় হাতেখড়ি আর শৈশবের কিছুদিন বেড়ে ওঠা। তারপর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া দেশ বিভাগের কড়া রোদ আপনাকে নির্মমভাবে স্পর্শ করে, আপনি আসেন পৃথিবী দীর্ঘ ম্যানগ্রোভের স্পর্শ কাতর পলিভূমি খুলনার নিসর্গ-ছায়ায়। এরপর আপনি এলেন বুড়িগঙ্গার তীরভূমি ঢাকায়। খুলনা থাকতেই আপনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে ধারণ করেছিলেন। আর ঢাকায় এসে সক্রিয় হয়ে আপনি ১৫ বছর বয়সে ‘রাষ্ট্র ভাষা কী ও কেন’ বিষয়ে প্রথম পুস্তিকা লিখলেন, কী দুঃসাহস? ইতোমধ্যে আপনি মেট্রিক পাস করে ভর্তি হয়েছেন জগন্নাথ কলেজে।  তারপর ১৯৫৩ সালে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্সে ভর্তি হয়ে ১৯৫৬ সালে পাস করে ১৯৫৭ সালে একই বিভাগে এমএ পাস করেন। পাস করার পরপরই আপনি শিক্ষকতা শুরু করলেন। এই শিক্ষকতা আপনার এক অনন্য, অন্তহীন পথযাত্রায়। যে পেশা আপনাকে করেছে মহান। ঢাকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ পৃথিবীর নামি-দামী অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষা দান করেছেন।

সেই ঘটনাটিও হয়তো আপনাকে স্মৃতিতাড়িত করে, ১৯৬৯ সালে আপনি গাড়ি চালিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে যখন ঢাকায় বিশ্রামে ছিলেন, তখন তাজউদ্দিন আহমদকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু আপনাকে দেখতে গিয়েছিলেন। যে মুজিব তাঁর আন্দোলন, সংগ্রাম, জেল-জুলুম সহ্য করে বাংলাদেশ নামক সবুজ রাষ্ট্রের মহান নেতায় পরিণত হলেন, আপনিও সেই একই আদর্শ ধারণ করে পথ চলেছেন। আপনি আবার সেই জাতির পিতার সুযোগ্যা কন্যার মহান শিক্ষক হিসেবেও সমান গৌরবান্বিত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আপনাকে মর্যাদার আসনে রেখে যে শ্রদ্ধা ও বিনয় দেখান তাতে আপনার ছাত্র হিসেবে আমরাও আনন্দিত হই। এই সম্মান আপনার প্রাপ্য।

স্যার, আমরা জানি আপনি বরেণ্য শিক্ষাবিদ। বাংলা ভাষার অগ্রসরে আপনার অনন্য ভূমিকা বাঙালিকে প্রাণিত করেছে। বাঙালির সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে আপনার অবদান প্রশংসাযোগ্য।

স্যার আপনি পাহাড়-সমুদ্রঘেরা আর কর্ণফুলি-বিধৌত চট্টগ্রামের অধ্যাপনার দুই বছর বাদে বাকি কুড়ি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগকে করেছেন আলোকিত। আপনি শিক্ষা দানে ছিলেন পথিকৃৎ। বাংলা বিভাগে আপনার বসবার কক্ষটি ছিল অবাধে সাঁতার কাটার মতো। আমি কী যে সৌভাগ্যবান, ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় থেকে এসে, অজপাড়া গাঁ আর মফস্বল শহরের গেঁও গন্ধ নিয়ে এসে বাংলা বিভাগে আপনার ক্লাস রুমের বেঞ্চে বসে আপনার পাঠ গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। আপনিসহ অন্যান্য শিক্ষকদের কাছ থেকে শুনতে, জানতে ও বুঝতে শুরু করেছিলাম চর্যার কাহ্নপা, ফুল্লরার দুঃখ, বড়ুচন্ডী দাস, নবদ্বীপ, সুফিবাদ, কবিয়াল, ঈশ্বরগুপ্ত, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, মানিক, বিভূতি। আহা কী গোগ্রাসেই না জেনেছি। বিভাগের সামনে অপরাজেয় বাংলার তিন মূর্তমান প্রতীকের সঙ্গে ছিলো আমাদের বসবাস। বিভাগের বাঘা বাঘা শিক্ষক, সহপাঠীদের হৃদ্যতায়, ছাত্র-আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে সময়গুলো গেছে রবীন্দ্রনাথের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতার মতো। জীবনানন্দকে জীব্য করে আমি ঢুকে গেলাম কবিতার তীর্থ অঞ্চলে। সেও আপনারই অনুরপ্ররণা। একজন স্বনামধন্য লেখক হিসেবে আপনার সাহিত্যখ্যাতি তখন শীর্ষে। আপনার লেখা বই ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’, ‘সমাজ সংস্কৃতি ও রাজনীতি’, ‘স্বরূপের সন্ধানে’, ‘বিপুলা পৃথিবী’, ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’, ‘আমার একাত্তর’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে করেছে বিপুল সমৃদ্ধ।

