ঢাকা, মঙ্গলবার, ৫ কার্তিক ১৪২৬, ২২ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
সড়কে মৃত্যুর মিছিল

শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি

আলী নওশের : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-০৫ ৮:০২:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-০৯ ৪:১৯:৩৯ পিএম

এ বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে গাড়িচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। এর জের ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকায় শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে।  তখন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পাস হয়েছে সড়ক নিরাপত্তা আইন। ফলে তখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু পরবর্তীতে আবার যেই সেই। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়কে ঝরছে মানুষের প্রাণ। আহত হচ্ছেন অনেকে।

গত কয়েক দিনে সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ৩৫ জন। গত রোববার ভোরে কুষ্টিয়ার খোকসায় যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে ২ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হয়েছেন। একইদিন দুই ছাত্রসহ সাত জেলায় সড়কে প্রাণ হারিয়েছে নয়জন। বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পারে দুটি বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। পাবনায় ভটভটির চাপায় অন্তঃসত্ত্বা এক নারী ও তার মেয়ে নিহত হয়েছে। বাগেরহাটের মোল্লাহাটে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন মোটরসাইকেল আরোহী দুই স্কুল শিক্ষক। টাঙ্গাইলে গাড়িচাপায় নিহত হয়েছে মোটরসাইকেল আরোহী কলেজছাত্র। গাজীপুরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত হয়েছে পাঁচ যাত্রী। ফেনীতে বাস-অটোরিকশা সংঘর্ষে নিহত হয়েছে চারজন। এ ছাড়া ফরিদপুরে, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কুড়িগ্রামে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় আরো ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

বস্তুতঃ সড়কে মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২৫ হাজার ১২০ জন। এ সময়ে আহত হয়েছে আরো ৬২ হাজার ৪৮২ জন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে বলছে, এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে ঘটে ১০ শতাংশ দুর্ঘটনা। চালকের বেপরোয়া মনোভাব, পথচারীদের অসচেতনতা ও সড়কের ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

বেপরোয়া যানবাহন চালানো বন্ধ করতে চালকদের বিরুদ্ধে যেমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তেমনি চালকদের দিয়ে যেন অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো না হয় সে দিকেও নজর দিতে হবে। সব চালক ইচ্ছা করে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান না। কিন্তু তাদের দ্বারাও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যদি তাদের শারীরিক অবস্থা যানবাহন চালানোর উপযোগী না থাকে। বিশেষভাবে যেসব চালক রাতের বেলা যানবাহন চালান, তারা যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ না পান।

কিন্তু যানবাহনের মালিক এবং চালকেরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন না। আবার অনেক চালক বেশি আয় করার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিয়ে রাতের পর রাত যানবাহন চালান। এ বিষয়ে আইনি নির্দেশনা হলো, কোনো চালক দিনে টানা আট ঘণ্টার বেশি যান চালাতে পারবেন না। কিন্তু এটা মেনে চলা হয় না। দূরপাল্লার অনেক যানবাহনের চালক টানা ১৬, এমনকি ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত যান চালান। বিশেষত দুই ঈদের সময় এই প্রবণতা বেড়ে যায়।

যত দূর জানা যায়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাত দফা পরিকল্পনা করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে কী কী উপায়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব, সে বিষয়েও সুপারিশ করেছেন। কিন্তু ফলপ্রসূ কিছু হচ্ছে না। দুর্ঘটনা রোধে যাত্রী কল্যাণ সমিতির কয়েকটি সুপারিশ করেছিল। এগুলো হচ্ছে- জরুরিভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে মালিক-শ্রমিক-যাত্রী-সরকার মিলে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ, ফিটনেসবিহীন মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন উচ্ছেদ, চালকদের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, তাদের  চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ, সব বেহাল সড়ক সংস্কার, ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ, বিআরটিএকে শক্তিশালীকরণ, পরিবহন খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং ফুটপাত নির্মাণ ও সংস্কারসহ ফুটপাত দখল মুক্ত করে হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে বিকেলে বা সন্ধ্যায় নিরাপদে বাড়িতে ফেরা যাবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। আমাদের সবার এই নিরাপদে ঘরে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে হলে সরকার-মালিক-শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। গাড়িচালক, গাড়ির মালিক, যাত্রী, পথচারী এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে যারা সবাইকেই যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ ডিসেম্বর ২০১৮/আলী নওশের

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন