ঢাকা, রবিবার, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছি শহীদ জননীকে

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-০৩ ৯:৪৭:১০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-০৩ ১০:১৭:২২ এএম

রুহুল আমিন : জাহানারা ইমাম। শহীদ জননী। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধের পর পুরোনো শকুন যখন আবার খামছে ধরেছে জাতীয় পতাকা ঠিক তখনই জাহানারা ইমাম বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের বিচারের আওতায় আনতে তার প্রচেষ্টা ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন জাহানারা ইমাম। আজ জাহানারা ইমামের জন্মদিনে তাকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছি। তার বাবার নাম সৈয়দ আবদুল আলী ও মা সৈয়দা হামিদা বেগম। বাবা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।

১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন জাহানারা ইমাম । ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরে ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)। ১৯৪৭ সালে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ  থেকে বি. এ পাস করেন । ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন । পরে ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন অ্যাডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন ।  ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ পাস করেন।

শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি শিক্ষক হিসেবে তার কর্মময় জীবন শুরু করেন। আর কর্মজীবনের প্রথম সময় কাটে ময়মনসিংহ শহরে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন তিনি। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন।

১৯৫২ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বুলবুল একাডেমি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন তিনি। পরে কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ১৯৬৮ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন।কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে নির্মমভাবে শহীদ হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করেন।রুমীর শহীদ হওয়ার সূত্রেই তিনি শহীদ জননীর মযার্দায় ভূষিত হন৷ এ ছাড়া যুদ্ধের সময় তার স্বামী মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, দেশপ্রেমিক শরীফ ইমামও ইন্তেকাল করেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস তার কেটেছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ত্রাসের মধ্য দিয়ে। এ সময় তার মনের মধ্যে ছিল দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্বপ্ন। এ দুঃসময়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের এসব বৃত্তান্ত তিনি দিনলিপি আকারে নানা চিরকুটে, ছিন্ন পাতায় ও গোপন সঙ্কেতে লিখে রেখেছিলেন। ১৯৮৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের ওই দিনলিপি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নামে প্রকাশ করেন তিনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মর্মস্পর্শী এ বৃত্তান্ত জনমনে ব্যাপক সাড়া জাগায়।

১৯৯১ সাল দেশ উত্তাল। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমির ঘোষণা করে। এতে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভ শুরু হয়।বিক্ষোভের অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। তিনি হন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি   ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে  এই কমিটিরও আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম।

১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ এই কমিটি ‘গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান জাহানারা ইমাম । গণআদালতের সদস্য ছিলেন অ্যাডভোকেট গাজিউল হক, ড. আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লে. কর্নেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামান, লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী ও ব্যারিস্টার শওকত আলী খান।

গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর তৎকালীন সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অ-জামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে ১৯৯২ সালের ১২ এপ্রিল জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবিসংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেন।

১০০ জন সংসদ সদস্য গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেন। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

১৯৯২ সালের ৩০ জুন সরকার সংসদে ৪ দফা চুক্তি করে। ১৯৯৩ সালের ২৮ মার্চ ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশ বাহিনী হামলা চালায়। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম।পরে তাকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, এমনকি বিদেশেও নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি পান জাহানারা ইমাম।  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে।

১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের প্রথম বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেত্রত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ  স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। গণতদন্ত কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেন- শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, সালাহ উদ্দিন ইউসুফ, অনুপম সেন, দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, খান সারওয়ার মুরশিদ, কবি শামসুর রাহমান, শফিক আহমেদ, আবদুল খালেক ও সদরুদ্দিন। এই সমাবেশে আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এ সময় খুব দ্রুত জাহানারা ইমামের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। কারণ আশির দশকের শুরুতে ১৯৮২ সালেই তিনি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এই জন্য প্রতি বছর একবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হতো তাকে। ১৯৯৪ সালের ২ এপ্রিল শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্টয়েট হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন জাহানারা ইমাম। ২২ এপ্রিল চিকিৎসকরা জানান, তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।তার মুখগহ্বর থেকে ক্যান্সারের বিপজ্জনক দানাগুলো অপসারণ করা সম্ভব নয়। বাকশক্তি হারিয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় তার। এ সময় ছোট ছোট চিরকুট লিখে প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন তিনি।

১৯৯৪ সালের ২২ জুনের পর থেকে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। সব ধরনের খাবার গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকরা ওষুধ প্রয়োগও বন্ধ করে দেন। ২৬ জুন বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্টয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালের বেডে ৬৫ বছর বয়সে জাহানারা ইমাম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর তার এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আজন্ম এক সারথির জীবনাবসান হয়।

জাহানারা ইমামের মৃত্যুতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি ২৮ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত শোক সপ্তাহ এবং ৬ জুলাই জাতীয় শোক দিবস পালন করে। ৪ জুলাই বিকেলে বাংলাদেশে আনা হয় শহীদ জননীর মরদেহ। তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সমন্বয় কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে শহীদ জননীর লাশ গ্রহণ করেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ৫ জুলাই সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদ জননীর কফিন রাখা হয় জনগণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যে। দুপুরে জোহর নামাজের পর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজের জানাজা। জানাজা শেষে শহীদ জননীকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের আটজন সেক্টর কমান্ডার শহীদ জননীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

তার লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে ‘একাত্তরের দিনগুলি’, ‘অন্য জীবন’,  ‘বীরশ্রেষ্ঠ’,  ‘জীবন মৃত্যু’, ‘চিরায়ত সাহিত্য’,  ‘বুকের ভিতরে আগুন’,  ‘নাটকের অবসান’,  ‘দুই মেরু’,  ‘নিঃসঙ্গ পাইন’,  ‘নয় এ মধুর খেলা’,  ‘ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস’ ও  ‘প্রবাসের দিনলিপি’।

জাহানারা ইমাম বিভিন্ন পুরস্কার ও পদক পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার, কমর মুশতরী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, স্বাধীনতা পদক, রোকেয়া পদক, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ও মাস্টারদা সূর্যসেন পদকসহ অন্যান্য।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ মে ২০১৭/রুহুল/ইভা