স্যার, বাংলা বিভাগে কত যে স্মৃতি আপনাকে ঘিরে, তার সব এখানে বলা সম্ভব নয়। পড়াশোনায় আপনার উপদেশ ও পরামর্শ সারা জীবন আমি ভুলব না। স্যার আমার মনে আছে, এমএ শেষ করার পর আমি এমফিল করতে চাইলাম আপনার অধীনে। আপনি বললেন, কী বিষয়ে করবে ঠিক করেছো? আমি বললাম, না। আপনি বললেন, আমি গদ্যের ওপর করাতে চাই, তুমি যেহেতু কবিতা লেখো, জীবননান্দ দাশের ওপর ভালো নম্বর পেয়েছো, তুমি বরং কবিতা নিয়ে কাজ করো। এই কথা বলে, আপনি চেয়ার থেকে ওঠে আমাকে নিয়ে গেলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যারের কক্ষে। সেখানে গিয়ে আপনি বললেন, এই নিন আপনার এমফিলের ছাত্র, ওকে কবিতার একটি বিষয় ঠিক করে দিন। মনিরুজ্জামান স্যার তৎক্ষণাৎ বললেন, কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা নিয়ে করো। তখন আপনি বললেন, শিহাব ঠিক আছে, তুমি শুরু করে দাও। স্যার, আপনাকে তখন মনে হলো আমার বাবার মতো। আমার বাবাও শিক্ষক, শিক্ষক হয়েও আপনি আমার বাবার মতো আমাকে স্নেহ করেছেন। আপনার রুমে আমার ছিল অবাধ যাতায়াত। কখনো আপনার সামনে বসে দেখতাম, আপনার হাতের লেখা। গোটা গোটা অক্ষরে পরিচ্ছন্ন লেখা আমাকে সুন্দরের দিকে নিয়ে যেতো। স্যার আপনাকে কখনো দেখেনি নামের আগে ডক্টরেট লিখতে। দেখেনি কোনো বেতার-টেলিভিশন কেন্দ্রে গিয়ে কথা বলতে, অনুষ্ঠান করতে, কখনো দেখেনি প্যান্ট-শার্ট পরতে, সব সময় দেখেছি সফেদ পাঞ্জাবি-পায়জামা পরতে। আপনাকে দেখেছি, সময়কে জ্ঞান করতে। আপনাকে দেখেছি, কোনো অনুষ্ঠানে আপনি সভাপতি এবং সেই অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা বিকাল ৪টায়, আপনি হাজির হয়েছেন ঠিক ওই চারটায়। আপনি কথা বলতেন, মূল কথা, বাড়তি নয়। সব মিলিয়ে আপনাকে আমার মনে হয়েছে আপনি আদর্শবান পুরুষ।            

স্যার, আপনাকে আমার কর্মালয় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে অসংখ্য অনুষ্ঠানে এনেছি। আপনার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার আমরা গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। যেখানে আপনি বলেছেন আপনার জীবনের ভাষ্য আর বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি আর বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার দৃঢ় উচ্চারণ। স্যার আপনাকে সর্বশেষ দেখেছি ঢাকা ক্লাবে। আপনারই ৮৩-তম জন্মদিনে। সেখানেই শেষ দেখা। আপনি সেদিন ফুলে ফুলে শোভিত হয়েছেন। স্যার আবার কী বাংলা বিভাগে, বাংলা একাডেমিতে, জাদুঘরে, ঢাকা ক্লাবে? আমরা কী আপনার ৮৪-তম জন্মদিন পালন করবো না? পিতৃতুল্য আপনাকে হাত ধরে নামাবো আপনার প্রাইভেট কার থেকে? স্যার আপনি না এলে কে করবে আমার জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামালের ওপর সেমিনারের সভাপতিত্ব? জাতির সংকটে কে বলবে বাংলাদেশের পক্ষে কথা? স্যার আপনি কী আর আসবেন না? কেন আসবেন না? আমরা কী যাবো না আপনার গুলশানের বাসায়? আপনার বন্ধু জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মুহাম্মদ হাবীবুর রহমানের মতো আপনিও অভিমান করে কী চলে গেলেন! আর কিছুটা দিন কী আপনি থাকতে পারতেন না পিতার মতো সামনে দাঁড়িয়ে?

স্যার, অভিভাবক হারানোর হাহাকারে এখন মন ভারী হয়ে আসছে। কেন করোনা এসে আমাদেরকে নিঃসীম বেদনায় এভাবে স্বজন বিচ্ছিন্ন করবে? আমরা আপনার সফেদ মুখটিও শেষবারের মতো দেখতে পারলাম না! স্যার আপনি ছিলেন বাংলাদেশের মহীরুহ। যে বিশাল বৃক্ষের ছায়া ছিল ঘন, শীতল; প্রচন্ড তাপদাহে মানুষকে দিয়েছে শান্তির পরশ। আপনি আপনার কর্মে, কথায় অর্জন করেছিলেন সুনাম ও খ্যাতি। পেয়েছেন সম্মান, পুরস্কার, খেতাব। যা সচরাচর কেউ পায় না। আপনি সেই বাঙালি শৌর্য পুরুষ, যার আদর্শকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে জীবন বিকশিত করা যায়। স্যার আপনার এই নগন্য ছাত্রের চিঠির উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। আপনার মহান আদর্শকে যেন আজীবন পালন করতে পারি। স্যার আপনি যেখানেই গেলেন, সেখানে চির শান্তিতে থাকুন। কামনা করি, আপনার ফেলে যাওয়া ফুল সৌরভ ছড়াক বাংলার পথে পথে।

আপনার স্নেহধন্য শিক্ষার্থী।

১৪ মে, ২০২০

মিরপুর, ঢাকা।


ঢাকা/তারা