ঢাকা, বুধবার, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২০ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

শ্রমবাজার খুলছে, প্রাধান্য পাবে মালয়েশিয়ার প্রস্তাব

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-৩০ ৮:৪৩:০৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-৩১ ৮:৩৩:১২ এএম

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, আগামী নভেম্বরের প্রথমদিকেই মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ঘোষণা আসতে পারে। তবে বিষয়টি নির্ভর করছে দুই দেশের মধ্যকার ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের ওপর।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের আলোচনার পর আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দালালদের অপতৎপরতা। তাই এবার শুরু থেকেই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

দালালদের প্রতারণাসহ বিভিন্ন কারণে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ফরেন ওয়ার্কার অ‌্যাপ্লিকেশন সিস্টেম (এসপিপিএ) ব্যবহার করে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনলাইন পদ্ধতিটি বন্ধ হয়ে যায়। এর জন্য দায়ী হিসেবে তখন চিহ্নিত করা হয় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনা এবং প্রতারণাকে। গত বছরের ২১ আগস্ট শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় মালয়েশিয়া।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগে সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতা আর বাড়তি টাকা নেয়ার প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। এরপর ১৪ আগস্ট মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে মাহাথির মোহাম্মদের সভাপতিত্বে বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিশেষ কমিটির বৈঠকে শ্রমিক নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এরপর কয়েক দফা বৈঠকের পরও এ বিষয়ে কোনো সমাধান আসেনি।

ত‌বে চলতি মাসেই আজারবাইজানের বাকুতে ন্যাম শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক বৈঠকে মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া, দুই দেশের ওয়ার্কিং কমিটির মধ্যে চলমান আলোচনায় এ বিষয়ে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, বন্ধ শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে ৬ নভেম্বর মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায় দুই দেশের বৈঠক হবে। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারান ও বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদের মধ্যে এ বৈঠক হবে। 

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে এবার মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে আসতে পারে। এরমধ্যে কর্মীদের কম অভিবাসন ব্যয়ে পাঠানো, কোম্পানি পরিবর্তন না করা, মেয়াদ শেষে দেশে ফিরে আসা, যোগ্য সকল রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো, স্বাস্থ‌্য পরীক্ষাসহ অন্য বিষয়গুলো মালয়েশিয়ার পদ্ধতিতে পরিচালনা করা।

সূত্র জানায়, শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার জন্য মালয়েশিয়ার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেবে বাংলাদেশ। এমনকি শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে মালয়েশিয়ার ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে বলে আগেই জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ।

এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, যেহেতু মালয়েশিয়া তাদের জন্য কর্মী নেবে, তাদের কিছু প্রস্তাবনা বা চাহিদা থাকতে পারে। তারা কী চায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থ এবং কর্মীদের সুবিধা অগ্রাধিকার পাবে।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন রাইজিংবিডিকে বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশে কর্মীদের কম ব্যয়ে পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার সব সময়ই আন্তরিক। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে অভিবাসন খরচ নির্ধারণ করে দেয়া হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করত দালাল চক্র। তাই সরকারের পক্ষ থেকে দালালমুক্ত অভিবাসন নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

শ্রমচুক্তির অধীন মালয়েশিয়ায় যে কোম্পানির অধীনে জনশক্তি পাঠানো হবে, তা যেন পরিবর্তন না হয়, এমন দাবি থাকতে পারে মালয়েশিয়ার। যদিও মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এটি বরাবরই সব দেশের দাবি থাকে। তাই সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়গুলো এখন থেকে তদারকিতে আনার পরিকল্পনাও করছে সরকার।  মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একই মনোভাব দেখাবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

যোগ্য সকল রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর বিষয়টিকেও বাংলাদেশ প্রাধান্য দিয়ে আসছে। যেকোনো দেশের সঙ্গে শ্রমচুক্তি হওয়ার পর নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদন দেয়। আসন্ন ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে  এ সংক্রান্ত প্রমাণপত্রও সাথে থাকবে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের। সূত্র জানায়, স্বাস্থ‌্য পরীক্ষাসহ অন্য বিষয়গুলো মালয়েশিয়ার পদ্ধতিতে পরিচালনা করার প্রস্তাব থাকতে পারে দেশটির পক্ষ থেকে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে দেশের স্বার্থ এবং কর্মীদের সুবিধা অগ্রাধিকারের বিষয় বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। মেডিক‌্যাল পদ্ধতির বিষয়টি নিয়ে দেশটির সাথে আলোচনা চলমান রয়েছে বলেও জানা গেছে। এছাড়া, মালয়েশিয়ায় গিয়ে যেন কোনো কর্মী সমস্যায় না পড়েন, সে বিষয়েও কথাবার্তা চলছে।

এদিকে, মন্ত্রণালয় শ্রমবাজারটি চালু করতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে চেষ্টা করলেও ব্যবসায়ীদের একটা অংশ নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দুই দেশের সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে শ্রমবাজারটিতে এসব অপতৎপরতা খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। বিষয়গুলো  প্রকাশ্যে আসায় মন্ত্রণালয় সজাগ থাকে সকল প্রকার সিন্ডিকেট তৎপরতার বিষয়ে।

গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলছে প্রচেষ্টা:

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের ঘোষণা আসার পর তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে মালয়েশিয়া গিয়ে বৈঠক করেন। বাংলাদেশ সফরে আসেন মালয়েশিয়ার দাতু ড. রাইস হোসাইন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে‌ যান তিনি। এরপর ৩১ অক্টোবর ঢাকায় দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে নতুন করে কর্মী নেয়ার কিছু পদ্ধতি ঠিক হয়।

চলতি বছরের ১৪ মে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদ (বর্তমানে মন্ত্রী) মালয়েশিয়া সফরে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তানশ্রি মুহিউদ্দিন ইয়াসিন ও মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারানের সাথে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের অগ্রগতি হিসেবে ২৯ ও ৩০ মে মালয়েশিয়ায় দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের আরেকটি বৈঠক হয়। কিন্তু সেখান থেকেও শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে কোন রূপরেখা পাওয়া যায়নি।

গত মাসে ওয়ার্কিং কমিটির আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সেটি স্থগিত করা হয়। ধারণা করা হয়, দেশটি তাদের চাহিদাপত্র এবং নীতিমালা ঠিক করতে সময় নেয়। এরপর গত সপ্তাহে দেশটির পক্ষ থেকে ওয়ার্কিং কমিটির আগামী বৈঠকের বিষয়ে আগ্রহের কথা জানানো হয়। সব ঠিক থাকলে আগামী ৬ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় এ বৈঠক হবে।

বিফোরজিতে ফিরেছে সাড়ে ১১ হাজার বাংলাদেশি:

মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়া সরকারের ঘোষিত সাধারণ ক্ষমা ‘ব্যাক ফর গুড’ (বিফোরজি)’ কর্মসূচির আওতায় ৪৬ হাজার ৯৭৬ জন নিজ নিজ দেশে ফিরেছেন এবং ১৯ হাজার ৩৮৮ জন নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ফিরেছেন ১১ হাজার ৫৪৮ বাংলাদেশি। এর মধ্যে ১০ হাজার ১৩৯ পুরুষ এবং ১ হাজার ৪০৯ নারী। এ কর্মসূচি ১ আগস্ট শুরু হয়েছে, চলবে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত।

বিপুল সংখ্যক কর্মীর এই কর্মসূচির অধীনে ফেরত আসাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে মন্ত্রণালয়।


ঢাকা/হাসান/রফিক

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন